ইরানে মার্কিন হামলার লক্ষ্য হতে পারেন শীর্ষ নেতারা

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পরিকল্পনার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্দেশ দিলে যেকোনো সময় তেহরানে হামলা চালাতে পারে মার্কিন বাহিনী। এই সম্ভাব্য হামলার তালিকায় ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের ব্যক্তিগতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা (টার্গেটেড কিলিং) এবং দেশটিতে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের (রেজিম চেঞ্জ) মতো উচ্চাভিলাষী বিকল্পগুলোও রাখা হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুইজন মার্কিন কর্মকর্তা এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে ইরানের সঙ্গে একটি বড় ধরনের সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন। গত সপ্তাহে রয়টার্স জানিয়েছিল, ইরানের নিরাপত্তা স্থাপনা ও পারমাণবিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে কয়েক সপ্তাহব্যাপী টানা অভিযানের পরিকল্পনা করছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। তবে নতুন তথ্যে দেখা যাচ্ছে, পরিকল্পনার পরিধি আরও বিস্তৃত।

সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে বিশাল কোনো স্থলবাহিনী ছাড়াই কীভাবে এই লক্ষ্য অর্জন করা হবে বা কোন কোন নেতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে, সে বিষয়ে কর্মকর্তারা বিস্তারিত কিছু জানাননি। উল্লেখ্য, নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প আফগানিস্তান বা ইরাকের মতো ভিনদেশে সরকার পতনের ‘ব্যর্থ নীতি’ থেকে সরে আসার অঙ্গীকার করেছিলেন। ফলে এখন শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পথে হাঁটা তাঁর আগের অবস্থানের বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধজাহাজ ও ফাইটার এয়ারক্রাফট মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রয়োজনে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র থেকেও বোমারু বিমান এই অভিযানে অংশ নিতে পারে।

২০২০ সালে ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে ড্রোন হামলায় হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাম্প। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবারও আইআরজিসি-এর কমান্ডিং অফিসারদের নিশানা করা হতে পারে। গত বছর ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল যেভাবে ইরানের অন্তত ২০ জন শীর্ষ কমান্ডারকে (যার মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরি ছিলেন বলে দাবি করা হয়) হত্যা করেছে, তা মার্কিন পরিকল্পনাকারীদের উৎসাহিত করছে।

তবে কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু করতে নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের প্রয়োজন, যা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে পর্যাপ্ত আছে কি না তা স্পষ্ট নয়।

হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগন এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানে সরকার পরিবর্তন হওয়া হবে "সবচেয়ে ভালো ঘটনা"। গত মাসে ভেনেজুয়েলায় বিশেষ বাহিনীর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার প্রচেষ্টার উদাহরণ টেনে বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প প্রথাগত যুদ্ধের চেয়ে বিশেষ অভিযানের দিকে বেশি ঝুঁকছেন।

বৃহস্পতিবার ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে কোনো চুক্তি না হলে "খুবই খারাপ কিছু" ঘটতে পারে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইরানি ভূখণ্ডে হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আঘাত করা হবে। জর্ডান, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে লেখা এক চিঠিতে তেহরান জানিয়েছে, তারা কোনো যুদ্ধ চায় না, তবে আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষার অধিকার থেকে তারা "চূড়ান্ত ও আনুপাতিক" জবাব দেবে।

যুদ্ধের এই দামামায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্যে ওমান সাগরে ইরানের নৌ-মহড়ায় রাশিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজ যোগ দিয়েছে। ইরান হুমকি দিয়েছে, আক্রান্ত হলে তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে, যা দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করা হয়।

এদিকে, গত মঙ্গলবার জেনেভায় দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক হলেও কোনো সমাধান আসেনি। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, দুই পক্ষ এখনো অনেক বিষয়ে একমত হতে পারেনি। ট্রাম্পের সাফ কথা, "ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না। তারা পারমাণবিক অস্ত্রধারী হলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আসবে না।

সূত্র: রয়টার্স