এ পৃথিবী আম-মানুষের। জ্যান্ত অবলম্বন, সর্বহারা, মৃত মানুষের অজস্র ছোট ছোট কোষের বৃত্তান্ত, ধুলোওড়া সমাজের ভূমিগর্ভ থেকে অনেক ওপরে বাস করা ঈশ্বরের মতো ক্ষমতাবান গুটিকয়েক (অ)মানুষের দরুন পৃথিবীর গভীর থেকে গভীরতর অসুখ এখন। সব আলো নিভু নিভু। নাকের বাতাসে, চোখের আকাশে, বোধের স্তরে স্তরে যুদ্ধ, রক্ত, ধর্ষণ, উচ্ছেদ বেষ্টিত সামাজিক, রাজনৈতিক উপলব্ধির প্রজ্ঞা এবং সচেতনতা তথা রাষ্ট্রের আবরণ ফুঁড়ে তামাম মানুষের নিষ্পেষণের বৃত্তান্তে হাহাকার তোলে সন্তানের আর্তচিৎকার, ‘মা কোথায়’।
আম-মানুষের পশ্চাৎ কাহিনির ইজেল থেকে চুইয়ে পড়ছে নানাবিধ ক্ষতের রক্ত। অবলীলায় বোনা সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সংকটের চিত্রাবলির বস্ত্র, যার আখ্যানের অন্তর্নিহিত বার্তা হলো সবকিছুর পরেও বাঁচতে হবে। বৃক্ষ শেষ, নদী শেষ, বাতাস শেষ, খাবার শেষ, দেশও শেষ। পূর্বপুরুষের পিঠে রক্তজবার মতো লাল দাগের ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়া বাঙালির জীবনে স্বাধীনতার পরপরই দুর্ভিক্ষ নেমে আসে, পোকামাকড়ের মতো মানুষ মেরে কিছু মানুষ আরও বেশি আশরাফুল মাখলুকাত হয়ে ওঠে এবং সেসব দৃশ্য ঈশ্বর মন দিয়ে দেখতে দেখতে শিল্পকলার ছাদে বসে কফি খান। তাতে ফিলিস্তিন শিশুশূন্য হয়, পাকিস্তানে মসজিদে বোমা হামলায় মানুষ মরে, দীপু চন্দ্র দাস, চঞ্চলরা আগুনে জ্বলে ওঠে কী সুন্দর!
এই বহুবিবাহের দেশে, বহু জন্মহারের দেশে, নারীকে ঘরবন্দি করার মজিদ মার্কা পুরুষের দেশে লালসালুর জমিলা ও আক্কাসকে বেশি দরকার। ধর্ম ও ধার্মিকে ভরা দেশ অথচ দুধের শিশুকে বিক্রি কিংবা
রাস্তায় ফেলে চলে যাচ্ছে বাবা-মা, ফ্রক পরা শিশুকে ধর্ষণ করছে চল্লিশোর্ধ্ব পুরুষ, পাচার হয়ে যাচ্ছে শিশু-নারী। তেমনই শৈশবকালে বিক্রীত মানিক শিকড়ের খোঁজে হল্যান্ড থেকে এসে দিকভ্রান্ত, হতাশ, নেতিবাচক মনে কেরানীগঞ্জে ঘোরাঘুরি করে একা। বুড়িগঙ্গায় সন্ধের সংরাগ ঞযব ডধংঃব খধহফ হয়ে ওঠে। আত্মানুসন্ধানে আসা মানিকের মন কেন নেতিবাচকতায় ভরা? দারিদ্র্য মানুষকে ধর্মহীন করে, বিপথে চালিত করে, ভয়ংকর অপরাধের পথ অবলম্বন করতেও পিছপা হয় না। দারিদ্র্যপূর্ণ, গোঁড়ামির আখড়াস্থল বাংলাদেশ, এখান থেকে সত্য মানুষ খুঁজে বের করা কঠিন। মানিক এসব মানে কিন্তু তারপরও মনের টানে, বিবেকের তাড়ানায় বারবার ফিরে আসে, যদি মাকে খুঁজে পাওয়া যায়। পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই, মিরাকলও ঘটে কতজনের জীবনে, তারও যদি এমন কিছু হয়! তাই মানিক ফিরে আসে জ্যামের শহরে, নোংরা শহরে, বৃক্ষহীন ভয়ংকর শহরে। একা একা কেরানীগঞ্জে হেঁটে বেড়ায়, ধুলো মাখে, বাতাস মাখে, সর্বোপরি মানুষ মাখে। এখানেই তার বাবা-মায়ের আবাস ছিল, এখানেই সে জন্মেছিল, এই ভাবনা তাকে তাড়া করে ফেরে। হল্যান্ডের মতো ধনী, বিলাসী জীবন তাকে আটকে রাখতে পারে না। মানিক অস্তিত্ব খুঁজতে, কিংবা অস্তিত্বের প্রতিবেশ অনুভব করতে উন্মত্ত হয়ে ওঠে। পাওয়া না পাওয়া, দেখা না দেখা বাবা-মায়ের বাতাসে অক্সিজেন নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। মানিক কোনো কিছুর জন্য দেশ, মা, মাটি ত্যাগ করতে রাজি নয়। ‘যদি আমার মা আমাকে বলত, দ্যাখ, তুই যদি আমার সঙ্গে থাকিস, তাহলে খেতে না পেয়ে মরে যাবি, আর যদি অন্য লোকদের সঙ্গে অন্য দেশে চলে যাস, তাহলে বেঁচে
থাকবি, খেতে-পরতে পাবি, বড়লোক হবি, যদি সে আমাকে বলত, তুই কোনটা চাস? আমি তাকে বলতাম, ওকে, লেট মি ডাই উইথ ইউ, ডোন্ট থ্রো মি অ্যাওয়ে!’ সংস্কৃত ভাষায় একটা কথা আছে, ‘জননীং জন্মভূমি স্বর্গাদপি গরীয়সী’ অর্থাৎ মা ও জন্মভূমি স্বর্গের থেকে শ্রেষ্ঠ। মানিকের এদেশে আসা যেন তারই উল্লেখ, ‘জন্মভূমিতে ফিরে গেলে কেমন অনুভূতি হতে পারে, কেমন লাগতে পারে সেখানকার মানুষগুলোকে দেখে, তাদের সঙ্গে কথা বলতে... আমি এসেছি এসব ভেবে।’ মায়ের মুখ মানিকের মনে পড়ে না, তবু তাকে খুঁজে ফেরার ক্ষান্তিহীন, ক্ষমাহীন, করুণ কাহিনি মশিউল আলম এত সাবলীল, প্রাঞ্জল ভাষায় লিখেছেন, যা পড়তে পড়তে দেখতে পাওয়া যায়, যেন সবকিছু ঘটছে চোখের সামনে। কিন্তু মানিক তার মাকে খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে সন্দিহান কেন? এটা কি বাঙালির মজ্জাগত নাকি বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য স্বাভাবিক ধারণা? উপন্যাসে (?) এই বিষয়টি স্পষ্ট না থাকলেও মানিক, জামিল, লিন্ডা চরিত্ররা এত সহজ, অকপট, সাবলীল ও ব্যক্তিত্ববান যে তাদের এড়িয়ে যাওয়া যায় না, তুচ্ছ করা যায় না, আয়ত্তে আনাও যায় না, কিন্তু খুব করে বন্ধুত্ব করা যায়। জামিল চরিত্রে লেখকের ব্যক্তিগত ছাপ স্পষ্ট ও টেকসই। মানিক চরিত্রে রহস্যময়তা, অস্তিত্ব অন্বেষণ, নেতিবাচক মনোভাব চরিত্রের গতিমুখ ঝরঝরে করে উপন্যাসকে আকর্ষণীয় করেছে। লিন্ডা চরিত্রের মধ্যে হল্যান্ডের প্রেম, দাম্পত্য, বিচ্ছেদের বিষয়াদি নারীবাদী মনস্তত্বে এগিয়ে। নারীর শরীর, যৌনতা প্রকৃতির অংশ, স্বাভাবিক একটা বিষয় অথচ তা নিয়ে বাঙালি পুরুষের মিথ, টানাপড়েন তুঙ্গে। আমাদের সমাজে ছেলেমেয়েদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয় না, নারী মাত্রই দুর্বল, বিবাহিত মানুষের বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা নীতি বিরুদ্ধ। সমাজ, ধর্ম এ ব্যাপারে একাট্টা। কিন্তু সৎ
থাকা, দেশপ্রেমিক হওয়া, টাকা পাচার না করা, ধর্ষণ-বলাৎকার না করা বিষয়গুলো অতটা পাত্তা পায় না। এদিক থেকে হল্যান্ড বা লিন্ডা এগিয়ে, তারা হটকারী নয়। সে বলে, ‘আমি আগে যাকে ভালোবাসতাম, তাকে সত্যিই ভালোবাসতাম। এখন যাকে বাসি, তাকেও সত্যিই ভালোবাসি।’ অথচ আমাদের সমাজে তার উল্টোটা ঘটে। বাঙালি নারীর নিগৃহীত ও নিষ্পেষিত হওয়ার আবহমান ইতিহাস বলে নারীকে সেবামুখী, দাসীবৃত্তিতে নিয়োজিত করার সব রকম মসলায় পারদর্শী পুরুষমাত্রই মনুষ্যত্বহীন। এ জন্যই এদেশের পুরুষরা নারীদের শিক্ষিত করতে চায় না, চাকরি করতে বাধা দেয়। নারী স্বাবলম্বী হলে পুরুষের সব রকমের বাহাদুরির বিনাশ হবে। বাঙালিত্ব সংকট, সংস্কৃতি সংকটের সঙ্গে নারী জাগরণ সংকটও বড় হয়ে উঠেছে ইদানীং। তাই তো নারীর পাশে বসে বক্তৃতা দিতে ভয় পায় পুরুষ, নারীকে নমিনেশন দিতে ভয় পায় রাজনৈতিক দল।
উপন্যাসের ভাষা সহজ, গতিময় ও সুন্দর, সাদামাটা একমুখী কাহিনির রূপ-প্রতিরূপ মিহিদানার মতো স্বচ্ছ, উপমা অলংকার ব্যবহারের বাহুল্য বা কৃত্রিম বয়ান উপস্থাপনের কারসাজি নেই। খুব তাড়াতাড়ি, চিন্তাভাবনা না করেই, এফএম বন্ধ বা চালু করে, বাসে, ট্রেনে, সমুদ্রের পাড়ে বেড়াতে গিয়ে একদমে পড়ে ফেলা যায়। পার্শ্বচরিত্রের ব্যাপ্তি ও গভীরতা থাকলে উপন্যাসের হৃদয় ও শরীর পাকাপোক্ত হতো বেশি। রাজনৈতিক ও নাগরিক সমস্যা ও ঘটনাবলির আঁচড়গুলো আরও তীব্র ও তীক্ষèতার দাবি রাখে। শেষটা আরও রহস্যময় ও আকর্ষণীয় করা গেলে পাঠক মনে ছাপ ও আঘাতটা বেশি করে লাগত। উপন্যাসের সবচেয়ে ভালো দিক এর শব্দচয়ন, বাক্যনির্মাণ ও আবেগের যুক্তিশীল উপস্থাপন। সুন্দর ও সত্যের অন্বেষা, অজানা ও অচেনাকে হৃদয়ে ধারণ করে মানুষের মহত্ত্বকে ও জীবনের মহিমাকে প্রতিষ্ঠিত করাই শিল্প ও শিল্পীর কাজ। সৌন্দর্য ও রসসৃষ্টির দিক থেকে মশিউল আলম যথেষ্ট এগিয়ে। পাঠক চরিত্র ও পরিবেশের সঙ্গে একাত্ম হয়ে অনুভব করবেন সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশায় ভরা বাংলাদেশ। সত্য কাহিনির ছায়ায় রচিত এক মানবিক কাহিনি পাঠককে স্পর্শ করবে গভীরভাবে, স্পৃষ্ট করবে সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতে।