নভেম্বর মাসটা অনেক ভারতীয়ই বোধহয় ভুলে যেতে চাইবেন। বছরের ১১তম মাসের ২৬ তারিখেই আজমল কাসাভরা মুম্বাইতে চালিয়েছিল হত্যাযজ্ঞ। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকা-ের পর এই মাসেই শিখদের সঙ্গে জাতিগত দাঙ্গায় দিল্লিতে প্রাণ হারিয়েছিল হাজারো মানুষ। বোমা হামলাতেও দিল্লি কেঁপেছে এই নভেম্বর মাসেই। ভারতীয় ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় দুঃখগাথাও তো নভেম্বরেই।
১৯ নভেম্বর ২০২৩, আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি স্বাগতিক ভারত ও অস্ট্রেলিয়া। গোটা বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচ না হেরে ভারত ফাইনালে। বিরাট কোহলি ফর্মের তুঙ্গে। রোহিত শর্মার দলটা ছুটছে অশ্বমেধের ঘোড়ার মেেতা। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া রীতিমতো খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ফাইনালে। ১ লাখ ৩২ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতার স্টেডিয়াম, ৯২ হাজার মানুষের উপস্থিতি। গ্যালারি জুড়ে নীল জার্সির উত্তাল ঢেউ আর ভারত বন্দনার সেøাগান। তাদের স্তব্ধ করে দিয়েছিল ১ জন অস্ট্রেলিয়ান। ট্র্যাভিস হেড। সবচেয়ে বড় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বিশ্বের সবচেয়ে ক্রিকেটপাগল জাতিকে নিশ্চুপ করে বিশ্বকাপটা জিতে নিয়েছিল প্যাট কামিন্সের অস্ট্রেলিয়া। যে ট্রফিটা জিতে দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে একজন সমর্থকও আসেননি, স্রেফ কয়েকজন গণমাধ্যমের আলোকচিত্রী এসেছিলেন পেশাদারী দায়িত্ব পালনে। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতের হারের তুলনা হতে পারে কেবলমাত্র মারাকানাজো’র সঙ্গেই। ১৯৫০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে স্তব্ধ করে দিয়ে উরুগুয়ের অ্যালসিডিস ঘিঘিয়ার করা সেই গোলের সঙ্গে মেলানো যাবে ট্র্যাভিস হেডের সেঞ্চুরিকে। মারাকানার হৃদয়ভাঙার পর বিশ্বকাপ জিততে ব্রাজিলের লেগেছিল ৮ বছর। তবে আধুনিক সময়ে কোনো পেশাদার খেলাতেই সমর্থকদের এত ধৈর্য নেই। আর ক্রিকেটে যেখানে বার মাসে তের পার্বণের মতো প্রতিবছর কোনো না কোনো বিশ্বকাপ বা বৈশ্বিক ইভেন্ট লেগেই থাকে, সেখানে তো নেইই। পরের বছরই রোহিত শর্মারা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছেন, তারপরের বছর আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। সাদা বলে পুরুষদের জন্য আইসিসি’র যে তিনটি বৈশ্বিক আসর, তার দুটোর শিরোপাই এখন ভারতের। অস্ট্রেলিয়াকে প্রায় ৯ হাজার রেটিং পয়েন্টে পেছনে ফেলে আইসিসি’র টি-টোয়েন্টি র্যাংকিংয়ের শীর্ষ দলটার নামও ভারত। বিশ্বকাপ জয়ের বাজির ঘোড়া হিসেবে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই উচ্চারণ করছেন ভারতের নাম। কিন্তু আসরটা যে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ, আর সবরমতীর ধারে নীল সাগরে হলুদ ঢেউয়ের স্মৃতিটাই যে ভয় ধরায়।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শুরু ২০০৭ সাল থেকে, এবারে হতে যাচ্ছে ৯ম আসর। ৩টা দল এই শিরোপা জিতেছে ২ বার করে। ভারত প্রথম আসর আর সবশেষ আসরের জয়ী। এত এত পরিসংখ্যানের মধ্যে একটা পরিসংখ্যান হচ্ছে, কোনো স্বাগতিক দল এখন পর্যন্ত এই বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। সেটা ২০০৭ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা, কিংবা ২০০৯ এর ইংল্যান্ড এমনকি ২০২১ সালে শিরোপা জিতে এক বছরেরও কম সময় পরের আসরের স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াও পারেনি ২০২২ সালে শিরোপা ধরে রাখতে। ভারতের সামনে তাই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে ঘিরে জন্মানো এই সব ‘বিশ্বাস’ ভাঙারও চ্যালেঞ্জ। দল হিসেবে গৌতম গম্ভীরের কোচিংয়ে সূর্যকুমার যাদবের নেতৃত্বে তরুণ ক্রিকেটারদের যে বাহিনী, তাদের সামনে আসলে ভারতের মাটিতে অন্য কোনো প্রতিপক্ষের টিকে থাকাটাই মুশকিল। ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর ৪৯টা টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছে ভারত, জিতেছে ৩৯টি, হেরেছে ৬টি আর দুটো হয়েছে টাই আর বাকি দুই ম্যাচ পরিত্যক্ত। আর হিসেবটা যদি ভারতের মাটিতে করা হয়, তাহলে ১৭ ম্যাচে ১৪ জয়। টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ৩০০’র কাছাকাছি রান করার উচ্চাকাক্সক্ষা নিয়েই ব্যাট করতে নামেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা। বাংলাদেশের বিপক্ষে হায়দ্রাবাদে ২৯৭ রান করেছিল ভারত, কিছুদিন আগে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২৭১। আড়াইশ’র কাছাকাছি রানটা এখন নিয়মিত দৃশ্য।
খেলার ধরনে এই ভারতকে চমকে দেওয়ার সামর্থ্য আছে দক্ষিণ আফ্রিকার। কুইন্টন ডি কক, এইডেন মার্করাম, রায়ান রিকেলটন, ডেওয়াল্ড ব্রেভিস, ডেভিড মিলার, টিস্টান স্টাবসদের নিয়ে লম্বা মারমুখী ব্যাটিং লাইন আপ, সঙ্গে স্পিন এবং পেসের কার্যকর মিশেল। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজে হ্যারি ব্রুকের নেতৃত্বে ইংল্যান্ডও বেশ কার্যকর। আইসিসি আসরগুলোতে নিউজিল্যান্ড সবসময়ই বেশ শক্তিশালী দল। বিশ্বকাপের ঠিক আগে আগে ভারত সফর করেছে কিউইরা। সব মিলিয়ে তারাও দেবে কড়া টক্কর। চমকে দিতে পারে আফগানরাও। তবে যে হলুদ জার্সিকে ভারতের বরাবরের ভয়, সেই অস্ট্রেলিয়াই এবার বলা যায় দুর্বলতম! বিশ্বকাপে খেলতে শ্রীলঙ্কায় পা রাখার আগে পাকিস্তান সফরে ৩-০তে হোয়াইটওয়াশ হয়েছে অস্ট্রেলিয়া। প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজেলউড নেই চোটের কারণে। বোলারদের অর্ধেকের নামই সাধারণ ক্রিকেট দর্শকদের কাছে অপরিচিত, ব্যাটসম্যানরাও ছন্দে নেই।
২০ দলের বিশ্বকাপে ৫ দলের ৪টা গ্রুপ। এমনভাবেই গ্রুপে দলগুলোর বিন্যাস করা যে ক্রিকেটের প্রথাগত শক্তি যে দলগুলো তারাই উঠে আসবে সুপার এইট পর্বে। আগে বাছাই বা সিডেড দলগুলো আসরে একটু পরে যোগ দিত, গত আসর থেকে তাদের ম্যাচসংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। তাই বলা যায় বিশ্বকাপের আসল উত্তাপ শুরু হতে এখনো খানিকটা দেরি। যেটুকু উত্তেজনা সবটাই রাজনৈতিক। বাংলাদেশ খেলতে যায়নি নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে, সরকারের নিষেধাজ্ঞায় পাকিস্তান খেলবে না ভারতের বিপক্ষে। তিন দেশের চলমান রাজনৈতিক সম্পর্কের কালো ছায়া পড়েছে বিশ্বকাপেও।
৮ মার্চ ফাইনালের দিন তারিখ ঠিক হয়ে থাকলেও ভেন্যু এখনো নিশ্চিত নয়। পাকিস্তান ফাইনালে উঠলে ফাইনাল হবে কলম্বোতে, বাকি ১৯ দলের অন্য কোনোটি উঠলে ভারতের আহমেদাবাদে। গ্রুপ পর্বে ভারতের বিপক্ষে খেলবে না পাকিস্তান, তবে নকআউট পর্বে যদি দুই দলের দেখা হয় তাহলে কী হবে? সেই প্রশ্নের উত্তর আপাতত নেই। তবে দেশের মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হোয়াইটওয়াশ করলেও মহসিন নাকভি খুব সম্ভবত জানেন, সালমান আগার দলটার সামর্থ্যই নেই ফাইনালে যাওয়ার!