নতুন সরকারের ৩ অগ্রাধিকার নির্ধারণ

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরদিন গতকাল বুধবার কর্মব্যস্ত সময় পার করেছেন তারেক রহমান। অন্য কর্মসূচির মধ্যে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। সেখানে তিনি সরকারের জন্য তিনটি অগ্রাধিকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য নির্দেশনা দেন।

এর বাইরে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী কোন মন্ত্রণালয় কী কাজ করবে, তা দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেওয়ার জন্য তিনি নির্দেশ দেন।

গতকাল বিকেলে রাজধানীর সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত প্রথম বৈঠকে এসব নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠক শেষে সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে প্রাথমিকভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ চেইন সচল রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি এবং জ্বালানি খাতে যাতে কোনো সংকট সৃষ্টি না হয় সেজন্য গ্যাস এবং বিদ্যুতের দিকে লক্ষ্য রাখা, এসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, প্রধানমন্ত্রী সচিবদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমাদের ইশতেহারের ওপর জনগণ আস্থা রেখেছে। তাই যথাযথ সময়ে যথাযথভাবে এই ইশতেহার বাস্তবায়ন করতে হবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রত্যেক সরকার প্রথম ১০০ দিনের একটি কর্মসূচি নেয়। আমাদের সরকার সেই কর্মসূচিটি একটু বৃহত্তর পরিসরে ১৮০ দিনের জন্য গ্রহণ করবে। এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং শিগগিরই বিস্তারিত জানানো হবে।’

তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্র মেরামতের জন্য ৩১ দফা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছিল। এই কর্মসূচি শুধু বিএনপির ছিল না, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সব দল এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রীরা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা দু-এক দিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি জানান, রমজান শুরু হচ্ছে। দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ জ্বালানি সব ক্ষেত্রে জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য যার যার জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, জনগণের জন্য প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয় কীভাবে কাজ করবে, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন।

সচিবদের সঙ্গে বৈঠক : মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী সচিবদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন। এ বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, জনগণ রায় দিয়েছেন জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ইশতেহার দেখে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্য সব সচিবকে মেধা কাজে লাগিয়ে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রী দ্রুত ফ্যামিলি কার্ড চালু করার বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে বলেছেন।

জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন : দিনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী গতকাল সকালে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। স্মৃতিসৌধের পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন। পরিদর্শন বইতে তিনি লেখেন, ‘শহীদদের আকাক্সক্ষা ছিল একটি নিরাপদ, মানবিক গণতান্ত্রিক স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। শহীদদের আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমরা কাজ শুরু করেছি। আল্লাহ যেন আমাদের জনগণের সামনে ঘোষিত প্রতিটি কর্মসূচি বাস্তবায়নে তৌফিক দান করেন।’ এরপর সেখানকার বাগানে একটি পারিজাত গাছ রোপণ করেন।

সাভার থেকে ফিরে শেরেবাংলা নগরে প্রয়াত বাবা-মা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

এরপর সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক করেন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারাও মন্ত্রিসভার বৈঠকে যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রী সচিবদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন। সচিবালয় থেকে তিনি যান তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। সেখানে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত অফিস করে গুলশানের বাসায় ফেরেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর অন্য কয়েকটি সিদ্ধান্ত : বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ বৈঠক সচিবালয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বৈঠক হলে সব মন্ত্রীকে সচিবালয় থেকে আসতে যানজটের সৃষ্টি হয়, ভিআইপি চলাচলে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে। যানজটের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তার গাড়িবহরের সংখ্যা কমিয়ে ফেলা হয়েছে। এতদিন গাড়িবহরে ১৩-১৪টি গাড়ি থাকত। গতকাল সেটা কমিয়ে চারটি করা হয়েছে।’

রুমন জানান, প্রধানমন্ত্রী আপাতত নতুন বাড়িতে উঠবেন না। গুলশানের নিজ বাড়িতেই থাকবেন। তিনি সরকারি গাড়িতে নয়, নিজের গাড়িতেই চলাফেরা করবেন। নিজের গাড়ি, নিজের চালক ও নিজের ক্রয় করা জ্বালানি ব্যবহার করবেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী গতকাল সাভার ও শেরেবাংলা নগর গিয়েছিলেন নিজের টয়োটা গাড়ি চড়ে। সেখান থেকে সচিবালয়ে তিনি এসেছেন একই গাড়িতেই। গতকাল পতাকাবিহীন গাড়ি ব্যবহার করছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান অথবা বিদেশি মেহমানদের সফরের সময় তার গাড়িতে পতাকা ব্যবহার করা হবে। রাজধানীতে প্রধানমন্ত্রী যাত্রাপথে সড়কের দুই ধারে পোশাকধারী পুলিশের অবস্থান নেওয়ার যে নিয়ম এতদিন চালু ছিল, তাও বন্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।