নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়ছে উত্তাপ। প্রচার-প্রচারণায় মাঠ সরব থাকলেও এর পেছনে ঘটছে একের পর এক আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা। হামলা ও হেনস্তার অভিযোগও সামনে আসছে। এ নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এসব ঘটনায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে এনসিপি। যদিও নির্বাচন কমিশন (ইসি) দাবি করছে, অতীতের অনেক নির্বাচনের তুলনায় এবারের ভোটের মাঠে এখন পর্যন্ত পরিবেশ মোটামুটি শান্ত ও অনুকূলে রয়েছে।
নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রচার-প্রচারণ কিংবা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, শরীয়তপুর, সিরাজগঞ্জসহ অন্তত ১০ জেলায় বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের খবর পাওয়া গেছে। এসব সংঘাতের বেশিরভাগই ঘটেছে বিএনপি এবং জামায়াত-এনসিপি জোটের সমর্থকদের মধ্যে।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৭৬টি নির্বাচনী এলাকায় ১৯২টি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় ১২ লাখ ২৪ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা আদায় এবং ১১৯টি মামলা হয়েছে। এর বাইরে জামায়াত ও এনসিপির প্রার্থীদের প্রচারে একাধিকবার হামলা ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে। জামায়াতের নারীকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগও রয়েছে।
সম্প্রতি নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে ঢাকান্ড১৮ আসনের প্রার্থী মো. আরিফুল ইসলামের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। ২৬ জানুয়ারি সকালে রাজধানীর খিলক্ষেতের ডুমনি বাজার এলাকার নূরপাড়া এতিমখানা পরিদর্শন ও গণসংযোগ কর্মসূচিতে অংশ নিতে গেলে তার ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয় বলে দলের তরফে দাবি করা হয়।
হামলার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আরিফুল ইসলাম বলেন, ডুমনি এলাকায় বিএনপির ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি দিদার মোল্লার নেতৃত্বে হামলা হয়। জড়িতদের মধ্যে মোহাম্মদ সেলিম মিয়া, মো. ইসরাফিল, মোহাম্মদ নাহিন, মোহাম্মদ রানা আহমেদ ও সোহেল আহমেদের নাম উল্লেখ করেন তিনি।
পরে ২৭ জানুয়ারি ঢাকান্ড৮ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ও এনসিপি মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা ও ডিম নিক্ষেপের অভিযোগ ওঠে। সেদিন দুপুরে রাজধানীর হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে পিঠা উৎসবে যোগ দিতে গেলে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মির্জা আব্বাস ও ছাত্রদল নেতাদের দায়ী করেছে এনসিপি।
হামলার বিষয়ে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে মির্জা আব্বাসের ভাগনে আদিত্যের নাম উল্লেখ করেন। এ ছাড়া হামলায় হাবীবুল্লাহ বাহার কলেজ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আসাদুজ্জামান মাসুদ, সাবেক আহ্বায়ক সদস্য শাহিন উদ্দিন মল্লিক এবং সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক শরিফ সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
পাটওয়ারীর ওপর হামলার ঘটনায় গভীর নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে এনসিপি। দলটি জানায়-হামলাকারীরা প্রকাশ্যে ‘ধানের শীষ, ধানের শীষ’ সেøাগান দিয়ে সহিংসতা চালায়, যা পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক সন্ত্রাসের সুস্পষ্ট প্রমাণ।
এর আগে, গত ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীর গোল্ডেন প্লাজা গলি এলাকায় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গণভোটে ‘হ্যা’ এর পক্ষে প্রচার চালাতে গেলে ময়লা পানি ও ডিম নিক্ষেপ করা হয়। এ ঘটনায় কারও দিকে আঙুল না তুললেও তিনি জানান, এর আগে বিভিন্ন জায়গায় যুবদলের নেতাকর্মীরা তাদের হেনস্তা করার চেষ্টা করেছিল। এ ছাড়া তারা মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে অদ্ভুত প্রশ্ন করেন।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জনসংযোগে বাধা প্রদানের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী মালিবাগ কাঁচাবাজারে আমাদের নির্বাচনী গণসংযোগ অনুষ্ঠিত হয়। প্রচারণাকালে শাহজাহানপুর যুবদলের সদস্য সচিব সাইদুর রহমান রিপন এবং ১২ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের আহ্বায়ক নাসিম রহমান পরিকল্পিতভাবে বাধা সৃষ্টি করেন। তারা দাবি করেন, এই এলাকা নাকি ‘২০০ বছরের মির্জা আব্বাসের এলাকা।’
এদিকে বুধবার নোয়াখালী-৬ আসনে ১১ দলীয় জোট মনোনীত আব্দুল হান্নান মাসুদের সমর্থকদের প্রচারণায় বাধা দেন আওয়ামী লীগের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আজাদের সমর্থকরা। আজাদ পূর্বে আ.লীগের রাজনীতি করলেও এখন বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়। এ বিষয়ে হান্নান মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের সব সন্ত্রাসী এখন প্রকাশ্যে ধানের শীষের জন্য ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন। তারা আমাদের প্রচারণায় বাধা দিচ্ছে। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের এসব সন্ত্রাসীকে তিনি দায়মুক্তি দিচ্ছেন। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই এবং অবিলম্বে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো এসব সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারের দাবি জানাই।
এসব ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি নির্বাচন কমিশনে পৃথকভাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিএনপি কর্মীদের হামলার অভিযোগ করেন। তবে কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত ভোটের পরিবেশ সুষ্ঠু রয়েছে।
এনসিপির মিডিয়া উপ কমিটির প্রধান মাহবুব আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের দুজন প্রার্থীর উপর সরাসরি হামলা করেছে বিএনপি। তা ছাড়া বিভিন্ন আসনে প্রচারণায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। জোটের বিভিন্ন আসনে নারীদের উপর হামলা ও হেনস্থা করা হচ্ছে। সর্বশেষ ঢাকান্ড৪ আসনে জামায়াতের এক নারীকে কুপিয়ে জখম করেছে বিএনপি। আমাদের দুজন নারী প্রার্থীর উপর হামলা না হলেও বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
এদিকে, নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ না থাকার অভিযোগ তুলেছেন এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, যখন একজন প্রার্থীকে আক্রমণ করা হয়, হেনস্তা করা হয় বা তার সমর্থক-কর্মীদের বাধা দেওয়া হয়। প্রশাসন কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয় না। তখন এটাকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলতে পারি না।
তিনি বলেন, সারা দেশে ১১ দলীয় জোটের নারী কর্মীদের হেনস্তা ও আক্রমণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে এনসিপির দুই প্রার্থী ঢাকান্ড১৮ ও ঢাকান্ড৮ আসনের প্রার্থীকে আক্রমণ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে নির্বাচন একপক্ষীয় হয়ে পড়বে এবং জনগণের প্রকৃত রায় প্রতিফলিত হবে না। এখনই যদি এসব বন্ধ না করা যায়, তাহলে নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ আর থাকবে না।
নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, মাঠে অন্যবারের তুলনায় ভালো পরিবেশ রয়েছে। প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক নেতারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। অভিযোগ এলেই তা রিটার্নিং অফিসার, মোবাইল কোর্ট এবং নির্বাচনী তদন্ত কমিটি তাৎক্ষণিকভাবে আমলে নিচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৫০-৬০টি মামলা হচ্ছে, জরিমানা ও শোকজ করা হচ্ছে।