'ভারতীয়রা রাবার স্তরযুক্ত বিশেষ ব্যাট ব্যবহার করছে', লঙ্কান ক্রিকেটারের অভিযোগে তোলপাড়

টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চলাকালেই নতুন বিতর্কের জন্ম দিলেন শ্রীলঙ্কার ব্যাটার ভানুকা রাজাপাকসে। তাঁর দাবি, ভারতীয় ক্রিকেটাররা এমন ‘বিশেষ ব্যাট’ ব্যবহার করছেন, যেগুলো থেকে এমন শক্তি পাওয়া যাচ্ছে যা অন্যান্য ব্যাট দিয়ে সম্ভব না। 

মঙ্গলবার শ্রীলঙ্কার নিউজওয়্যারকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে রাজাপাকসে বলেন, “ভারতীয় ক্রিকেটারদের ব্যাট আমাদের পাওয়া সেরা ব্যাটের চেয়েও অনেক উন্নত। মনে হয় ব্যাটের ভেতরে যেন রাবারের একটি স্তর বসানো আছে। অন্য কেউ এই ধরনের ব্যাট কিনতেও পারে না—সব খেলোয়াড়ই বিষয়টি জানে।”
বিশ্বকাপে উপমহাদেশীয় কন্ডিশনে একের পর এক হাই-স্কোরিং ম্যাচের মধ্যেই এই মন্তব্য করেন শ্রীলঙ্কার এই পাওয়ার হিটার। রাজাপাকসের এমন বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং নতুন করে প্রশ্ন ওঠে—ভারতীয় ব্যাটাররা কি সত্যিই ‘বিশেষ প্রযুক্তির’ ব্যাট ব্যবহার করছেন?

এর মধ্যেই বিষয়টি নিয়ে পাল্টা ব্যাখ্যা দিয়েছে ব্যাট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় ক্রিকেট দলের ব্যাট কোনোভাবেই কেন্দ্রীয়ভাবে বা দলের জন্য আলাদা করে তৈরি করা হয় না। প্রত্যেক ক্রিকেটার নিজ নিজ স্পন্সরকৃত ব্যাট ব্যবহার করেন। এই ব্যাটগুলোর বেশিরভাগই তৈরি হয় ভারতের দুই প্রধান ব্যাট নির্মাণ কেন্দ্র—উত্তর প্রদেশের মিরাট এবং পাঞ্জাবের জলন্ধরে।

ভারতীয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্য ব্যাট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—এসএস, এসজি, এমআরএফ, সিয়াট, ডিএসসি ও বিএএস।
তবে ব্যাটের কাঠ বা উইলো আসে মূলত ইংল্যান্ড থেকে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট ব্যাটের কাঁচামাল আসে যুক্তরাজ্যের উইলো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে, যার মধ্যে জে এস রাইট অ্যান্ড সন্স অন্যতম।

ভারতে এসব উইলো ক্লেফট এনে খেলোয়াড়দের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাটের ওজন, ব্যালান্স, স্পাইন, এজের পুরুত্ব এবং প্রোফাইল কাস্টমাইজ করা হয়। নির্মাতাদের ভাষায়, এই কাস্টমাইজেশনই পার্থক্য গড়ে দেয়—কোনো অবৈধ প্রযুক্তি নয়।

এ প্রসঙ্গে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, রাজাপাকসা নিজেও অতীতে আইপিএলে এসএস ব্র্যান্ডের ব্যাট ব্যবহার করেছেন।
সম্প্রতি গৌহাটিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি–টোয়েন্টি ম্যাচে অভিষেক শর্মার ২০ বলে ৬৮ রানের ঝোড়ো ইনিংসের পর তাঁর ব্যাট পরীক্ষা করে দেখেন প্রতিপক্ষ ক্রিকেটাররা—সে দৃশ্য ভাইরাল হওয়ার পরই আবার নতুন করে ‘বিশেষ ব্যাট’ বিতর্ক মাথাচাড়া দেয়।

কিন্তু নির্মাতারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, আধুনিক যুগের প্রায় সব আন্তর্জাতিক ব্যাটেই আগের চেয়ে মোটা এজ, বেশি স্পাইন এবং তুলনামূলক ভরাট প্রোফাইল থাকে। আইসিসির নিয়মের ভেতর থেকেই এসব ডিজাইন করা হয়, যাতে ব্যাটের সুইট স্পট থেকে রিবাউন্ড সর্বোচ্চ পাওয়া যায়।

  • আইসিসির আইন অনুযায়ী,
    * ব্যাটের ব্লেড অবশ্যই শুধুমাত্র কাঠ দিয়ে তৈরি হতে হবে,
    * ব্লেডের ভেতরে কোনো ধরনের বিদেশি উপাদান (যেমন রাবার বা স্প্রিং) ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ,
    * কেবল ব্যাটের বাইরের অংশে সুরক্ষার জন্য নন–রিজিড কভার বা অ্যান্টি–স্কাফ শিট ব্যবহার করা যেতে পারে,
    * নির্ধারিত আকার ও ব্যাট-গজ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে কোনো ব্যাট ম্যাচে ব্যবহার করা যায় না।

আইসিসি ইভেন্টে প্রতিটি ম্যাচেই ম্যাচ অফিসিয়ালদের মাধ্যমে ব্যাট পরীক্ষা করা হয়। ফলে ব্যাটের ভেতরে রাবারের স্তর থাকলে তা তাৎক্ষণিকভাবেই ধরা পড়ার কথা। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও ক্রিকেট বিশ্লেষকদের অভিমত, ভারতীয় ক্রিকেটারদের ব্যাট কোনোভাবেই অবৈধ, রহস্যময় বা প্রযুক্তিগতভাবে বাড়তি সুবিধাসম্পন্ন নয়। এগুলো মূলত উচ্চমানের ইংলিশ উইলো দিয়ে তৈরি, আধুনিক ব্যাটিংয়ের চাহিদা অনুযায়ী কাস্টমাইজড এবং পুরোপুরি আইসিসির নিয়ম মেনেই ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেন, অতীতেও এমন অভিযোগ উঠেছে। নব্বইয়ের দশকে অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি রিকি পন্টিংয়ের ব্যাট নিয়েও ‘স্প্রিং-লোডেড ব্যাট’-এর গুজব ছড়িয়েছিল, যা কখনোই প্রমাণিত হয়নি।

সব মিলিয়ে, রাজাপাকসের ‘রাবার স্তরযুক্ত ব্যাট’ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, আধুনিক টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ের বিবর্তনই মূলত বদলে দিয়েছে ছক্কা মারার ধারণা—ব্যাট নয়, বদলে গেছে ব্যাটিংয়ের ক্ষমতা ও টাইমিংয়ের মাত্রা।