স্বপ্নপূরণের একটা ধাপ রবিবার পেরুলো বাংলাদেশ। বহুদিন ধরেই একটা ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের কথা বলে আসছে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে খাস জমিও দেখা হয়েছে বহুবার। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান সভাপতি ও সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের উদ্যোগে অলিম্পিক কমপ্লেক্সের জন্য জায়গা চূড়ান্ত হয় বেশ কিছুদিন আগে। আর রবিবার ময়মনসিংহের ত্রিশালে সেনাবাহিনীর মালিকানাধীন ১৭৩.২ একর জমিতে অলিম্পিক ভিলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন সেনাপ্রধান। যার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ থেকে ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে পারলে ৫ থেকে ৬ বছর সময় লাগবে অত্যাধুনিক কমপ্লেক্স নির্মাণে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিওএ’র যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হবে বিশাল এ কমপ্লেক্স। নিজস্ব জায়গা ছাড়াও সেনাবাহিনী কমপ্লেক্সে যাতায়াতের জন্য আরও ৯ একর জমি নিজ অর্থায়নে কিনেছে। অলিম্পিক কমপ্লেক্সের প্রকল্প পরিচালক কর্নেল মো. কুতুবউদ্দিন খান মাস্টারপ্ল্যান প্রদর্শন করেন। তিনি জানান কমপ্লেক্সে ইনডোর, ফুটবল, হকি, টেনিস, অ্যাথলেটিক্স, আবাসন, মিডিয়া সেন্টার, পার্কিং, শুটিংসহ সব আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে। ইনডোর, আউটডোর মিলিয়ে এই কমপ্লেক্সে আয়োজন করা যাবে ৩৩টি খেলা। ক্রিকেট, গলফ, রোইং-এর মতো হাতেগোনা কয়েকটি খেলাই শুধু বাদ থাকছে। ক্রিকেট দেশের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা। অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এই কমপ্লেক্স ক্রিকেটের সুযোগ-সুবিধা প্রদানেও আগ্রহ প্রকাশ করেন। এতে মাস্টারপ্ল্যানে কিছুটা রদবদল হতে পারে। অলিম্পিক কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ দেখভাল করছে সেনাবাহিনীর ২৪ ব্রিগেড। দেশি প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠান ভিত্তির সঙ্গে রয়েছে আমেরিকান ডিএলএ। বিশ্বের অনেক বড় বড় স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া স্থাপনা নির্মাণের অভিজ্ঞতা রয়েছে মার্কিন এই প্রতিষ্ঠানের। বিদেশি প্রতিষ্ঠান নেওয়ার কারণ সম্পর্কে ভিত্তি’র স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণে আমাদের অভিজ্ঞতা নেই। তাই বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক হিসেবে নেওয়া হয়েছে।’ ময়মনসিংহের ত্রিশালে সেনাবাহিনীর জায়গা জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। তাই প্রাণপ্রকৃতি রক্ষা এই কমপ্লেক্সের মাস্টারপ্লানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হলেও এখনই পুরোদমে কাজ শুরু হচ্ছে না। এত বড় নির্মাণকাজ শেষ করতে প্রয়োজন বড় অঙ্কের বাজেট। বিওএ সভাপতি বলেন, ‘যত তাড়াতাড়ি অর্থ তত তাড়াতাড়ি কমপ্লেক্স। সব কিছু প্রস্তুত, শুধু বাধা অর্থ। অর্থসংস্থানে আমাদের সচিব (ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। আমরা গালফ কান্ট্রিস এবং আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সহায়তাও নেব। সবার সহায়তায় আমরা কমপ্লেক্স করব।’
ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুব উল আলম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন, ‘বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য স্বপ্নের স্থাপনা হবে। আর্থিক বিভাগের সঙ্গে কথা হয়েছে আইনগত বাধা নেই যেহেতু ক্রীড়াঙ্গনের অবকাঠামো। যত ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন করা হবে।’ বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল হাই সরকার ব্যাংকের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন, ‘এ রকম ক্রীড়া কমপ্লেক্সের উদ্যোগ আরও আগেই নেওয়া দরকার ছিল। দেরিতে হলেও হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে অবশ্যই সহায়তা করা হবে।’
অলিম্পিক কমপ্লেক্সের চূড়ান্ত বাজেট ও সময়সীমা এখনো নির্ধারণ হয়নি। বিওএ সরকারের কাছে প্রকল্প পাঠাবে। সেই প্রকল্প ক্রীড়া ও অর্থ মন্ত্রণালয় হয়ে একনেকের মাধ্যমে অনুমোদন হওয়াটা সময়সাপেক্ষ। সম্ভাব্য ব্যয় ও সময়সীমা নিয়ে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে প্রকল্প-১ (একটি ইনডোর স্টেডিয়াম, জমি উন্নয়ন ও অন্যান্য) বাস্তবায়ন করতে ২ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। সেটা হতে ২ থেকে আড়াই বছর সময় লাগবে। পুরো মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে ৩৪-৩৮ হাজার কোটি টাকা লাগবে। পরবর্তী সরকার এটি গুরুত্ব দিলে এবং অর্থ একসঙ্গে পাওয়া গেলে ৫-৬ বছরে কাজ শেষ করা সম্ভব।’
সেনাবাহিনীর জায়গার ওপর কমপ্লেক্সে হলেও বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন এটা ব্যবহার করবে। এ নিয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি হবে দুপক্ষের মধ্যে। বিওএ সভাপতি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট এখানে হবে। জাতীয় প্রতিযোগিতাও হবে। অন্য সময়ে সেনাবাহিনী অনুশীলন করবে। অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন ও আর্মির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হবে শিগগিরই। আমাদের তরুণ সমাজ খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী। তারা ফ্যাসিলিটিজ পায় না। কাজ শুরু হলে শেষ হবে। শাটল ট্রেন হলে এখানে যাতায়াত আরও সুবিধা হবে।’
স্বপ্নের একটা ভিত্তি মিলেছে। এবার সব পর্যায়ের চেষ্টায় সম্ভব একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অলিম্পিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলা। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ছোটখাটো অনেক খেলার অবকাঠামো সংকটের স্থায়ী সমাধান মিলবে।