সত্যের সন্ধানে সালমান ফারসি

ইসলামের ইতিহাসে যেসব সাহাবির জীবন সত্য অনুসন্ধানের জীবন্ত দলিল, তাদের মধ্যে অন্যতম হজরত সালমান ফারসি (রা.)। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার চরিত্র, নিষ্ঠা ও কল্যাণকামী মানসিকতার কারণে তাকে ‘সালমানুল খাইর’ (কল্যাণের সালমান বা কল্যাণের নিরাপদ বাহক) উপাধিতে ভূষিত করেন। এই মহান সাহাবির জীবন যেন দীর্ঘ সাধনার পথচিত্র। যেখানে রয়েছে ত্যাগ, বেদনা, দাসত্ব, বিচ্ছেদ এবং শেষে সত্যের আলোতে পৌঁছানোর পরম তৃপ্তি। তার সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণী উল্লেখ করা হলো।

জন্ম ও বংশ : সালমান ফারসি (রা.) জন্মগ্রহণ করেন পারস্যের ইসফাহানের এক অগ্নিপূজক পরিবারে। তার পিতা ছিলেন কঠোর প্রকৃতির এবং অগ্নিপূজায় অত্যন্ত অনুরক্ত। শৈশব থেকেই সালমানকে অগ্নিমন্দির দেখভাল করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু অন্তরের গভীরে সত্যের প্রতি এক অদম্য টান তাকে সেখানে স্থির থাকতে দেয়নি।

সত্যানুসন্ধান : একদিন পিতার নির্দেশে একটি নির্মাণকাজ পরিদর্শনে গিয়ে পথিমধ্যে একটি গির্জার সামনে এসে দাঁড়ান তিনি। ভেতর থেকে ভেসে আসা প্রার্থনার ধ্বনি, বিনয়ভরা আহ্বান ও স্রষ্টার উদ্দেশ্যে নিবেদনের দৃশ্য তার হৃদয়কে নাড়া দেয়। তার মনে হলো, এই উপাসনা আগুনের পূজা করার চেয়ে অনেক বেশি অর্থবহ। এখান থেকেই শুরু হয় তার সত্যানুসন্ধানের যাত্রা।

দেশত্যাগ : কিশোর সালমানের বাবা তার পরিবর্তন বুঝতে পেরে তাকে শিকলে আবদ্ধ করে রাখেন। কিন্তু সত্যপিপাসু মনকে তো শিকলে বেঁধে রাখা যায় না। সুযোগ বুঝে তিনি গির্জায় সংবাদ পাঠান, সিরিয়া থেকে কোনো কাফেলা এলে যেন তাকে জানানো হয়। সংবাদ এলে শিকল ভেঙে তিনি ইসফাহান ত্যাগ করে সিরিয়ার পথে রওনা হন।

সিরিয়ায় পৌঁছে তিনি খ্রিস্টানদের কাছে জিজ্ঞেস করেন, কারা প্রকৃত ধর্মজ্ঞ? তারা তাকে এক পাদ্রির কাছে নিয়ে যায়। সালমান তার কাছে নিজের আকুলতা প্রকাশ করেন যে, তিনি এই ধর্মের শিক্ষা নিতে চান, তার সান্নিধ্যে থাকতে চান। পাদ্রি তাকে আশ্রয় দেন এবং ধর্মীয় শিক্ষা দেন। কিন্তু কিছুদিন পর সালমান লক্ষ্য করেন, এই পাদ্রির কথা ও কাজের মধ্যে ভয়াবহ অমিল। মানুষের কাছ থেকে সম্পদ আহরণই যেন তার আসল উদ্দেশ্য। এতে সালমান আবার হতাশ হন।

এই পাদ্রির মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত হন একজন নেককার ও দুনিয়াবিমুখ সাধক। তার কাছে সালমান প্রকৃত ধর্মীয় স্বাদ পান। কিন্তু তিনিও মৃত্যুশয্যায় পৌঁছালে সালমান দিশাহীন হয়ে পড়েন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, এরপর কোথায় যাবেন? পাদ্রি তাকে ইরাকের মুসেল শহরের একজন সৎ ধর্মগুরুর সন্ধান দেন।সালমান সেখানে যান। কিছুদিন পর সেই ধর্মগুরুও ইন্তেকাল করেন এবং তাকে ইরাকের এক সাধকের কাছে পাঠান। এভাবেই একের পর এক শহর মুসেল, নসীবেইন, আম্মুরিয়া পেরিয়ে চলতে থাকে তার সত্যের সন্ধান। প্রতিজন ধর্মগুরুই মৃত্যুর আগে একই কথা বলেন, ‘সঠিক দ্বীন বিকৃত হয়ে গেছে, প্রকৃত ধর্মের অনুসারী খুব কম।’

নবীজির আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী : শেষ পাদ্রি মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে সালমানকে এক যুগান্তকারী সংবাদ দেন। তিনি বলেন, ‘আরব ভূমিতে শিগগিরই শেষ নবীর আবির্ভাব ঘটবে। তিনি ইবরাহিম (আ.)-এর দ্বীন পুনর্জীবিত করবেন। তিনি সদকা গ্রহণ করবেন না, কিন্তু উপহার গ্রহণ করবেন। তার দুই কাঁধের মাঝখানে নবুয়তের সিলমোহর থাকবে। তিনি হিজরত করবেন খেজুরবাগানে ঘেরা এক জনপদে।’

এই সংবাদ সালমানের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নিজের সঞ্চিত সম্পদ ও পশুর বিনিময়ে তিনি আরব বণিকদের সঙ্গে আরবের পথে যাত্রা করেন।

নবীজির সান্নিধ্যে : একদিন তিনি শুনতে পান, মক্কা থেকে কুবায় এক মহান ব্যক্তি আগমন করেছেন, যাকে মানুষ নবী বলে মনে করছে। এ কথা শুনে তার হৃদয় আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠে। সুযোগ পেয়ে তিনি কিছু খেজুর নিয়ে নবীজি (সা.)-এর দরবারে হাজির হন। প্রথমবার তিনি খেজুরগুলো সদকা হিসেবে পেশ করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে সেগুলো গ্রহণ না করে দরিদ্র সাহাবিদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। এতে সালমান ফারসি (রা.) পাদ্রির বলে দেওয়া তিনটি আলামতের প্রথমটির সত্যতা বুঝতে পারেন। পরদিন আবার তিনি উপহার হিসেবে খেজুর পেশ করলে নবীজি (সা.) তা নিজে গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে দ্বিতীয় আলামতও প্রমাণিত হয়ে যায়। এরপর নবুয়তের মোহর দেখে সালমান ফারসি (রা.) আর এক মুহূর্ত দেরি না করেই ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন।

যুদ্ধজীবন : হিজরতের পঞ্চম বছরে শাওয়াল মাসে যখন কোরাইশ ও তাদের মিত্র গোত্রগুলো মদিনা আক্রমণের জন্য বিশাল বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হয়, তখন মুসলমানরা মারাত্মক সংকটে পড়ে। নবীজি (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শে বসেন, কীভাবে এই বিপদ মোকাবিলা করা যায়।

সেই পরামর্শ সভায় হজরত সালমান ফারসি (রা.) তার পারস্যের অভিজ্ঞতা থেকে এক অভিনব প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, ‘শত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে মদিনার উন্মুক্ত অংশে পরিখা খনন করা যেতে পারে।’ আরবরা এই কৌশল জানত না। নবীজি (সা.) তার প্রস্তাব পছন্দ করেন এবং তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন।

মদিনার উত্তর দিকটি ছিল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানেই পরিখা খননের কাজ শুরু হয়। প্রতি দশজন সাহাবিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পরিখা খননের দায়িত্ব দেওয়া হয়। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শ্রম দেন। এভাবেই সালমান ফারসি (রা.) শুধু সত্যের সন্ধানেই নয়, ইসলামের প্রতিরক্ষায়ও এক অনন্য অবদান রেখে যান।

জীবন সায়াহ্নে : হজরত আবু সুফিয়ান (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) হজরত সালমান ফারসি (রা.)-এর অসুস্থতার সময় তার সেবাশুশ্রƒষায় উপস্থিত হন। তখন হজরত সালমান ফারসি (রা.) অশ্রুসজল হয়ে পড়েন। তার চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু ঝরতে থাকে।

এ দৃশ্য দেখে হজরত সাদ (রা.) বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কেন কাঁদছেন? আপনি তো শিগগিরই আপনার প্রিয় সাথিদের সঙ্গে মিলিত হবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাউজে কাউসারের নিকট অবতরণ করবেন। নবীজি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন এমন অবস্থায় যে, তিনি আপনার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন।’

তখন হজরত সালমান ফারসি (রা.) উত্তর দিলেন, ‘আমি মৃত্যু আসছে বলে কাঁদছি না, আবার দুনিয়ার প্রতি কোনো মোহ থেকেও নয়। কিন্তু আমি কাঁদছি এই কারণে যে, নবীজি আমাদের কাছ থেকে যে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, আমি তা পুরোপুরি রক্ষা করতে পারিনি। নবীজি আমাদের উপদেশ দিয়েছিলেন, তোমাদের প্রত্যেকের দুনিয়ার সম্বল যেন হয় ঠিক একজন মুসাফিরের সফরের সামগ্রীর মতো, এর বেশি নয়। অথচ আজ দেখুন, আমার চারদিকে দুনিয়ার এসব বস্তু জমে আছে, যেগুলো আমার কাছে কালো সাপের মতো মনে হচ্ছে।’ এ কথা বলে তিনি পুনরায় কান্নায় ভেঙে পড়েন।

হজরত সালমান ফারসি (রা.) যেসব জিনিসকে ‘কালো সাপ’ বলে আক্ষেপ করছিলেন, বাস্তবে সেগুলো ছিল একটি কাপড় ধোয়ার পাত্র, একটি পান করার পেয়ালা এবং একটি ছোট লোটা মাত্র। (কানজুল উম্মাল ২/১৪৭)

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা