চার বছর ধরে দৌড়াচ্ছে রাশিয়াও

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের নির্দেশে ইউক্রেনে সর্বাত্মক হামলা শুরুর মধ্য দিয়ে; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শুরু হয়। সময়ের পরিক্রমায় এ যুদ্ধ আজ মঙ্গলবার চার বছর পূর্ণ হলো। দীর্ঘ এ সংঘাতে ইউক্রেন-রাশিয়া উভয়ই ব্যাপকমাত্রায় সামরিক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে; যুদ্ধের দামামায় ভুক্তভোগী হয়েছে বেসামরিক মানুষরাও। চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো এ যুদ্ধ বন্ধে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার পরও রাশিয়া নিজেদের অবস্থানে অটল থাকায় শান্তিচুক্তি আলোর মুখ দেখেনি। উপরন্তু ইউক্রেন ভূখ- ছাড়ে রাজি না হলেও বলপূর্বক সে লক্ষ্য অর্জনে সংকল্পবদ্ধ থাকার ঘোষণা দিয়েছে মস্কো। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও যুদ্ধ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর মতে, রাশিয়া এ যুদ্ধে নিজেদের যে সফলতার দাবি করে থাকে, তা আসল চিত্র নয়। উল্টো কিয়েভে সামরিক আগ্রাসন শুরু করার এ সিদ্ধান্ত এখনো রাশিয়ার জন্য এক কৌশলগত ভুল হিসাবের প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনে বলছে, চার বছর পেরিয়ে যুদ্ধ রক্তক্ষয়, অর্থনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক অবস্থান; সবক্ষেত্রেই মস্কোর জন্য বড় মাশুল বয়ে এনেছে। কিয়েভের এক হোটেলের ছাদে দাঁড়িয়ে তখনো অনেকের বিশ্বাস ছিল, সীমান্তে সেনা সমাবেশ সত্ত্বেও এমন পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ কল্পনা করা কঠিন। পুতিন চেচনিয়া, জর্জিয়া, সিরিয়া ও ক্রিমিয়ায় সামরিক শক্তি প্রয়োগে তুলনামূলক কম ক্ষয়ক্ষতিতে সাফল্য পেয়েছিলেন। কিন্তু ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ যে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, সেটি ছিল স্পষ্ট।

১৪৬০ দিনের যুদ্ধ

লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘ইউক্রেনে বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরু করার সময় ক্রেমলিনের ধারণা ছিল ১০ দিনের মধ্যেই ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যাবে। কিন্তু ১ হাজার ৪৫০ দিনের বেশি সময় পর সেই সময়সীমা আজ সরল ও ভুল হিসাব হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, ইউক্রেন খুব দুর্বল বা বিশৃঙ্খল বলে যে ধারণা, তাও ছিল ভ্রান্ত। একই সঙ্গে অজেয় বলে পরিচিত রাশিয়ার বিশাল সামরিক শক্তির ভাবমূর্তিও আঘাত পেয়েছে। রাশিয়ায় তথ্য নিয়ন্ত্রণ কঠোর হওয়ায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব গোপন রাখা হয়েছে। তবে বিভিন্ন সূত্রের অনুমান বলছে, প্রাণহানি অত্যন্ত বেশি। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, সর্বাত্মক আগ্রাসনের পর থেকে প্রায় ১২ লাখ রুশ সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার নিহত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনো বড় শক্তির কোনো যুদ্ধে এত বেশি হতাহত হয়নি। এ যুদ্ধের ইউক্রেনের হতাহতের সংখ্যা রাশিয়ার তুলনায় অনেক কমই বলা যায়। যুদ্ধে ইউক্রেনের নিহত বা আহত সেনার সংখ্যা পাঁচ থেকে ছয় লাখের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই এ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেন। যুদ্ধ পঞ্চম বছরে প্রবেশ করলেও হতাহতের সংখ্যা কমার বদলে বাড়ছে। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা সম্প্রতি দাবি করেছেন, শুধু ডিসেম্বরেই ৩৫ হাজার রুশ সেনা নিহত হয়েছে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ বলেছেন, লক্ষ্য হলো নতুন নিয়োগের চেয়ে দ্রুত রুশ সেনাদের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ানো।

যুদ্ধ অর্থনীতির চাপ

মস্কো শহরের বাহ্যিক চিত্রে যুদ্ধের প্রভাব স্পষ্ট নয়। দোকান, ক্যাফে, যানজট; সবই স্বাভাবিক। ২০২২ সালের নিষেধাজ্ঞার ধাক্কার পর সামরিক ব্যয় বাড়িয়ে রাশিয়া অর্থনীতি চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাশিয়া বিশ্বের নবম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে, যা যুদ্ধের আগে ছিল একাদশ। তবে যুদ্ধ অর্থনীতির বিকৃতির লক্ষণও বাড়ছে। সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বড় অঙ্কের বোনাস ও নিহতদের পরিবারকে আরও বেশি ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে। সামরিক শিল্পে অগ্রাধিকার দেওয়ায় অন্যান্য খাতে শ্রমিকসংকট দেখা দিয়েছে। ক্রেমলিনপন্থি পত্রিকা নেজাভিসিমায়া গাজেতা একে ‘তীব্র শ্রমিকসংকট’ বলে আখ্যা দিয়েছে। প্রায় আট লাখ দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও ভোক্তাদের চাপে ফেলেছে।

চার বছরের এ ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধে ইউক্রেন যেমন ভয়াবহ মূল্য দিচ্ছে, তেমনি রাশিয়াও ঘরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দুর্বল হয়েছে। ন্যাটো সম্প্রসারণ ঠেকানো ছিল আক্রমণের ঘোষিত কারণগুলোর একটি। কিন্তু সর্বাত্মক যুদ্ধের পর ন্যাটোতে যোগ দিয়েছে সুইডেন ও ফিনল্যান্ড। বিশেষ করে ফিনল্যান্ডের যোগদানে রাশিয়া-ন্যাটো স্থলসীমা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার ফলে রাশিয়া পূর্বমুখী হয়েছে। বিশেষ করে চীনের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ইউরোপীয় নীতি বিশ্লেষণ কেন্দ্র সেন্টার ফর ইউরোপিয়ান পলিসি অ্যানালাইসিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মস্কো এখন অনেকটাই ভারসাম্যহীন এবং অতীতের চেয়ে এখন অনেক বেশি বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি বিশ্ব জুড়ে মিত্রদের পতনও মস্কোর প্রভাব খানিকটা হলেও কমিয়েছে। ২০২৪ সালে বিদ্রোহীদের চাপে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হলে রাশিয়া তাকে সরিয়ে নিয়ে আশ্রয় দেয়। মধ্যপ্রাচ্যে আরেক মিত্র ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সময়ও মস্কো কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। গত মাসে ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কারাকাসে নিজ শয়নকক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা তুলে নিয়ে যায়। এ ক্ষেত্রেও শুধু কূটনৈতিক নিন্দাতেই সীমাবদ্ধ ছিল রাশিয়া।

জেলেনস্কির বার্তা

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনেকেই ভাবেননি, পুতিন সর্বাত্মক আগ্রাসনের নির্দেশ দেবেন। কিন্তু সিদ্ধান্তের ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে যে আশঙ্কা ছিল, চার বছর পর তা নির্মমভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে ইউক্রেন এবং রাশিয়ার জন্য। যুদ্ধের চতুর্থ বর্ষপূর্তির প্রাক্কালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, তাদের পরাজিত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তারা ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করবেন বিজয়ী হিসেবে। জেলেনস্কি বলেন, পুতিন এরই মধ্যে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করছেন; তাকে পিছু হটাতে একমাত্র উপায় তীব্র সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা। সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের দাবি করা যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘মূল্য’ (ভূখ- ছাড়) পরিশোধের ঘোর বিরোধিতা করেন। রাশিয়ার হাতে এখনো পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের ২০ শতাংশ ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ইউক্রেন এ শহরগুলোকে ‘দুর্গ শহর’ বলে। সেগুলোসহ দক্ষিণের খেরসন ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চলের আরও কিছু ভূখণ্ড রাশিয়ার কাছে হস্তান্তরের দাবি করে আসছে মস্কো। আর মূলত এ বিষয়টি নিয়েই কোনো ঐকমত্যে না আসতে পারার কারণেই, বারবার শান্তিচুক্তির অগ্রগতি আলোচনার টেবিলেই আটকে থাকছে।