কাঁদলেন নেইমার, কাঁদালেনও

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৭ এএম

‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, ইহা দূরেও ঠেলিয়া ফেলে।’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের এই বিখ্যাত লাইনটি আজ কোটি ফুটবলপ্রেমীর বুকের ভেতর এক অন্তহীন হাহাকার হয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। নেইমার আর ব্রাজিলের প্রতি বিশ্বজুড়ে মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসাও ঠিক যেন এমনই। প্রেমটা তাদের জন্য যত বড়, বিপরীতে তাদের থেকে পাওয়া কষ্টটাও যেন এতই বড় যে, তা ঠেলে দেয় অসীম হতাশায়।

ফুটবলের প্রতি বাঙালিরও নিখাদ ভালোবাসার এক বিশাল অংশজুড়ে আছে হলুদ-সবুজ জার্সির সেলেসাওরা। এ দেশে ব্রাজিল মানে শুধু একটা ফুটবল দল নয়; ব্রাজিল মানে শৈশবের চেনা নস্টালজিয়া, বাড়ির ছাদে উড্ডীন পতাকা আর মাঝরাতে প্রিয় দলের জয়ে পাড়া-মহল্লা কাঁপানো উল্লাস। অথচ ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মঞ্চেই সেই চিরন্তন আবেগের এমন অপমৃত্যু ঘটবে, তা হয়তো অতিবড় নরওয়ে সমর্থকও ভাবেনি। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্লিং হালান্ডের নরওয়ের কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায়ের সমান্তরালে অবসান ঘটল এক সোনালি, অথচ ভীষণ ট্র্যাজিক অধ্যায়ের।

সেলেসাওদের টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার চেয়েও পুরো বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের বেশি পুড়িয়েছে মাঠের কোণে নিভৃতে ঝরানো নেইমার জুনিয়রের চোখের জল। কান্নাভেজা চোখে ও গ্লোবো-কে দেওয়া তার শেষ বার্তাটি ছিল তীরের মতো তীক্ষè ‘আমি চেষ্টা করেছি, অনেক চেষ্টা করেছি। এখন সব শেষ! আমি এখানেই শুরু করেছিলাম, আর এখানেই শেষ করলাম।’ ১৬ বছর আগে ২০১০ সালের আগস্টে এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মাঠেই যার আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছিল, সেই চেনা আঙিনাতেই এক বুক কান্না নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন এ মহাতারকা।

এ বিদায়ের মধ্য দিয়ে আধুনিক ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডির নামও হয়ে রইলেন নেইমার। চার-চারটি বিশ্বকাপ খেলে থিয়াগো সিলভার পর দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান হিসেবে বিশ্বমঞ্চের সোনালি ট্রফিটা ছোঁয়া হলো না তার। অথচ এক যুগ ধরে ব্রাজিলের ফুটবলীয় সৌন্দর্য, শৈল্পিক ড্রিবলিং আর ‘জোগো বোনিতো’র একমাত্র ধারক-বাহক ছিলেন তিনিই।

২০১৪ সালে ঘরের মাঠে যখন পুরো বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখছিলেন, ঠিক তখনই কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার হুয়ান জুনিগার এক নির্মম আঘাতে মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে তার বিশ্বকাপ শেষ হয়েছিল হাসপাতালের বিছানায়। সেদিন হাসপাতালের বেডে শুয়েই তাকে দেখতে হয়েছিল জার্মানির কাছে ব্রাজিলের ৭-১ গোলের সেই ঐতিহাসিক বিপর্যয়। পরে  ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে কিংবা ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রতিবারই ইনজুরিকে সঙ্গী করে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে অশ্রুসিক্ত চোখে বিদায় নিতে হয়েছিল নেইমারকে। আর এবার, ২০২৬ বিশ্বকাপে প্রচণ্ড জেদ আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে চোট কাটিয়ে ফেরার পরও নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে বেশিরভাগ সময় কাটাতে হলো ডাগআউটে। পুরো টুর্নামেন্টে সব মিলিয়ে তিনি মাঠে ছিলেন ৬০ মিনিটেরও কম।

পেলের অফিশিয়াল ৭৭ গোল টপকে ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল করে ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েও নেইমার ক্যারিয়ার শেষ করলেন এক ‘সিংহাসনহীন রাজা’ হিসেবে। ফুটবল তাকে দুহাত ভরে জনপ্রিয়তা দিলেও ট্রফি ক্যাবিনেটে বিশ্বকাপের একটি পদক না থাকায় তার এই প্রস্থান চিরকাল অধরাই থেকে গেল। এ যেন ফুটবলের পূর্ণ সৌন্দর্যের রাজার এক নিষ্ঠুর অপূর্ণ বিদায়।

নরওয়ের কাছে এই হার ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসেও এক কালো অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে। ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কাছে হেরে শেষ ১৬ থেকে বিদায় নিয়েছিল ব্রাজিল। এরপর দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে প্রতিটি আসরেই অন্তত কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা নিশ্চিত করে আসছিলেন সেলেসাওরা। কিন্তু এবার ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার মাটিতে এসে সেই গর্বের রেকর্ড ধূলিসাৎ হয়ে গেল। একই সঙ্গে ব্রাজিলের ইতিহাসে শিরোপাহীন থাকার খরাও স্পর্শ করল এক নতুন চূড়া। ২০০২ সালে শেষবার কাফু-রোনালদোদের হাত ধরে ট্রফি জিতেছিল ব্রাজিল। এরপর টানা ২৪ বছর বিশ্বকাপের ট্রফি না ছুঁয়ে থাকার এই আক্ষেপ, ১৯৫৮ সালে পেলের অভিষেকের পর ব্রাজিলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘতম শিরোপা খরা। ২০৩০ বিশ্বকাপে যা দাঁড়াবে ২৮ বছরে। লম্বা সময়ের এই খরা কি তবে এটাই প্রমাণ করে, বিশ্ব ফুটবলে সেলেসাওদের সেই একচ্ছত্র আধিপত্য কি এতটাই ফিকে হয়ে গেছে? 

 ২০০৬ বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত নকআউট পর্বে ইউরোপীয় দলগুলোর সামনে এলেই যেন ব্রাজিলের সাম্বা ছন্দ হারিয়ে যায়। ২০০৬-এ ফ্রান্স, ২০১০-এ নেদারল্যান্ডস, ২০১৪-তে জার্মানি, ২০১৮-তে বেলজিয়াম, ২০২২-এ ক্রোয়েশিয়া এবং এবার ২০২৬-এ নরওয়ে এ নিয়ে টানা ছয়টি বিশ্বকাপেই ইউরোপীয় জুজু কাটাতে ব্যর্থ হলেন সেলেসাওরা। খাতা-কলমে নরওয়ের চেয়ে ব্রাজিল বহুগুণ এগিয়ে থাকলেও মেটলাইফ স্টেডিয়ামের প্রচণ্ড আর্দ্রতার মাঝে কার্লো আনচেলত্তির দল খেলল এক সম্পূর্ণ ছকহীন, রক্ষণাত্মক ফুটবল। পুরো ম্যাচে ৬৬ শতাংশ বলের দখল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্রাজিলিয়ানদের ওপর অনবরত চাপ ধরে রেখেছিলেন ভাইকিংরা। ফুটবলবোদ্ধা ও কিংবদন্তিদের মতে, এই ম্যাচ নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ভাবা উচিত ছিল ব্রাজিলের। থিংক ট্যাংকের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল নেইমারকে ম্যাচের একদম শেষ দিকে মাঠে নামানো। অনেকেই কার্লোর এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন, যেখানে তিনিই ম্যাচের আগের দিন ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন, ছন্দে ফিরেছে নেইমার, খেলতে পারেন ৯০ মিনিট। তাই তো, নকআউটের মতো মরণ-বাঁচন ম্যাচে নেইমারের মতো একজন মহাতারকাকে শুরু থেকেই না খেলানো নিয়ে হচ্ছে সমালোচনা, যেখানে নেইমার মাঠে থাকা মানেই প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ, সেখানে নেইমার শুরুর দিকে থাকলে হয়তো ভিন্ন কিছুও হতে পারত।

শেষ মুহূর্তে নেইমারের পেনাল্টি গোলটি তাই কোটি ভক্তের মনে আফসোস আরও বাড়িয়েছে। কারণ ম্যাচের মাত্র ১৩ মিনিটে ব্রুনো গিমারেস যদি পেনাল্টি মিস না করতেন, তবে ম্যাচের গল্পটা অন্যরকম হতেই পারত।

ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আর্লিং হালান্ডের ৭৯ ও ৮৯ মিনিটের জোড়া গোল যখন ব্রাজিলের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দিচ্ছিল, তখন গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো হলুদ জার্সির সমর্থক ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই স্টেডিয়াম ছাড়তে শুরু করেন। তারা যেন জানতেন, এই খেই হারিয়ে ফেলা দলটির পক্ষে আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই যখন মাঠের সবুজ ঘাসে কান্নায় ভেঙে পড়লেন নেইমার, তখন টেলিভিশন পর্দার সামনে থাকা বাংলাদেশের লাখো ভক্তের চোখেও ছিল নোনা জলের ধারা। যেন চোখকেই বিশ্বাসই করতে পারছেন না ব্রাজিল সমর্থকরা।

ব্রাজিল দল মানেই যেখানে গ্লোবাল ব্র্যান্ড, ভালো লাগা আর নান্দনিক ফুটবলের বিজ্ঞাপন, সেখানে মাঠের পারফরম্যান্সে এই দলটি এখন বড্ড মলিন। ১৯ বছর বয়সী তরুণ এনদ্রিক কিংবা গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লিরা এখনো বিশ্বমঞ্চের এই প্রবল চাপ নেওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নন, যা ম্যাচশেষে কোচ কার্লো আনচেলত্তি নিজেও স্বীকার করেছেন। নেইমারের এ কান্নায় ভেজা প্রস্থান এবং ব্রাজিলের এমন অসহায় আত্মসমর্পণ কেবল একটি টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি সমর্থকের হৃদয়ে এক দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর ক্ষতের নাম। ফুটবল হয়তো চলতেই থাকবে, মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আবার নতুন কোনো দল উল্লাস করবে, কিন্তু ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সি পরা সেই সিংহাসনহীন রাজার জাদুকরী ড্রিবলিং আর কখনো হলুদ জার্সিতে দেখা যাবে না এ শূন্যতাই আজ ফুটবলবিশ্বের সবচেয়ে বড় সত্যি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত