হিজবুল্লাহর নিয়ন্ত্রণ নিল ‘আইআরজিসি’

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। যার পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্য বিমানবাহী রণতরীসহ এফ-২৩, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন করেছে ওয়াশিংটন। ইতিমধ্যে সিরিয়া থেকে নিজেদের সব সেনা প্রত্যাহার করেছে ট্রাম্প প্রশাসন; পাশাপাশি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে কাতার ও বাহরাইনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি থেকে শত শত সেনা সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা পদক্ষেপে হরমুজ প্রণালীতে লাইভ ফায়ার এবং ওমান সাগরে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া করেছে ইরানও। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় এবার লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘হিজবুল্লাহ’র সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড ‘আইআরজিসি’। উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায় তাহলে তাদের সহযোগী দখলদার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের প্রস্তুত করা হচ্ছে। গত শনিবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়া।

সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, বিপ্লবী গার্ডের কিছু কর্মকর্তা ইরান থেকে সম্প্রতি লেবাননে এসেছেন। তাদের হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিপ্লবী গার্ডের এসব কমান্ডার হিজবুল্লাহর যোদ্ধাদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করছে। সম্প্রতি বাক্কা উপত্যকায় হিজবুল্লাহর মিসাইল ইউনিটের সঙ্গে বিপ্লবী গার্ড বৈঠক করেছে। যেখানে আবার শনিবার বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। এতে হিজবুল্লাহর অন্তত আট যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহর কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইসরায়েল যেকোনো সময় হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র। প্রায় এক মাস ধরে ইরানের চারপাশে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে যুক্তরাষ্ট্র। আশঙ্কা করা হচ্ছে যেকোনো সময় ইরানে হামলা চালাবে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। তেমনটা হলে এতে যোগ দিতে পারে দখলদার ইসরায়েলও। এমন পরিস্থিতিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরানও। তারা তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিজবুল্লাহকে এখন শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। ইসরায়েলি কান পাবলিক ব্রডকাস্টার জানিয়েছে, ইসরায়েলের গোয়েন্দারা হিজবুল্লাহর রকেট ইউনিটের কার্যক্রম বৃদ্ধির আলামত পেয়েছে। তাদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে হিজবুল্লাহর রকেট ইউনিট ইসরায়েলে হামলা চালাবে।

গণবিক্ষোভের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ফের বিক্ষোভ হয়েছে ইরানে। জানুয়ারিতে সরকারি বাহিনীর হামলায় বিক্ষোভকারী নিহতের ৪০ দিন পূর্তি উপলক্ষে শনিবার দেশটিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয় বিক্ষোভ। ইরানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইরানের ভেতরের বিক্ষোভের বেশ কিছু ভিডিও সামনে এসেছে। এর মধ্যে একটি ভিডিও তেহরানের আমির কবির বিশ্ববিদ্যালয়ের। সেখানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির বিরুদ্ধে সেøাগান দিতে দেখা যায় বিক্ষোভকারীদের। সেই সঙ্গে ইরানের নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পেহলভিকে নতুন শাসক হিসেবে বেছে নেওয়ারও ডাক দেয় বিক্ষোভকারীরা। তবে ইরানে সহিংসতা উসকে দেওয়ার জন্য বিদেশি শক্তিকেই দায়ী করে আসছে তেহরান। রাজধানী তেহরানের শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সারিবদ্ধভাবে মিছিল করছেন। সেখানে তারা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে ‘খুনি নেতা’ হিসেবে অভিহিত করে স্লোগান দেন। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এসএনএনের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, শরিফ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভকারীরা পাথর ছুড়ে সরকারপন্থি স্বেচ্ছাসেবী ‘বাসিজ’ মিলিশিয়া সদস্যদের আহত করছেন। এ ছাড়া তেহরানের বেহেশতি এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ বিশ্ববিদ্যালয়েও ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু আলোচনা চলাকালে বিশ্বশক্তির চাপের কাছে মাথানত করবে না ইরান। শনিবার ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে এই হুঁশিয়ারি দেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যত সমস্যাই তৈরি করুক, আমরা এসব সমস্যার মুখে নত হব না। তার মতে, বিশ্বশক্তিগুলো কাপুরুষের মতো একজোট হয়ে আমাদের নতজানু হতে বাধ্য করাতে চাইছে। অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে কাতার ও বাহরাইনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি থেকে শত শত সেনা সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা একে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, প্রত্যাহার করা সেনাসদস্যরা কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ছিলেন। এই পদক্ষেপকে আসন্ন সংঘাতের ইঙ্গিত হিসেবে নয়, বরং বিকল্প পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতিমূলক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ব্যাপকভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। তবে ইরাক, সিরিয়া, কুয়েত, সৌদি আরব, জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘাঁটিগুলোর নেটওয়ার্ক জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী এখনো মোতায়েন রয়েছে।