বিএনপির মন্ত্রিসভায় বঞ্চনার শিকার খুলনা

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ৪৯ জন স্থান পেলেও খুলনা জেলায় বিএনপি থেকে নির্বাচিত চারজন সংসদ সদস্যের কেউ স্থান পাননি। ফলে বিএনপির নেতাকর্মীসহ খুলনার মানুষ এবং নাগরিক নেতারা হতাশ হয়েছেন। তাদের অভিমত বিভাগীয় শহর এবং বন্দর ও শিল্প নগরী হিসেবে খুলনাকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা উচতি ছিল। কিন্তু সেই কাক্সিক্ষত মূল্যায়ন না হওয়ায় খুলনা বঞ্চনার শিকার হয়েছে। এতে উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করবে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা জেলার ৬টি আসনের মধ্যে চারটিতে জয়লাভ করেন বিএনপি প্রার্থীরা। এরমধ্যে খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলি আসগর লবি খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারকে হারিয়ে জয়লাভ করেন। খুলনা-১ আসন (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) থেকে বিএনপির প্রার্থী আমীর এজাজ খান জামায়াতে ইসলামীর আলোচিত প্রার্থী ডুমুরিয়া উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর হিন্দু কমিটির সভাপতি কৃষ্ণনন্দীকে হারিয়ে জয়লাভ করেন। এছাড়া খুলনা-৩ (দৌলতপুর, খালিশপুর-খানজাহান আলী ও আড়ংঘাটা) বিএনপির প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল ও খুলনা-৪ (রূপসা-দিঘলিয়া-তেরখাদা) আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের তথ্যবিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল প্রতিপক্ষ দলের প্রার্থীদের হারিয়ে বিজয়ী হন। নির্বাচনের পর খুলনার মানুষ আশা করেছিল এবার খুলনায় বিএনপি থেকে নির্বাচিত কাউকে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দেওয়া হবে। কিন্তু ২৫জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীর সভায় কেউ ঠাঁই না পাওয়ায় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী, নাগরিক নেতা ও সাধারণ মানুষ চরমভাবে হতাশ হয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির কর্মী মাসুদুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারকে হারিয়ে আলি আসগর লবি বিজয়ী হলেও তাকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়নি। এটা বিএনপির নেতাকর্মীদের কষ্ট দিয়েছে।

খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন বলেন, আমরা আশা করেছিলাম বিভাগীয় শহর হিসেবে খুলনাকে এক নম্বরে রাখা হবে। কিন্তু আমরাসহ খুলনাবাসী হতাশ হয়েছে। খুলনার ৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে আমরা ৪টিতে জয়লাভ করেছি। কাজেই মন্ত্রিসভায় কাউকে স্থান না দেওয়ায় হতাশ হয়েছি।

খুলনা মহানগরীর কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত খুলনা দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যায় জর্জরিত। পাটকল বন্ধ, গ্যাস নেই, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির, উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। এসব বাস্তবতায় মন্ত্রিসভায় খুলনার একজন শক্তিশালী প্রতিনিধি থাকলে উন্নয়ন কর্মকান্ডে গতি আসত ও কর্মসংস্থান বাড়ত বলে তাদের প্রত্যাশা ছিল। তাদের সে প্রত্যাশা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু মন্ত্রিসভায় খুলনার কেউ না থাকায় এ সম্ভাবনা নিয়ে আমরা সন্দিহান।

তিনি আরও বলেন, দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে খুলনার মানুষ আশা করেছিল মন্ত্রিপরিষদে গিয়ে এই অবহেলিত মানুষের উন্নয়ন নিয়ে অন্তত একজন হলেও কথা বলবে। কিন্তু আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। এতে শুধু খুলনার মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সারা দেশের মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ-জামান বলেন, বরাবরের মতো এবারও খুলনার মানুষ বৈষম্যের শিকার হয়েছে। খুলনার মানুষ আশা করেছিল, খুলনা থেকে একজন সংসদ সদস্যকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হবে। কিন্তু তা দেওয়া হয়নি। খুলনার সঙ্গে এটা বড় বঞ্চনার আরেকটা উদাহরণ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও বলছেন, খুলনা দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবনসংলগ্ন এ অঞ্চলের নানা ইস্যু জাতীয় পর্যায়ে জোরালোভাবে তুলে ধরার জন্য মন্ত্রিসভায় সরাসরি প্রতিনিধিত্ব প্রয়োজন ছিল। সেই প্রতিনিধিত্ব থেকে খুলনাকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন ইউসুফ। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান খুলনা-৩ (খালিশপুর-দৌলতপুর-খানজাহান আলী) আসনের সংসদ সদস্য বেগম মন্নুজান সুফিয়ান। ২০১৪ সালে গঠিত মন্ত্রিসভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। পরে তাকে পূর্ণমন্ত্রী করা হয়। ২০১৯ সালের সরকারে আবারও শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান বেগম মন্নুজান সুফিয়ান। ২০২৪ সালের সর্বশেষ সরকারে ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান নারায়ণ চন্দ্র।