সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এমনটা হয়নি। বয়সভিত্তিক থেকে সিনিয়র, কোনো পর্যায়েই ফাইনাল মঞ্চে এতটা অসহায় লাগেনি বাংলাদেশের কোনো নারী ফুটবল দলকে। নেপালের পোখারায় গত শনিবার ভারতের কাছে ৪-০ গোলে হারের লজ্জায় ডুবতে হয়েছে অর্পিতা বিশ্বাসদের। অথচ ফাইনালের আগে তিন ম্যাচে কী অসাধারণ ফুটবলই না খেলেছিলেন মেয়েরা! গতকাল রবিবার বিকেলে ভাঙা মনে দেশে ফিরেছে দল। ভীষণ বিধ্বস্ত মেয়েরা। হতাশা ছুঁয়ে গেছে ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলারকেও। এমন হারের পর একটা টু শব্দ করেননি, কথা বলেননি সংবাদমাধ্যমে। বোঝাই গেছে, হারটা সহজে হজম করতে পারছেন না। হারের কারণ নিজের মনে খোঁজার চেষ্টা করছেন। অন্দরে খোঁজ নিয়ে যা বোঝা গেল, পোখারার ফিশটেইল, অন্নপূর্ণা, ধলাগিড়ি পর্বতের মতো বাংলাদেশের মেয়েদের বইতে হয়েছে চাপ নামক বিশাল পাহাড়। যে চাপ তাদের ভুলিয়ে দিয়েছিল স্বাভাবিক ফুটবল। চাপের মুখে এভাবে ভেঙে যেতে দেখাটাই বাটলারের জন্য বড় ভাবনার।
কোচের অবশ্য এই ব্যর্থতা নিয়ে পড়ে থাকার সুযোগ নেই। আজ থেকে তাকে শুরু করতে হবে ১ মার্চ অস্ট্রেলিয়ায় শুরু হতে যাওয়া ওমেন্স এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত প্রস্তুতি। তবে শনিবারের ফাইনাল কিছুটা হলেও বিভ্রান্ত করেছে তাকে। সিনিয়র দল রেখে তিনি নেপালে গিয়েছিলেন মূলত দুই উদ্দেশ্যে। প্রথমত, চেয়েছিলেন সিনিয়র দলের জন্য তরুণদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে বেছে নিতে। দ্বিতীয়ত, এপ্রিলে থাইল্যান্ডে ওমেন্স অনূর্ধ্ব-২০ এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বের জন্য দল গঠনের আগে চেয়েছিলেন পাইপলাইনে থাকাদের যাচাই করতে। প্রথম তিন লিগ ম্যাচে ছকে বাধা ফুটবলে কোচকে খুশি করেছিলেন অর্পিতারা। ফাইনালটাই ওলটপালট করে দিয়েছে সব। মেয়েদের মধ্য থেকে লড়াকু মানসিকতা কর্পূরের মতো উবে যেতে দেখে হতাশ হয়েছেন কোচ। অনেকে বলছেন, এটা নিছক একটা বাজে দিন। তাই বলে ফাইনালে এত বড় মার্জিনে হার! এতটা ছন্নছাড়া তার দল?
ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে যোগাযোগ করা হয়েছিল বাটলারের সঙ্গে। ঢাকায় ফেরা কোচ এড়িয়ে গেছেন সংবাদমাধ্যমকে। যোগাযোগমাধ্যমে কথা বলতে চাইলে শুধু বলেছেন, ‘নো কমেন্টস।’ দলের একজন অবশ্য পরিচয় গোপন রেখে বলেছেন, ‘আসলে চাপেই ভেঙে পড়েছে পুরো দল। সেটা শিরোপা জয়ের চাপ। যে করেই হোক জিততে হবে এমন একটা আবহ থাকলে তো চাপে পড়বেই সবাই। দু-একজন হলেও কথা ছিল। চাপটা গোটা দল নিয়ে নিলে কোচদের তো কিছুই করা থাকে না।’ এটা নিশ্চিত দলকে শিরোপার চাপটা দেননি কোচ বাটলার। দল-সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলেছেন, শিরোপা জিততেই হবে বাংলাদেশ শিবিরে এই আবহটা তৈরি করেছিলেন বাফুফের নারী ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার! পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই তিনি ছিলেন পোখারায়। ফাইনালের আগে দলকে শুভ কামনা জানাতে গিয়েই সর্বনাশটা করেছেন তিনি, মেয়েদের নাকি বলেছেন, ‘১০ মিনিটে এক গোল, ২০ মিনিটে দুই গোল করতে হবে!’ বাফুফের এক শীর্ষ কর্তার কাছ থেকে এমন প্রত্যাশার চাপটা সামলাতে পারেননি কোমলমতি ফুটবলাররা। বাটলারেরও কিছু করার নেই। বাফুফের নারী কমিটির চেয়ারম্যান মেয়েদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তো তাকে বারণ করার যায় না।
মেয়েরা যে চাপ নিয়ে খেলেছে, সেটা প্রথম মিনিট থেকেই বোঝা গেছে। ছন্নছাড়া বাংলাদেশই ভারতকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। লিগ পর্বে যারা এক গোলও দিতে পারেনি, তারাই গুনে গুনে চার গোল দেয়। এই বিপর্যয়ে দায় আছে সবার। বাটলার মাঝমাঠের দায়িত্ব দিয়েছিলেন মুনকি আক্তার ও জয়নব বিবি রিতাকে। মূলত ডিফেন্ডার জয়নব পারেননি ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করতে। তার জায়গায় প্রতিমা মান্ডা নেমেও পৌঁছাতে পারেননি। তাই মুনকি ছিলেন অসহায়। তা ছাড়া ৫১ মিনিটে তৃষ্ণা রানী সহজ গোলের সুযোগ নষ্ট না করলে গল্পটা অন্যরকম হতে পারত। সেটা হয়নি। উল্টো ১৭ মিনিটে তিন গোল হজম করে বাংলাদেশ ছিটকে যায় অনেক আগেই। সেই হারটাই ত্বরান্বিত হয়েছে আগের তিন ম্যাচে পোস্ট সুরক্ষিত রাখা গোলকিপার ইয়ারজানের জোড়া ভুলে।
যুবাদের ব্যর্থতায় চুপ মেরে গেছেন বাটলার। সামনে এখন বড় পরীক্ষা। মার্চে অস্ট্রেলিয়া ও এপ্রিলে থাইল্যান্ডের জন্য দুটি দল গড়তে হবে। তাই মাথা রাখতে হবে ঠা-া। এখানে ভুল হলে যে নিস্তার নেই।