ওয়েলসের মরমি কবি

অ্যান গ্রিফিথস (Ann Griffiths, 1776-1805) ওয়েলসের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মীয় কবিদের একজন। মাত্র ২৯ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি কোনো কবিতা লিখে প্রকাশ করেননি। তবু তার মৌখিকভাবে রচিত স্তোত্রগুলো (hymns) ওয়েলসের ক্যালভিনিস্ট মেথডিস্ট ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তার কবিতায় খ্রিস্টকেন্দ্রিক মরমিবাদ, ত্রাণের আনন্দ এবং ঈশ্বরের সার্বভৌম করুণার গভীর অনুভূতি প্রকাশ পায়। তার স্বল্পকালীন জীবন এবং স্বল্পায়তন রচনাবলি সত্ত্বেও, তিনি ওয়েলস সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব এবং ইউরোপীয় খ্রিস্টীয় কাব্যধারার এক উজ্জ্বল তারকা হিসেবে বিবেচিত হন।

অ্যান গ্রিফিথস ১৭৭৬ সালের এপ্রিল মাসে ওয়েলসের মন্টগোমারিশায়ারের একটি কৃষিখামারে জন্মগ্রহণ করেন। তার নাম রাখা হয় অ্যান টমাস। তার বাবা জন টমাস ছিলেন স্থানীয় একজন পল্লিকবি কবি। পরিবারটি অ্যাংলিকান চার্চের অনুসারী ছিল। পরিবার ছিল ধর্মপ্রাণ কিন্তু সরল।

শৈশবে ঘরের কাজ, খেত-খামারের ব্যস্ততা, আর রবিবারের ধর্মসভা এই নিয়ে তার পৃথিবী তৈরি হয়। যৌবনে তিনি প্রাণবন্ত ও আমোদপ্রিয় ছিলেন। নাচ, গান ও সামাজিক সমাবেশে অংশগ্রহণ করতেন। কিন্তু ২০ বছর বয়সে তার জীবনে এক আধ্যাত্মিক জাগরণ ঘটে যায়।

১৭৯৬ সালে অ্যান একটি মেথডিস্ট প্রচারসভায় যোগ দেন। সেখানে ক্যালভিনিস্ট মেথডিস্ট বক্তার প্রচার তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। তিনি পাপের গভীরতা, খ্রিস্টের ক্রুশের ত্রাণ এবং ঈশ্বরের করুণার অপরিমেয়তা উপলব্ধি করেন। এই অভিজ্ঞতা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি চার্চ অব ইংল্যান্ড ত্যাগ করে ক্যালভিনিস্ট মেথডিস্ট সম্প্রদায়ে যোগ দেন।

সেই সময় ওয়েলসে এই আন্দোলন ছিল গভীর ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা, আবেগপ্রবণ ধর্মীয় অনুভূতি, খ্রিস্টের প্রতি নিবিড় আনুগত্য, আন্তর্জাতিক রূপান্তর, আর ঈশ্বরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক এসবের ওপর দাঁড়ানো। এখানেই অ্যান-এর অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়।

১৮০৪ সালে তার পিতার মৃত্যু তাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে দুর্বল করে তোলে। একই বছর অক্টোবর মাসে তিনি থমাস গ্রিফিথস নামে একজন কৃষক ও ক্যালভিনিস্টিক মেথডিস্ট চার্চের প্রবীণকে বিয়ে করেন। বিয়ের কয়েক মাস পরই তিনি গর্ভবতী হন। ১৮০৫ সালের আগস্টে কন্যাসন্তান প্রসবের কয়েক দিন পর প্রসবোত্তর জটিলতায় মাত্র ২৯ বছর বয়সে মারা যান। তার কন্যাও স্বল্পকাল পরই মারা যায়।

অ্যান কোনো কবিতা লিখে রাখেননি। তিনি রান্না কিংবা দুগ্ধদোহন ইত্যাদি কাজের ফাঁকে স্তোত্র রচনা করতেন এবং গাইতেন। তিনি তার গৃহকর্মী ও বিশ্বস্ত সহযোগী রুথ ইভান্সকে মুখে মুখে আবৃত্তি করে বা গেয়ে শোনাতেন। রুথ তার স্মৃতিতে সেই কবিতাগুলো বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। রুথ পরে ধর্মপ্রচারক জন হিউজেসকে বিয়ে করেন এবং জন হিউজেসই রুথের স্মৃতি থেকে অ্যান গ্রিফিথসের স্তোত্র ও চিঠিগুলো লিখে প্রকাশ করেন। এটাই সবচেয়ে বিস্ময়কর যে কবি নিজে প্রায় কিছু লেখেননি, তিনিই ওয়েলস ধর্মীয় কবিতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ালেন।

অ্যান গ্রিফিথসের রচনার সংখ্যা কম হলেও, এর গুণগত মান ওয়েলস ও ইউরোপীয় সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত। বর্তমানে তার কিছুসংখ্যক স্ত্রোত্র এবং কয়েকটি চিঠি (যা ধর্মীয় গদ্যের উদাহরণ হিসেবে গণ্য) টিকে আছে।

তার কবিতা প্রবল আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতাকে ফুটিয়ে তোলে। তার কবিতায় আবেগ ও ধর্মীয় মরমি অনুভূতির এক তীব্র মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। তার লেখায় দেখা যায় আনন্দ ও হতাশার এক অভ্যন্তরীণ নাটক, যা তাকে মরমিবাদী বা মিস্টিক কবির মর্যাদা দিয়েছে।

তিনি ঈশ্বরকে শুধু পূজিত সত্তা হিসেবে নয়, এক অন্তরঙ্গ, দহনকারী, রূপান্তরকারী উপস্থিতি হিসেবে দেখতেন। তার কবিতায় খ্রিস্ট বারবার এক ব্যক্তিগত মুখ-প্রলয়সম শক্তি ও সীমাহীন কোমলতা একসঙ্গে। ক্রুশবিদ্ধতা তার কাছে শুধু ধর্মীয় ঘটনা নয়, মহাজাগতিক প্রেমের বিস্ফোরণ, যেখানে মনুষ্যত্ব ভেঙে নতুন হয়ে ওঠে। অ্যান-এর বড় শক্তি হলো তৃষ্ণা, ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর আকুলতা, যা মিস্টিকদের সাধারণ লক্ষণ হলেও তার নিজের স্বর অত্যন্ত শুদ্ধ, ব্যক্তিগত, আর রূপময়।

ওয়েলস সাহিত্যে তিনিই সবচেয়ে বিশিষ্ট নারী স্তোত্র-রচয়িতা (female hymnist)। তার কণ্ঠস্বর ধর্মীয় সাহিত্যে নারীর ব্যক্তিগত, গভীর এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আধ্যাত্মিক উপলব্ধির একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্ত। তিনি প্রচলিত অর্থে প্রচারক ছিলেন না। কিন্তু ক্যালভিনিস্ট মেথডিস্ট গোষ্ঠীর মধ্যে তিনি ছিলেন এক প্রেরণা তার প্রার্থনা, তার আত্মস্মৃতি আর তার গান মানুষকে স্পর্শ করত।

অ্যান গ্রিফিথসের রচনা তার সময়ের ওয়েলস পুনরুজ্জীবন আন্দোলনের এক অসামান্য সাহিত্যিক ফসল। তার কাজ গভীর ধর্মতত্ত্ব, তীব্র ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং উচ্চমানের কাব্যিক দক্ষতার এক বিরল সংমিশ্রণ। তিনি ওয়েলস ভাষায় আধ্যাত্মিক কবিতার পুনর্জন্ম ঘটান। মিস্টিক অভিজ্ঞতাকে নারীর কণ্ঠে এক নতুন গভীরতায় আনেন। তার কাজ ক্যালভিনিস্ট মেথডিস্ট পুনর্জাগরণকে সাংস্কৃতিক ভিত্তি দেয়। খুব কম রচনা সত্ত্বেও তিনি ওয়েলস সাহিত্যে ক্যাথারিন অব সিয়েনা বা তেরেজা অব আভিলার সমমানের কবি হিসেবে গণ্য হন। সংক্ষেপে তিনি এমন একজন, যার  ভেতরে মাটির পথ আর মহাজাগতিক আলো একসঙ্গে মিলেছিল।

অ্যান গ্রিফিথসের জীবন প্রমাণ করে যে, সংক্ষিপ্ততম জীবনেও গভীর আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি অমর হতে পারে। তার কবিতা কেবল ধর্মীয় নয়, মানব আত্মার গভীরতম অনুভূতির প্রকাশ। ওয়েলসের গ্রামীণ পরিবেশে জন্ম নেওয়া এই নারী আজ বিশ্বের আধ্যাত্মিক কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কণ্ঠ।

 

তিনি দাঁড়িয়ে আছেন মির্টল গাছের ঝাড়ের মাঝখানে,

রাত্রির নিঃশব্দ আলোয়।

তার চোখে আছে আগুন,

তার কণ্ঠে নিঃশব্দ বজ্র।

 

আমি এগোতে চাই,

কিন্তু হৃদয় যেন পুড়ে যায় তার দীপ্তিতে।

তবু এই অগ্নিতে পুড়েই

আমি আমার নিজস্ব ছায়া খুঁজে পাই।

 

২.

হৃদয়ের গভীর কূপে

তুমি যে জল ঢেলে দিলে একদিন,

আজও তার ঢেউ শোনায়

অশান্তি, আর শান্তিও।

 

আমি জানি

তুমি ছাড়া এই কূপ শুকিয়ে মরবে।

তাই আমি অপেক্ষা করি,

তোমার আরেক ফোঁটা আলোর জন্য।

 

৩.

আমি দাঁড়িয়েছিলাম ক্রুশের নিচে,

নীরব, অনিবার্য সত্যের সামনে।

আকাশ কালো, বাতাস নিষ্ঠুর,

আর তোমার ক্ষত থেকে

যে আলো ফোটে,

তা আমার জীবনের প্রথম সকাল।

আমি জানলাম,

যে প্রেম রক্ত হয়ে ঝরে

তা কখনো শেষ হয় না।

 

৪.

আমার হৃদয় কতবার

পাথর হয়ে গেছে

ঠা-া, ভাঙাহীন, নড়নহীন।

 

তুমি এসে শুধু ছুঁয়েছিলে

এক মুহূর্তের জন্য,

আর পাথরের ভেতর জল উঠল।

এই তো সব চমৎকার

যা আমি চাই।

 

৫.

রাতের পথ দীর্ঘ,

জ্যোৎস্না ক্ষীণ।

আমি এগোই শুধু তোমার নামে।

 

দিগন্তে যে আগুন জ্বলে

তা ভয় নয়,

বরং আমন্ত্রণ।

যেখানে শেষ হবে এই পথ

সেখানে শুরু হবে তোমার ঘর।

 

৬.

তোমার মহিমার সামনে দাঁড়ালে

আমি দেখি

আমার সব অহং ভেঙে ধুলো হয়ে যায়।

 

তুমি এতই উঁচু,

তবু এত কাছে

যেন নিঃশ্বাসের ভেতর

আরেকটা নিঃশ্বাস।

 

৭.

দিন, রাত, আমার সব ঋতু

তোমার হাতের ভেতর।

যা আমি হারিয়েছি,

যা পেয়েছি সবই

তোমার লেখার এক একটি রেখা।

 

আমি শুধু হেঁটে যাই

সেই রেখার ওপর।