অমর একুশে বইমেলার দর্শন কি বদলে যাচ্ছে

আশির দশকের একেবারে গোড়ার দিক। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের সীমিত পরিসরে বইমেলা হতো। ব্যবসা প্রকাশকদের কাছে তখনকার বইমেলায় মুখ্য বিষয় ছিল না! যদিও তখনো প্রসঙ্গসূত্র ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি! বইমেলাটির নাম তখনো অমর একুশে বইমেলা হয়ে ওঠেনি! সাকল্যে পনেরো-কুড়িটি স্টল থাকত। বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা ছিল মেলার সময়সীমা। বইমেলাকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন বই প্রকাশের প্রবণতাও তখনো তেমন শুরু হয়নি। সন্ধ্যায় খোলা মাঠে ছোটখাটো আড্ডা বসত লেখকদের। সেই মেলাকে কোনোভাবেই জমজমাট বইমেলা বলা যাবে না। কিন্তু সেই স্নিগ্ধ বইমেলার কথা আজও আমার মনে পড়ে। কারণ মেলায় যে সামান্য সংখ্যক মানুষের দেখা পাওয়া যেত সেখান তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় থাকতেন বইপ্রেমী।

দেশের বিশিষ্ট লেখকদের সামনাসামনি দেখার লোভে প্রায়ই আমি বইমেলায় যেতাম। স্পষ্ট মনে আছে ১৯৮১ বা ১৯৮২ সালের কথা। সেবার সন্ধানী প্রকাশনীর আকর্ষণীয় স্টলসজ্জার শিল্পী ছিলেন কাইয়ুম চৌধুরী। বিখ্যাত লেখকদের অনেকেই সেই স্টলে আড্ডা দিতেন। বাংলা একাডেমির বইমেলাতেই আমি বাংলাদেশের সাহিত্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখককে প্রথমবারের মতো দেখেছি।

বইমেলার মাঠ থেকে টেলিভিশনে সরাসরি অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছি বহু বছর ধরে। এসব ক্ষেত্রে বলে আসছি, বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলা ছিল যতটা না বইয়ের মেলা, তার চেয়ে বেশি দেশের উদীয়মান বাঙালি মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক মনন-বিকাশের এক নতুন পরিসর। ভাষা-আন্দোলনের আত্মত্যাগের দিন ২১ ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাংলা একাডেমি নানা আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে এসেছে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে জনসমাগমমুখর বইমেলার আয়োজনও সেই সূত্রেই দেখা দেয়। নবীন বাংলাদেশে প্রকাশনা সংস্থা তখন হাতেগোনা। তখনই মনে হতো, ব্যবসা হিসেবে পুস্তক-প্রকাশনা খাতকে এগিয়ে নেওয়া জরুরি ছিল। কারণ শিল্প-সংস্কৃতির চর্চাকে ধারণ করতে হলে বইকেন্দ্রিক বাণিজ্য-সংস্কৃতিরও উৎকর্ষ প্রয়োজন। মনে করিয়ে দিতাম, বই-সংক্রান্ত ভাবনাকে তাই তার সব বাণিজ্যিক বাস্তবতাসহ ভাবতে হবে। এসব প্রসঙ্গ আলোচনায় এলেও আজ স্মৃতি হাতড়ে দেখতে পাচ্ছি, আমরা এই বইমেলাটিকে প্রায় সবসময়ই কেবল ব্যবসাকর্ম হিসেবে না দেখে সাংস্কৃতিক কর্ম হিসেবে বিবেচনা করে এসেছি! প্রতি বছরই বাড়তে দেখেছি বইমেলায় স্টল সংখ্যা বৃদ্ধির চাপ। স্থান সংকুলান না হওয়ায় বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে এর আয়তন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রসারের চাপ বাড়তে থাকে। কারও কারও কাছ থেকে প্রস্তাব আসে সম্প্রসারিত বইমেলাটির জন্য নতুন স্থানের সন্ধান করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশের বৌদ্ধিক মহল সবসময় বলে এসেছে এই বইমেলাটি কেবল বই বিক্রির মেলা নয়! এর সঙ্গে মাতৃভাষা প্রেমের দায় আছে। প্রতিষ্ঠান হিসাবে বাংলা একাডেমি মাতৃভাষা চেতনার প্রতীক বলে এর সঙ্গে সম্পর্কিত না হলে সেখানে জনসমাগম কমে যাবে।

কিন্তু যারা বইমেলাটিকে কেবল সাংস্কৃতিক কর্ম হিসেবে দেখেছেন তারা মনে করতেন যদি কেবল বাংলা একাডেমির ব্যবস্থাপনার গণ্ডিতে বিষয়টিকে আবদ্ধ রাখা হয় এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করে বিকাশের প্রত্যাশা করা হয়, তাহলে বর্তমান অবস্থার সম্প্রসারণ ছাড়া আর কিছুই ঘটবে না। অমর একুশের চেতনা বা জাতীয় মননের উৎকর্ষ-আকাক্সক্ষা যেমন তাতে খুব অগ্রসর হবে না, তেমনি বাণিজ্যিকতাও তার স্বাভাবিক বিকাশ পাবে না।

শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগের যে প্রত্যাশা এখানে উত্থাপিত হচ্ছে, তা তত্ত্বগতভাবে অসম্ভব নয় নানা দেশেই তার দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু বাংলাদেশে অদূর ভবিষ্যতে তা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। দীর্ঘকালের বিরাজনীতিকরণ এবং রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিস্তারে এমন উদ্যোগ প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। উন্নয়ন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রাষ্ট্রের উদ্ভবের এই দুই পরিপ্রেক্ষিত দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত ও অপব্যবহৃত হয়েছে। বই-সংস্কৃতির খাতও সেই প্রক্রিয়ার বাইরে নয়। ফলে প্রসঙ্গটি উত্থাপিত হলে উত্তরণের সম্ভাবনা অনুভব করা কঠিন হয়। তবু আশার সম্পূর্ণ অবসান হয়নি। উন্নয়ন ও বিত্তের বিস্তারের মধ্য দিয়ে যে সামাজিক অবস্থা তৈরি হয়েছে, তাকে টিকিয়ে রাখতেও ন্যূনতম রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। সেই সামান্য অবশেষই আজও আমাদের ভরসা।

বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলার বাইরে নগরবাসীর জন্য পরিপূরক কোনো সন্তোষজনক বই-বিনিময় বা বই-বিক্রয় ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি; বরং পূর্ববর্তী ব্যবস্থাগুলো ক্ষীণ হয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ থাকা সত্ত্বেও একসময় রেলস্টেশনের বুকস্টলগুলো ছিল বইপ্রাপ্তির প্রধান মাধ্যম। ডাকযোগেও বই পৌঁছত প্রত্যন্ত অঞ্চলে। পাঠক সমাজের বিস্তার বইয়ের চাহিদা ও প্রকাশনার বৈচিত্র্য বাড়িয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে বিত্তমুখী সামাজিক রূপান্তরের ফলে দেশব্যাপী বই-সরবরাহের কার্যকর ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে। কুরিয়ার সার্ভিস ব্যয়বহুল; স্থানীয় বইয়ের দোকানের মাধ্যমে সংগ্রহও সহজ নয়। কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বই অনুকূল নয় বলে বইপড়ার প্রয়োজনীয়তাকে কার্যকরভাবে সমর্থন করে না। ফলে বইমেলাই হয়ে উঠেছে পুস্তক প্রকাশক-পাঠক ও লেখকের প্রধানতম অবলম্বন।

প্রকাশকরাও বাণিজ্যিকতার অবলম্বনে দক্ষ ও যোগ্য নয় বলে বৈচিত্র্যময় পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম গড়ে তুলতে পারেননি। কয়েকজন জনপ্রিয় লেখক ছাড়া অধিকাংশ প্রকাশক বই বিক্রির নিশ্চয়তা পান না। ফলে লেখকের জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভরতা বাড়ে। বিষয় ও আঙ্গিকের বাস্তবতার কারণে জনপ্রিয় না হওয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশিত হলেও পাঠকের কাছে তার খবর পৌঁছাতে পারে না। অমর একুশের অনুভবের সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক যুক্ত হওয়ায় সেসব বইয়ের প্রকাশক ও পাঠক উভয়েই ক্রমে বইমেলামুখী হয়েছেন। যথার্থই বিবেচনা করা হয়ে এসেছে যে, এই প্রবণতা সাংস্কৃতিক স্বতঃস্ফূর্ততার ফল। তাই এই মেলা কেবল বই-বিক্রির মেলা নয়; দেশপ্রেমের চেতনা ও উৎসবমুখরতা এর সঙ্গে যুক্ত। অনেকেই আবার এও মনে করেন, এই বইমেলায় একুশের ভাবমূর্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বই-ই কেবল থাকা উচিত।

কিন্তু এটাও লক্ষণীয় যে, বাংলা একাডেমি বইমেলার আয়োজক হলেও পুস্তক-প্রকাশকরাই এর মূল অংশগ্রহণকারী। ফলে নীতিমালায় তাদের অংশগ্রহণ স্বাভাবিক। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় সংকীর্ণ স্বার্থ প্রাধান্য পায়। প্রভাবশালী পুস্তক-প্রকাশকরা একুশের মর্মগত ভাবমূর্তি রক্ষায় সবসময় আন্তরিক নন। নানা প্রক্রিয়ায় নীতিভঙ্গ ঘটে; দায় পড়ে রাজনৈতিক দলের ওপর। কিন্তু সমাজের উন্নত স্তর থেকেই যদি নীতিভঙ্গ শুরু হয়, তাহলে বিশৃঙ্খলা অনিবার্য। বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলার ক্ষেত্রেও তেমনটিই ঘটেছে।

পরিসর বাড়ার সঙ্গে বইমেলার বাণিজ্যিকতার চাপও বেড়েছে। কিন্তু দীর্ঘকাল সাংস্কৃতিক দিকটিকে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে একে পুরোপুরি উপেক্ষা করা যায়নি। তবু শিল্পচর্চা আজ বহুলাংশে ব্যবসা-সংস্কৃতির অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। সংবাদমাধ্যমে বই বিক্রির আর্থিক সাফল্যই আলোচনার কেন্দ্র। সাফল্যের পরিমাপক হয়ে উঠছে বিক্রির অঙ্ক ও শিরোনামের সংখ্যা।

না, অর্থনৈতিক সাফল্যকে ছোট করা যায় না। কিন্তু কেবল আর্থিক পরিমাপেই কি অমর একুশে বইমেলার সাফল্য নির্ধারিত হবে? তার চেতনাগত উৎস-অবস্থান কি ক্রমে সরছে না?

প্রতি বছর আমরা বলে এসেছি এই মেলা একুশের চেতনাকে নবায়ন করে। ঝড়বৃষ্টি, রোজা কোনো কিছুই মেলাকে থামাতে পারেনি। অধিকাংশ প্রকাশকের আর্থিক সাশ্রয় ছিল না বললেই চলে। তবু ভাষা-আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধে শানিত হওয়াই ছিল বড় কথা। সে হিসেবে গোটা ভাষা-আন্দোলন স্মারক ফেব্রুয়ারি মাস জুড়েই বইমেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের বাস্তবতায় বইমেলা কিছুটা পিছিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসের ২০ তারিখে নিয়ে যাওয়া হয়। এতে বইমেলাটি রমজান মাসের মধ্যে পড়ে যায়।

রমজান মাসে মেলা অনুষ্ঠিত হবে বলে প্রকাশকদের বড় অংশ মনে করছেন বইমেলায় জনসমাগম হবে না। হলেও বইসংশ্লিষ্ট মানুষ সেখানে যাবেন না। এই আশঙ্কায় তারা অংশ নিতে অনিচ্ছুক! তাদের আশঙ্কা বিপুল ক্ষতি হবে। অন্যদিকে এই বইমেলা ভাষা-আন্দোলনের স্মারক বলেই হয়তো বাংলা একাডেমি দৃঢ়ভাবে জানিয়েছে বইমেলাকে ফেব্রুয়ারি মাসেই অনুষ্ঠিত হতে হবে। তাই বাংলা একাডেমি ২০ ফেব্রুয়ারি শুরু করে ১৫ মার্চ পর্যন্ত মেলা চলাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ! বাংলা একাডেমি পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করতে পারলে জোরেশোরে এই দাবি করতে পারত যে, একুশে ফেব্রুয়ারির মূল্যবোধের প্রতি দৃঢ় প্রত্যয়ের কারণেই রমজান মাসেই বইমেলার আয়োজন করছে। কিন্তু বাংলা একাডেমি কর্র্তৃপক্ষ সে দৃঢ়তা দেখাতে পারেনি।

ক্ষতির আশঙ্কায় পুস্তক-প্রকাশকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটিই এ সময়ে বইমেলায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকছে। তাদের অংশ না নেওয়ার মধ্যে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ কতটা স্থান পাচ্ছে? দেখা যাচ্ছে বই বিক্রি না হওয়াজনিত কারণে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাই তাদের কাছে অমর একুশের মাতৃভাষা চেতনার চেয়ে বড় হয়ে উঠছে। আগে লক্ষ করতাম, একুশের প্রাসঙ্গিকতার প্রতি জোর দেওয়া হতো। কারণ এর মধ্যেই বই বিক্রি হওয়ারও সম্ভাবনা নিহিত ভাবা হতো। এখন কি তবে আর মাতৃভাষার প্রতি দায়বোধ, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ক্রমে গুরুত্বহীন হয়ে কেবল ব্যবসা স্বার্থই বড় হয়ে উঠছে?

লক্ষ করার বিষয়, সব মিলিয়ে এবারের বইমেলার সংকটটিকে কেবলই আর্থিক ক্ষতির দিক থেকে বিবেচনার কথাই প্রাধান্য পাচ্ছে। এই অবস্থায় আমার প্রশ্ন বইমেলার দর্শন কি তবে বদলে যাচ্ছে? তা-ই যদি হয় তাহলে বইমেলাটির ভার বাংলা একাডেমির ওপর আর রাখা কেন, অন্য কোনো বাণিজ্য-সহায়ক স্থানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অভিভাবকত্বে চলে যাক না! বাংলা একাডেমির এ দায় থেকে মুক্তি নিয়ে তাদের মূল কাজের দিকে মনোযোগ দিতে পারে! এই দৃষ্টিভঙ্গিই যদি প্রাধান্য পায় তাহলে এই প্রশ্নও না করে থাকি কী করে যে, অমর একুশে বইমেলার দর্শন কি তবে বদলে যাচ্ছে?