ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত বিশ্বব্যাপী শুল্ক নীতির ওপর বড় ধরনের আঘাত হানলেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। জরুরি অবস্থার অজুহাতে বিদেশি পণ্যের ওপর ঢালাও শুল্ক আরোপের যে পদক্ষেপ ট্রাম্প নিয়েছিলেন, শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) এক ঐতিহাসিক রায়ে তা অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। রিপাবলিকান এই প্রেসিডেন্টের জন্য এই রায়কে একটি চরম পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।
প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ৬-৩ ভোটে এই রায় প্রদান করেন। রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৭৭ সালের 'ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার অ্যাক্ট' প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের কোনো ক্ষমতা দেয় না। ট্রাম্প এই আইনের অপব্যবহার করে নিজের ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করেছেন।
প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস তার পর্যবেক্ষণে লেখেন, আমাদের কাজ ছিল শুধু এটা দেখা যে, আমদানিকৃত পণ্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মানেই শুল্ক আরোপের ক্ষমতা কি না। আমাদের উত্তর হলো—না। শুল্ক আরোপের জন্য কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমতি প্রয়োজন, যা প্রেসিডেন্টের নেই।
সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তের খবর যখন আসে, তখন ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে গভর্নরদের সাথে এক বৈঠকে ছিলেন। সূত্রের খবর অনুযায়ী, খবরটি শুনে ট্রাম্প চরম হতাশ হন এবং এই রায়কে একটি 'লজ্জা' হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি আদালত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও হুমকি দেন।
এর আগে, বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রয়ারি) জর্জিয়ায় এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ‘শুল্ক ছাড়া পুরো দেশ দেউলিয়া হয়ে যাবে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে শুল্ক বসানোর পূর্ণ অধিকার আমার আছে।’ তবে হোয়াইট হাউস থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্পের এই অনিশ্চিত শুল্ক নীতির কারণে মার্কিন শেয়ার বাজার দীর্ঘদিন ধরে অস্থির ছিল। আদালতের রায়ের পর সূচক গত দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং ডলারের মান কিছুটা কমেছে। ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার এই রায়কে মার্কিন ভোক্তাদের বিজয় হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘ট্রাম্পের অবৈধ শুল্ক শাসন ধসে পড়েছে।’
আদালতের রক্ষণশীল বিচারপতি ব্রেট কাভানো তার ভিন্নমত পোষণকারী নোটে লিখেছেন যে, এই রায় ট্রাম্পকে অন্যান্য আইনের অধীনে শুল্ক আরোপ করা থেকে পুরোপুরি বিরত করতে পারবে না। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা মনে করেন, ট্রাম্পের এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে বাণিজ্য নীতিতে কংগ্রেসের ক্ষমতা খর্ব হতো এবং প্রেসিডেন্টের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হতো।
উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে নিয়োগ দেওয়া দুই বিচারপতি নিল গোরসাখ ও অ্যামি কোনি ব্যারেটও এই রায়ে প্রধান বিচারপতির সাথে একমত হয়েছেন। তিন উদারপন্থী বিচারপতিও তাদের সমর্থন দিয়েছেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাম্প চীন, কানাডা ও মেক্সিকোসহ প্রায় সব বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর শুল্ক চাপিয়ে আসছিলেন। পেন্স-ওয়ারটন বাজেট মডেলের হিসাব অনুযায়ী, এই আইনের অধীনে এ পর্যন্ত প্রায় ১৭৫ বিলিয়ন ডলার শুল্ক আদায় করা হয়েছে।
আদালত এই অর্থ আমদানিকারকদের ফেরত দেওয়ার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেননি। ফলে আদায়কৃত বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ফেরত পাওয়া নিয়ে আইনি জটিলতা বা গোলযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, তারা জাতীয় নিরাপত্তা বা অন্য কোনো আইনি অজুহাতে এই শুল্ক বজায় রাখার চেষ্টা করবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্বের আইনের মতো ঢালাও ক্ষমতা অন্য কোনো আইনে পাওয়া ট্রাম্পের জন্য কঠিন হবে।
সূত্র: রয়টার্স