চট্টগ্রাম শহরের একেবারের কাছেই দক্ষিণ চট্টগ্রামের ছয়টি সংসদীয় আসন। পরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে এসব আসনভুক্ত বেশ কটি উপজেলাকে উপশহরে পরিণত হওয়ার মতো সুযোগ-সম্ভাবনা থাকলেও স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও পরিকল্পিত উন্নয়নের আওতায় আসেনি এসব এলাকা। বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলীর তীরে টেকসই বেড়িবাঁধ না হওয়ায় প্রতিবছরই ভাঙনের শিকার হয়ে আনোয়ারা, বাঁশখালী ও বোয়ালখালী উপজেলার অনেক মানুষ ইতিমধ্যেই পৈতৃক ভিটেমাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছেন। সাগর, নদী আর পাহাড় ঘিরে দক্ষিণ চট্টগ্রামে পর্যটনশিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও তা হয়ে ওঠেনি।
বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা, কর্ণফুলী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালী উপজেলা নিয়েই দক্ষিণ চট্টগ্রামের ছয়টি সংসদীয় আসন। সদ্য সম্পন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এখানে চারটি আসনে বিএনপি ও দুটি আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনের আগে এলাকার জনগণকে দেওয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা দেখতে চান নির্বাচনী এলাকার ভোটাররা।
বিপুল পরিমাণ অর্থব্যয়ে কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল নির্মাণের মূল লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। সেই সঙ্গে তৈরি হবে কর্মসংস্থানের অবারিত সুযোগ। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ও নিজ নিজ আসনের জনপ্রতিনিধিদের কাছে সেই সম্ভাবনা ও সুযোগের দ্রুত বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করেন এলাকাবাসী।
রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিক থেকে অনেকটা অবহেলিত বলা যায় চট্টগ্রামের অধিকাংশ এলাকা। এখনো বিভিন্ন এলাকায় কাদামাখা মাটির রাস্তা মাড়িয়ে দূর-দূরান্তে যেতে হয় লোকজনকে। পাকা কালভার্টের পরিবর্তে বাঁশের সাঁকো দিয়ে করতে হয় চলাফেরা। যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয়নি কোনো উপজেলাতেই। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে রয়েছে প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা উপকরণের অভাব। মাদক, চাঁদাবাজি, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, সরকারি সেবা সংস্থাগুলোতে নাগরিক সেবাপ্রাপ্তিতে হয়রানি এসব সমস্যা সর্বজনীন।
এর বাইরে এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন সমস্যা প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে। চট্টগ্রাম-৮ আসনের অন্তর্ভুক্ত বোয়ালখালী উপজেলা মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি ‘কালুরঘাট সেতু’। নদীভাঙনের শিকার হতে হচ্ছে কর্ণফুলী তীরের বাসিন্দাদের। এবারের নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১২ আসনে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ছয় হাজার ব্যাংকারের চাকরিচ্যুতির বিষয়টি। তাদের চাকরিতে পুনর্বহালে নির্বাচিত প্রতিনিধি ভূমিকা রাখবে এই প্রত্যাশা চাকরিচ্যুত ব্যাংকার ও তাদের পরিবারের। পটিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে নদীভাঙনে মানুষ ভিটেমাটি হারাচ্ছেন। এ সমস্যা সমাধানে টেকসই বাঁধ নির্মাণ, খাল খননে জরুরি পদক্ষেপ চান এলাকাবাসী। চট্টগ্রাম শহরের কাছেই বঙ্গোপসাগর, কর্ণফুলী ও সাঙ্গু নদীর তীরেই অবস্থান আনোয়ারা এবং কর্ণফুলী উপজেলা নিয়ে চট্টগ্রাম-১৩ আসনের। আনোয়ারা উপকূলবাসীর বড় দুঃখ সাগরতীরের বেড়িবাঁধের ভাঙন। ভিটেমাটি ও সম্পদ রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ চান এলাকার বাসিন্দারা। নাগরিক সেবাপ্রাপ্তিতে হয়রানি, বালুমহাল নিয়ে সিন্ডিকেটবাজি ও জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বিভিন্ন হয়রানিমূলক মামলা থেকে মুক্তি চান চট্টগ্রাম-১৪, তথা চন্দনাইশ উপজেলার বাসিন্দারা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি রাস্তা-ঘাটের দুরবস্থা দূরীকরণে দ্রুত পদক্ষেপ চান সাতকানিয়া-লোহাগাড়ার মানুষ। সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভবন সংস্কারসহ ট্রমা সেন্টার চালু করা, স্থানীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের সমাধান ও রাস্তাঘাটের উন্নয়নের দাবি এলাকাবাসীর। যোগাযোগব্যবস্থার করুণ হাল বাঁশখালী উপজেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১৬ আসনের বিভিন্ন এলাকা। এসব বিষয়ে নতুন জনপ্রতিনিধির কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করেন এলাকার বাসিন্দারা।