প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথের পাঁচ দিনের মাথায় ক্রীড়াঙ্গন সম্পর্কে বিশদ ধারণা নিতেই ক্রীড়া সাংবাদিকদের ডেকেছিলেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রাপ্ত আমিনুল হক। সাবেক এই ফুটবল তারকা উপস্থিত সংবাদকর্মীদের কাছ থেকে ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নিতে করণীয় সম্পর্কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চেয়েছেন। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সম্মেলনকক্ষে আমন্ত্রিত সাংবাদিকদের মতামতগুলো টুকেও নিয়েছেন নতুন ক্রীড়ামন্ত্রী। সে অনুযায়ী ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নিতে কাজ করার কথাও বলেছেন তিনি।
রবিবার সকালে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় শুরুতেই সরকারি দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে লক্ষ্য ও পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরেন আমিনুল। এরপরই জেলার খেলাধুলাকে জাগাতে ক্রীড়া সাংবাদিকদের পরামর্শ চান। ক্রীড়া সাংবাদিকরা বেশ কিছু বিষয় মন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। মোটা দাগে জেলা-উপজেলার অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো, প্রকৃত ও যোগ্য ক্রীড়া সংগঠকদের দায়িত্বে আনা, স্কুল পর্যায়ে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করা, গ্যালারি ঘেরা স্টেডিয়াম না বানিয়ে শিশু-কিশোরদের খোলা মাঠের ব্যবস্থা করা, সর্বোপরি একটা ক্রীড়াবান্ধব ক্রীড়াঙ্গন গঠনে জোর দেওয়ার কথা বলেন ক্রীড়া সাংবাদিকরা।
জেলার ফুটবল হারিয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ জেলা ক্রীড়া সংস্থা-ডিএসএ থেকে ফুটবলকে আলাদা করে ফেলা। জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গঠনের পর মাঠের দায়িত্বে থাকা ডিএসএর সঙ্গে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। দুটি সংস্থা এক সঙ্গে কাজ করে না বেশিরভাগ জেলায়। দীর্ঘদিনের এ সমস্যা সমাধানে মন্ত্রীকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ করা হয়ে ক্রীড়ামন্ত্রীকে। ডিএসএগুলো ফুটবলের চেয়ে ক্রিকেট আয়োজনে বেশি আগ্রহী থাকে কারণ ক্রিকেট বোর্ড থেকে আর্থিক সহযোগিতা তারা বেশি পায়। এক্ষেত্রে জেলা ফুটবল লিগ আয়োজনে ফুটবল ফেডারেশন আর্থিক সংকটের কারণে সেভাবে সহায়তা করতে পারে না। এক্ষেত্রে সরকার জেলা লিগ আয়োজনের বিশেষ উদ্যোগ নিতে পারে বলে মত দেন ক্রীড়া সাংবাদিকরা।
স্কুল পর্যায়ে খেলাধুলার চর্চা এখন নেই বললেই চলে। আমিনুল চতুর্থ শ্রেণি থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাঁচটি খেলাকে বেছে নিতে ক্রীড়া সাংবাদিকদের পরামর্শ চান। দেশের প্রধান দুই খেলা ফুটবল, ক্রিকেটের পাশাপাশি ক্রীড়া সাংবাদিকরা বেশ কিছু ব্যক্তিগত ইভেন্টের নাম উল্লেখ করেন। যার মধ্যে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড, কাবাডি, ভারোত্তোলন, হ্যান্ডবল, দাবা, বাস্কেটবল, ভলিবল ও মার্শাল-আর্টের নাম উঠে এসেছে। ক্রীড়া সাংবাদিকরা মূলত কম খরচে সহজে খেলা যায় এমন ইভেন্টগুলো গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন।
জেলা প্রশাসকের ডিএসএর সভাপতির দায়িত্ব থাকাকে খেলাধুলা এগিয়ে যাওয়ার অন্তরায় হিসেবে তুলে ধরেছেন এক জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া সাংবাদিক। তিনি প্রকৃত ক্রীড়া সংগঠকদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার অনুরোধ করেন। মন্ত্রীকে ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামের পরিবেশ ক্রীড়াবান্ধব করার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ বক্স বসানোর অনুরোধ করেন ক্রীড়া সাংবাদিকরা। ক্রিকেট, ফুটবলের পাশাপাশি হকিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে মন্ত্রীকে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের নামে জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর পুরোপুরি অভিজ্ঞতাশূন্য করে ফেলেছিল। অনভিজ্ঞ লোকজনে ভরে উঠেছিল বিভিন্ন ফেডারেশন। ফলে বেশিরভাগ ফেডারেশন স্থবির হয়ে পড়েছে। ফেডারেশনগুলোতে সত্যিকারের ক্রীড়া সংগঠকদের ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এক্ষেত্রে যাতে পরিবর্তনের নামে রাজনীতিকরণের মহোৎসব না ঘটে, সেদিকটায় বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার কথা বলা হয়। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে আরও বেশি কার্যকর করতে পরিষদের কার্যনির্বাহী কমিটি প্রকৃত ক্রীড়া সংগঠকদের নিয়ে গঠন করার দিকে গুরুত্ব দেওয়ার অনুরোধও পেয়েছেন আমিনুল। এছাড়া বিকেএসপিকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে আরও কার্যকর করে তোলা, বিভিন্ন স্পন্সর প্রতিষ্ঠানকে ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর সঙ্গে যুক্ত করা এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অবকাঠামো উন্নয়নের অনুরোধ জানানো হয়।
ক্রীড়া সাংবাদিকদের কথা শোনার পর সমাপনী বক্তৃতায় আমিনুল বলেন, ‘আজকের মতবিনিময় সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল তৃণমূল পর্যায় থেকে কীভাবে ক্রীড়াঙ্গনে একটি নতুন পরিবেশ আমরা গড়ে তুলতে পারি তা নিয়ে আলোচনা করা। আমাদের লক্ষ্য তৃণমূল পর্যায় খেলাধুলাকে ছড়িয়ে দিয়ে উপজেলা, জেলা পর্যায়ে খেলাধুলাকে নিয়মিত রাখা। একটা বার্ষিক ক্রীড়া পঞ্জিকা করার মাধ্যমে খেলাধুলাকে সারা বছর প্রতিনিয়ত খেলার মাঠে আমরা রাখতে চাই।’
আমিনুল জানান, ‘আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে আমাদের খেলাধুলাকে আমরা পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই এবং সেটার বিষয় নিয়েও আমরা বিশদভাবে আলোচনা করছি। কীভাবে আমরা সেখানে প্রতিটি খেলোয়াড়কে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসে সেটা নিশ্চিত করতে পারি। জাতীয় শিক্ষাক্রমে আমাদের পরিকল্পনা আছে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করব। সেই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে শিক্ষামন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে আমরা সেটা নিশ্চিত করব ইনশাআল্লাহ।’
আমিনুল ফুটবল, ক্রিকেট, হকির পাশাপাশি সম্ভাবনাময় ব্যক্তিগত ইভেন্টের খেলাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে সাউথ এশিয়ান গেমস, এশিয়ান গেমসের মতো আসরগুলো থেকে পদক জয় এবং ভবিষ্যতে অলিম্পিকে পদক জয়ের লক্ষ্যের কথা জানান।