বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর একটি বক্তব্য নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘বাংলাকে যদি ধারণ করতে হয়, বাংলা ভাষাকে যদি মায়ের ভাষা বলতে হয়, তাহলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলবে না। এগুলোর সঙ্গে বাংলার কোনো সম্পর্ক নেই। যারা আমাদের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, এগুলো তাদের ভাষা।’ তিনি আরও মন্তব্য করেন, এ কথা বললে তাকে ‘ভারতের দালাল’ বলা হতে পারে, তবুও তিনি তার অবস্থানে অনড়। মন্ত্রীর বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই শীর্ষ নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ফেসবুক পোস্ট ভাইরাল হয়। হাসনাত আব্দুল্লাহ কেবল লেখেন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। অল্প সময়েই পোস্টটিতে বিপুল প্রতিক্রিয়া জমা পড়ে, যা অনেকেই মন্ত্রীর বক্তব্যের রাজনৈতিক জবাব হিসেবে দেখেন। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী লেখেন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ! চাঁদাবাজ মুর্দাবাদ!’ যা আরও তীব্র রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।
এখানে মূল প্রশ্ন, ভাষা নাকি রাজনৈতিক প্রতীক? ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ নিঃসন্দেহে উর্দু-ফার্সি উৎসের শব্দবন্ধ, কিন্তু উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ভাষাগত উৎসকে কেন্দ্র করে একে সম্পূর্ণ বহিরাগত বলা যেমন সরলীকরণ, তেমনি এটিকে একক আদর্শিক পরিচয়ে বেঁধে ফেলাও বাস্তবতাকে অস্বীকার করা। ইতিহাসে যে স্লোগান ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে, আজ সেটিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণের কেন্দ্রে নতুন অর্থে ফিরে এসেছে। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ উর্দু-ফার্সি উৎসের একটি স্লোগান। ‘ইনকিলাব’ অর্থ বিপ্লব আর ‘জিন্দাবাদ’ অর্থ দীর্ঘজীবী হোক। শব্দবন্ধটি প্রথম রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেন বলে ঐতিহাসিকভাবে ধারণা করা হয় উর্দু কবি ও বিপ্লবী নেতা হাসরৎ মোহানী। তবে এটিকে সর্বভারতীয় রাজনৈতিক প্রতীকে রূপ দেন ভগত সিং ও তার সহযোদ্ধারা।
১৯২০-৩০ দশকের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় এই স্লোগান দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯২৯ সালে দিল্লির সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে বোমা নিক্ষেপের পর, ভগত সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত গ্রেপ্তার হন। আদালত কক্ষে তারা উচ্চৈঃস্বরে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দেন। সেই মুহূর্ত থেকে স্লোগানটি কেবল প্রতিবাদের ভাষা নয়, বরং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আত্মত্যাগ ও বিপ্লবী চেতনার প্রতীকে পরিণত হয়। ভগত সিংয়ের কাছে ‘ইনকিলাব’ মানে ছিল, কেবল শাসক বদল নয়; ছিল শোষণমুক্ত, সাম্যভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন। তাই এই স্লোগান ছিল, রাজনৈতিক ও আদর্শিক পুনর্গঠনের আহ্বান। স্বাধীনতার পর ভারতীয় রাজনীতিতে এই স্লোগান প্রধানত বামপন্থি, ছাত্র ও শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকে। তবে সময়ের সঙ্গে এটি আদর্শিক সীমা অতিক্রম করে, সাধারণ প্রতিবাদী ভাষায় রূপ নেয়। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং জনআন্দোলনের আবেগ সবকিছুর প্রতীক হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য পেয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, এটি বাম বলয় থেকে উৎপত্তি হয়ে ডানপন্থি বা জাতীয়তাবাদী বলয়েও ব্যাপকভাবে উচ্চারিত হয়েছে। এতে বোঝা যায়, শব্দটির আদর্শিক উৎস এক হলেও রাজনৈতিক ব্যবহার সময়ের প্রেক্ষাপটে বদলে যায়। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে একাধিক নেতার মুখে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শোনা যাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা তৈরি হয় এটি কি দলীয় স্লোগান? দল গঠনের আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির সঙ্গে যুক্ত অনেক নেতা এই স্লোগান ব্যবহার করতেন। ফলে এটি সংগঠনের আনুষ্ঠানিক নীতির চেয়ে বরং আন্দোলনের ধারাবাহিকতার প্রতীক বলেই প্রতীয়মান হয়। এখানে ‘ইনকিলাব’ শব্দটি রাষ্ট্রবিরোধী নয়, বরং পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে পরিবর্তনের দাবি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সব মিলিয়ে, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ কেবল একটি ঐতিহাসিক স্লোগান নয়; এটি স্মৃতি, ভাষা, জাতীয়তাবাদ, আদর্শিক অবস্থান এবং প্রজন্মগত রাজনীতির সংঘর্ষের প্রতীক হয়ে উঠেছে। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে এটি যে বিতর্ক তৈরি করেছে, তা আসলে ক্ষমতার ভাষা ও পরিবর্তনের ভাষার মধ্যকার দ্বন্দ্বেরই বহিঃপ্রকাশ। স্লোগানের অমিত শক্তি আছে। বহু কণ্ঠ, বহু স্বর, বহু ধ্বনিতে উচ্চারিত হলে তা কেবল ‘শব্দ’ থাকে না। হয়ে ওঠে শানিত কাব্যময়তা, সংক্ষিপ্ত অথচ তীব্র রাজনৈতিক বার্তা। একটি স্লোগান কয়েকটি শব্দের মধ্যেই আবেগ, পরিচয়, ক্ষোভ, স্বপ্ন ও শত্রুচিহ্নিতকরণকে একত্রে ধারণ করতে পারে। এ কারণেই ‘স্লোগান’ উপমহাদেশের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন টুল। যা বক্তৃতার চেয়ে দ্রুত, প্রবন্ধের চেয়ে তীক্ষè এবং সংগঠনের চেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে জনসমাবেশকে এক সূত্রে গেঁথে ফেলে। ‘জয় বাংলা’ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মহান স্লোগান। এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, ভাষা, ভূখণ্ড ও স্বাধীনতার আকাক্সক্ষার প্রতীক। কিন্তু ইতিহাসের আরেক দিকও আছে। এই স্লোগান দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, সহিংসতা বা দখলদারির ঘটনাও ঘটেছে দেশে। ফলে বোঝা যায়, স্লোগান নিজে নিরীহ; কিন্তু যে রাজনৈতিক শক্তি তা উচ্চারণ করে, তার কর্ম ও পরিপ্রেক্ষিত স্লোগানকে তখন নতুন অর্থ দেয়। একইভাবে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ ধর্মীয় আহ্বানধর্মী ধ্বনি। কিন্তু উপমহাদেশের বিভক্তির রাজনীতিতে এটি সাম্প্রদায়িক মেরূকরণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের জন্মলগ্নে এই স্লোগানকে ঘিরে যে বিরোধিতা, গণহত্যা ও সহিংসতার স্মৃতি তৈরি হয়েছে, তা ইতিহাসের অংশ। আবার সাম্প্রতিক সময়ে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ যার উৎপত্তি ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবী চেতনায়, কখনো কখনো মব তাণ্ডবের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়, শব্দমালা নয়; বরং আরোপিত রাজনৈতিক অর্থই স্লোগানকে শক্তিশালী, কখনো বিপজ্জনক করে তোলে। গায়ক প্রতুল মুখোপাধ্যায় গেয়েছিলেন ‘স্লোগান দিতে গিয়ে আমি চিনতে শিখি নতুন মানুষজন, স্লোগান দিতে গিয়ে আমি বুঝতে শিখি কে ভাই, কে দুশমন।’ এই পঙ্ক্তিতে স্লোগানের আরেকটি দিক ধরা পড়ে। এটি পরিচয় নির্মাণের হাতিয়ার। স্লোগান মানুষকে একই সারিতে দাঁড় করায়, আবার বিপরীত সারিও তৈরি করে। অর্থাৎ স্লোগান একযোগে সংহতি ও বিভাজন দুইয়েরই মাধ্যম। ঐতিহাসিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানের গণঅভ্যুত্থানের সময় আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেছে স্লোগানে। যখন বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবি জোরালো হয়, জামায়াতে ইসলামী তার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে তোলে ‘পাকিস্তানের শত্রুরা হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘কোরআন আইন কায়েম করো।’ এমনকি মওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধে কটূক্তিমূলক স্লোগানও শোনা যায় ‘সর্দি কাশি হাপানি, মওলানা ভাসানী’!
অন্যদিকে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে ‘তোমার আমার ঠিকানা/পদ্মা মেঘনা যমুনা’ স্লোগানটি ভৌগোলিক ও জাতিগত স্বাতন্ত্র্যের ঘোষণা হয়ে ওঠে। এখানে স্লোগানই রাজনৈতিক ভুগোলের ভাষা নির্মাণ করেছে। ব্রিটিশ ভারতে জাতীয় কংগ্রেস ও বিপ্লবী সংগঠনগুলোর মুখে ছিল ‘বন্দে মাতরম’ যা মাতৃভূমির বন্দনা। মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ এটিকে প্রত্যাখ্যান করে এবং পাল্টা স্লোগান হিসেবে তুলে ধরে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার।’ এভাবেই স্লোগান দুই সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক কল্পনাকে আলাদা পথে ঠেলে দেয়। ইতিহাসবিদদের মতে, সাম্প্রদায়িক স্লোগানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভারত বিভক্তির মানসিক ভিত্তিকে আরও দৃঢ় করেছিল। সুতরাং, স্লোগান কেবল আবেগ নয়, বিষয়টি রাজনৈতিক সংকেত-ভাষা। এটি আন্দোলনের লক্ষ্য সরল করে, শত্রুকে চিহ্নিত এবং সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ করে। আবার একই সঙ্গে মেরূকরণ ও উত্তেজনার আগুনও জ্বালাতে পারে।
একটি স্লোগান মহান বা নিকৃষ্ট নয় তা নির্ভর করে কে, কোন প্রেক্ষাপটে, কোন ক্ষমতার পাটাতনে দাঁড়িয়ে তা উচ্চারণ করছে তার ওপর। এ কারণেই মন্ত্রীর বক্তব্য ও তার জবাবে উচ্চারিত ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বিতর্কটি আসলে ভাষা নিয়ে নয়; ক্ষমতার ভাষা বনাম পরিবর্তনের ভাষা নিয়ে। স্লোগান এখানে কেবল শব্দ নয় এটি স্মৃতি, পরিচয়, সংগ্রাম ও ক্ষমতার লড়াই। আর সেই লড়াইয়েই আমরা শিখি, কোন কণ্ঠ আমাদের পাশে দাঁড়ায় আর কোন কণ্ঠ আমাদের বিপরীতে। যে কারণে স্লোগান আজও চেনায় কে ভাই, কে দুশমন।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
rajibnandy@cu.ac.bd