বিশ্বের প্রথম ‘জেন-জি’ প্রভাবিত নির্বাচন বাংলাদেশে

বাংলাদেশ তার প্রথম ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্ম দ্বারা প্রভাবিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাক্ষী হতে যাচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্রে রেখে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল বদলে গেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্স।

নিষিদ্ধ হওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলের নির্বাচনে বিরোধী দলের রাজপথে উপস্থিতি ছিল সীমিত; অধিকাংশ সময় নির্বাচন বর্জন বা নেতাদের গ্রেপ্তারের কারণে কোণঠাসা থাকত বিরোধী শক্তি। কিন্তু এবার সেই চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে।

জয়ের পথে বিএনপি, শক্ত চ্যালেঞ্জ জামায়াত জোটের

এ নির্বাচনে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিএনপির জয়ের ব্যাপক সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। তবে ইসলামি দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট শক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী তরুণদের নিয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি) জামায়াত জোটের শরিক হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, তার দল ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এবং সরকার গঠনের জন্য পর্যাপ্ত আসন পাওয়ার ব্যাপারে তিনি আত্মবিশ্বাসী।

‘জেন জি’ ভোটারই মূল ফ্যাক্টর

ঢাকার সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, জনমত জরিপে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও একটি বড় অংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন। তিনি আরও বলেন, ফল নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে জেন-জি বা তরুণ ভোটাররা, যারা মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

পাল্টে গেছে নির্বাচনি মাঠ

রয়টার্সের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সারাদেশে এখন বিএনপির ধানের শীষ এবং জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পোস্টার-ব্যানার দৃশ্যমান। বিভিন্ন স্থানের দলীয় ক্যাম্প থেকে প্রচারণার গান বাজছে। অতীতের নির্বাচনগুলোতে যেখানে কেবল আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীকের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, এবারের চিত্র তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

জনমত জরিপে ইঙ্গিত মিলছে, একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামীর এবার সর্বোচ্চ নির্বাচনি সাফল্য অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে, যদিও তারা এককভাবে সরকার গঠনের অবস্থানে নেই। বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের ইসলামি মতাদর্শের চেয়ে তাদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তিই ভোটারদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।

স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি সুস্পষ্ট ফলাফল

বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে একটি সুস্পষ্ট নির্বাচনি ফলাফল জরুরি। শেখ হাসিনার পতনের পর কয়েক মাস ধরে চলা অস্থিরতায় তৈরি পোশাক শিল্পসহ প্রধান অর্থনৈতিক খাতগুলো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছিল।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এ নির্বাচনের ফলাফল শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতের প্রভাবের ভারসাম্যেও বড় প্রভাব ফেলবে।

ভারতের প্রভাব কমছে, চীনের উপস্থিতি বাড়ছে

শেখ হাসিনাকে ভারতপন্থী হিসেবে দেখা হতো এবং তার ক্ষমাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে অবস্থান বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব কমিয়ে দিয়েছে বলে রয়টার্স উল্লেখ করেছে। এতে করে চীনের কূটনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ভারতের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি সঙ্গতিপূর্ণ হলেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকার হলে তারা পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকতে পারে।

দুর্নীতি ও অর্থনীতি প্রধান উদ্বেগ

জরিপে উঠে এসেছে, ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের প্রধান উদ্বেগ দুর্নীতি, এরপরই রয়েছে মূল্যস্ফীতি। ভোটাররা ধর্মীয় ইস্যুর চেয়ে অর্থনীতি ও সুশাসনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তারেক রহমানই ফ্রন্টরানার

রয়টার্সের মতে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে ও বিএনপি নেতা তারেক রহমানই পরবর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে এগিয়ে থাকা প্রার্থী। তবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে থাকলে দলটির আমির শফিকুর রহমানও সম্ভাব্য দাবিদার হতে পারেন।

তরুণ ভোটারের আশা

প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ রাকিব বলেন, ভোটাররা আগে ভোট দিতে পারত না, কণ্ঠস্বর ছিল না। আমি আশা করি, যেই সরকারই আসুক, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করবে।