সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম মহানগরীর তিনটি আসনেই বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন। সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রতি সমর্থনের যে জোয়ার দেখা গেছে, সেটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ধরে রাখতে চায় দলটি। বিশেষ করে, সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ‘লিটমাস পেপার’ করতে চান দলটির স্থানীয় নেতারা। সে মতোই নিজ থেকেই নির্বাচনের আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি নিজ থেকে মন্ত্রণালয়কে বলেছি মেয়র নির্বাচন দেওয়ার জন্য। সারা দেশের কোথাও মেয়র নেই। ওয়ার্ডগুলোতে কাউন্সিলর নেই। জনগণকে সেবা দিতে মেয়র নির্বাচনের বিকল্প নেই। আর আমার এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে নির্বাচন কমিশনকে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজনের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
আপনি কেন নির্বাচন চাইছেন এই প্রশ্নের উত্তরে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘অতীতের নির্বাচনে ভোট কারচুপির কারণে আমার জনপ্রিয়তা যাচাই করতে পারিনি। এই শহরের কত শতাংশ মানুষ আমাকে চায়, তাও জানি না। এবার সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। তাই আমি আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ক্যারিয়ারের জনপ্রিয়তা যাচাই করতে চাইছি।’
আপনি কি নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি ২০২৪ সালের নভেম্বরে শপথ নেওয়ার পর আরও চার বছর মেয়র হিসেবে থাকতে পারব আইন অনুযায়ী। কিন্তু আমি তা চাইছি না। আমি চাই সিটি করপোরেশন নির্বাচন হোক। ৪১টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলররা দায়িত্বে আসুক। তাহলে নগরবাসী আরও নিবিড়ভাবে সেবা পাবে। আর বিগত ১৭ মাসের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর আমার এই আস্থা জন্ম নিয়েছে যে, বিএনপির পক্ষ থেকে যদি আমাকে মেয়র নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়, তাহলে আমি ঠিকই জয়লাভ করে আসব।’
ডা. শাহাদাতের এই চাওয়াকে অমূলক মনে করছেন না চট্টগ্রাম-১০ (পাহাড়তলী, ডবলমুরিং, হালিশহর) আসন থেকে নির্বাচন করা জামায়াত নেতা অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী। তিনি বলেন, সারা দেশের দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে বিএনপি সংসদে গিয়েছে এবং সরকার গঠন করেছে। সেই দলের একজন রাজনৈতিক কর্মী সংসদ নির্বাচনের পরপরই জনগণের জোয়ারকে কাজে লাগিয়ে সিটি করপোরেশন নির্বাচন চাইতেই পারেন। যেহেতু মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাই নির্বাচন দেওয়াও প্রয়োজন। তবে বর্তমান মেয়রকে সরিয়ে দিয়ে এখানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়াই উত্তম হবে।
অবশ্য তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত মেয়র হিসেবে থাকতে চান ডা. শাহাদাত। তিনি বলেন, ‘দল মনোনয়ন দিলে আমি প্রার্থী হব, তাই সিটি করপোরেশনের আইনের ছয় ধারা অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত আমি মেয়র হিসেবে থাকতে পারব। এখানে প্রশাসক দেওয়ার কোনো বিধান নেই।’
এদিকে সিটি করপোরেশনের আইন ২০০৯-এর ৩৪ নম্বর ধারা (২০১১ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী, করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববতী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হয়। মেয়াদ শেষ হলেও স্থানীয় সরকার আইন ২০০৯-এর ৩৪ নম্বর ধারা (২০১১ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী চসিকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া। এ ছাড়া একই আইনের ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত নতুন পর্ষদের প্রথম সভা না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান মেয়রের দায়িত্ব পালন করার সুযোগ রয়েছে। চসিকের বর্তমান পর্ষদের প্রথম সভা হয়েছে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। ওই হিসেবে এ পর্ষদের মেয়াদ শেষ হবে আজ রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি)।
২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি চসিকের ষষ্ঠ পরিষদের নির্বাচন হয়েছিল। এ নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১৯ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৬ জন। নির্বাচনে ভোট পড়ে মাত্র ২২ দশমিক ৫২ শতাংশ। নির্বাচনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন পান ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট পান। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী মো. রেজাউল করিম চৌধুরী ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৪৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। একই বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি শপথ নেন এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন রেজাউল করিম। পরে একই বছরের (২০২১ সাল) ২৪ ফেব্রুয়ারি ডা. শাহাদাত ৯ জনকে বিবাদী করে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী ও কাউন্সিলররা কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকেন। তখন সরকারের পক্ষ থেকে সারা দেশের সব স্থানীয় পরিষদ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হয়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনেও বিভাগীয় কমিশনারকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে ডা. শাহাদাতের করা সেই মামলায় ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর চট্টগ্রামের প্রথম যুগ্ম জেলা জজ ও নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচারক খাইরুল আমিন ডা. শাহাদাতকে মেয়র ঘোষণা করে এ মামলার রায় দেন। রেজাউল করিম চৌধুরীর মেয়র নির্বাচনের ফল বাতিল করেন। পাশাপাশি ১০ দিনের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারির জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবকে নির্দেশ দেন। এরপর ৮ অক্টোবর ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করে সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন। তিনি ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর প্রথম সভা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম শুরু করেন।