ক্রিকেট ব্যাট ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে ক্রিকেটের আইনপ্রণেতা সংস্থা মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি)। ব্যাটের উচ্চমূল্যের কারণে অপেশাদার খেলোয়াড়দের জন্য খেলা ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ‘অবৈধ’ হিসেবে বিবেচিত কিছু ব্যাট ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
এমসিসি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে নতুন ক্রিকেট আইন কার্যকর হবে। সেই আইনের আওতায় ‘টাইপ ডি’ নামে পরিচিত ল্যামিনেটেড ব্যাট প্রাপ্তবয়স্কদের অপেশাদার ক্রিকেটে ব্যবহার করা যাবে। আগে এসব ব্যাট কেবল জুনিয়র ক্রিকেটে অনুমোদিত ছিল।
ল্যামিনেটেড ব্যাট সাধারণত ইংলিশ উইলো কাঠের সামনের অংশের সঙ্গে তুলনামূলক কম দামী কাঠ- যেমন কাশ্মীরি উইলো সংযুক্ত করে তৈরি করা হয়। বর্তমানে প্রচলিত টাইপ এ, বি ও সি ব্যাট একটিমাত্র উইলো কাঠ থেকে তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক বা পেশাদার পর্যায়ে সেগুলোর ব্যবহার অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া নতুন আইনে ব্যাটের সামনের অংশের পেছনে উইলো ছাড়াও অন্য কাঠ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এমসিসির আইন ব্যবস্থাপক ফ্রেজার স্টুয়ার্ট জানান, ব্যাট প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার মতে, টাইপ ডি ব্যাট থেকে পাওয়া সুবিধা পারফরম্যান্স বড় কোনো পার্থক্য তৈরি করবে না।
এমসিসির এই সিদ্ধান্তের পেছনে অন্যতম কারণ ইংলিশ উইলো কাঠের সংকট। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উইলোর প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় ব্যাটের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফ্রেজার স্টুয়ার্ট বলেন, ‘খেলার নিম্ন স্তরে যদি খরচ কমানো যায় এবং খেলার স্বাভাবিক ভারসাম্য অক্ষুণ্ন থাকে, তাহলে সেটাই যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়ায় ব্যাটের চাহিদা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অনেক শীর্ষ মানের ব্যাটের দাম প্রায় ১ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত পৌঁছেছে। এমসিসির কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক বছরে ব্যাটের দাম প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।
এমসিসি আরও জানিয়েছে, ভবিষ্যতে বিকল্প উপকরণ দিয়ে ব্যাট তৈরির সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এতে খেলার ভারসাম্য ও খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে—এই বিষয়টি মাথায় রেখে সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অতীতে বাঁশ দিয়ে ব্যাট তৈরির প্রস্তাব এবং গ্রাফাইট-সমর্থিত ব্যাট নিয়ে গবেষণাও হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমসিসির এই সিদ্ধান্ত উন্নয়নশীল দেশ ও অপেশাদার ক্রিকেটারদের জন্য ব্যাটের খরচ কমিয়ে আনবে।
ক্রিকেট আইনে যে পরিবর্তনগুলো আসছে:
লিঙ্গ নিরপেক্ষ ভাষা: ক্রিকেটের আইনে পুরুষ বা নারীবাচক শব্দের বদলে এখন থেকে লিঙ্গ নিরপেক্ষ শব্দ ব্যবহার করা হবে। যেমন ‘ব্যাটসম্যান’-এর বদলে সব জায়গায় ‘ব্যাটার’ শব্দটির স্থায়ী প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
দিনের শেষ ওভার: একাধিক দিনের ম্যাচগুলোতে দিনের শেষ ওভারে উইকেট পড়লে সাধারণত ওখানেই সেদিনের খেলা শেষ করে দেওয়া হতো। এখন আর তা হবে না। উইকেট পড়লেও ওভারের বাকি বলগুলো শেষ করতে হবে।
সীমানায় ক্যাচ নেওয়া: বাউন্ডারির বাইরে থেকে লাফিয়ে বল ভেতরে ঠেলে দিয়ে আবার এসে ক্যাচ ধরা (বানি হপ) এখন আর আগের মতো সহজ হবে না। ফিল্ডার বাউন্ডারির বাইরে থেকে এসে শূন্যে থাকা অবস্থায় একবারই বল স্পর্শ করতে পারবেন। এরপর ক্যাচটি পূর্ণ করতে হলে তাকে অবশ্যই বাউন্ডারির ভেতরে থাকতে হবে।
কিপারের গ্লাভস: বোলার দৌড় শুরু করার সময় কিপারের গ্লাভস স্টাম্পের সামনে থাকতে পারবে, কিন্তু বল ছাড়ার মুহূর্তে সেটা অবশ্যই স্টাম্পের পেছনে নিতে হবে।
শর্ট রান: কোনো ব্যাটসম্যান যদি ইচ্ছা করে শর্ট রান নেন, তবে তার শাস্তি হিসেবে ৫ রান জরিমানার আইন আছে। নতুন আইনে পরের বলে কোন ব্যাটসম্যান স্ট্রাইকে থাকবেন, সেটিও ফিল্ডিং দল ঠিক করবে। তবে ভুলবশত রান পূর্ণ না করলে কোনো শাস্তি নেই।
হিট উইকেট: ব্যাটসম্যান শট খেলার পর ভারসাম্য হারিয়ে স্টাম্পে পড়ে গেলে সেটা হিট উইকেট ধরা হবে। তবে যদি ফিল্ডারের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়, তখন আউট হবে না। আবার ব্যাটসম্যানের ব্যাট বা সরঞ্জামের কোনো অংশ যদি ফিল্ডার বা কিপারের গায়ে লেগে স্টাম্পে পড়ে, তবে সেটি ‘নট আউট’ হবে।
ডেড বল আইন: বল কখন ডেড হবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আম্পায়ারকে এখন বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বল শুধু কিপার বা বোলারের হাতে গেলেই ডেড হবে এমন নয়; যদি কোনো ফিল্ডারের হাতে থাকে বা মাটিতে স্থির অবস্থায় থাকে এবং আম্পায়ার যদি বোঝেন যে খেলা আর এগোবে না, তবে তিনি বল ডেড ঘোষণা করতে পারেন।
ওভার থ্রো: উইকেট লক্ষ্য করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বল ছুড়লে তাকেই কেবল ‘ওভার থ্রো’ ধরা হবে। সাধারণ মিস ফিল্ডিংকে এখন থেকে ওভার থ্রো বলা হবে না।
ঘোষণা বা ডিক্লারেশন: ম্যাচের শেষ ইনিংসে কোনো অধিনায়ক এখন থেকে ইনিংস ঘোষণা বা ডিক্লেয়ার করতে পারবেন না।