বাতাসেই পানির ঠিকানা

পৃথিবীর অনেক প্রান্তেই আজ পানির জন্য হাহাকার। নদী-নালা শুকিয়ে যাচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে বিপজ্জনক মাত্রায়। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘ খরা। এই বৈপরীত্যের মধ্যেই মানবসভ্যতার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ভবিষ্যতে পানির উৎস হবে কোথায়? সেই প্রশ্নের এক যুগান্তকারী উত্তর দিয়েছেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ওমর ইয়াগি।

রসায়নে নোবেলজয়ী এই বিজ্ঞানী এমন এক পরিবেশবান্ধব যন্ত্র উদ্ভাবন করেছেন, যা শুষ্ক বাতাস থেকেই তৈরি করতে পারে সুপেয় পানি। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, এই প্রযুক্তি বাস্তবে পরীক্ষিত এবং কার্যকর। বাতাসে থাকা অদৃশ্য জলীয় বাষ্পই এখানে হয়ে উঠছে পানির প্রধান উৎস।

অধ্যাপক ওমর ইয়াগির গবেষণার মূল ভিত্তি বিশেষ ধরনের ছিদ্রযুক্ত রাসায়নিক কাঠামো যা বাতাসের জলীয় বাষ্প অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে শোষণ করতে পারে। এই উপাদান বাতাস থেকে আর্দ্রতা ধরে রাখে, এমনকি মরুভূমির মতো শুষ্ক এলাকাতেও। এরপর সূর্যের তাপ বা অল্প শক্তি ব্যবহার করে সেই বাষ্পকে ঘনীভূত করে তরল পানিতে রূপান্তর করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটিই পরিবেশবান্ধব, শক্তি-সাশ্রয়ী এবং টেকসই।

এই যন্ত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটির জন্য নদী, হ্রদ বা ভূগর্ভস্থ পানির প্রয়োজন নেই। যেখানে পাইপলাইন পৌঁছায় না, যেখানে লবণাক্ততা পানিকে ব্যবহার অনুপযোগী করে তোলে, সেখানেও এই প্রযুক্তি কার্যকর। সৌরশক্তিতে চালানো সম্ভব হওয়ায় বিদ্যুৎবিহীন এলাকাতেও এটি ব্যবহার করা যায়। ফলে প্রত্যন্ত গ্রাম, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল কিংবা দুর্যোগকবলিত এলাকায় এটি হতে পারে জীবনরক্ষাকারী সমাধান।

নোবেল কমিটি অধ্যাপক ওমর ইয়াগির এই গবেষণাকে স্বীকৃতি দিয়েছে মূলত এর মানবিক ও বৈশ্বিক প্রভাবের কারণে। এটি শুধু একটি বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন নয়, বরং নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিত করার পথে এক বড় পদক্ষেপ। গবেষকরা বলছেন, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে পারে এবং ব্যক্তি ও কমিউনিটি পর্যায়ে পানির স্বনির্ভরতা গড়ে তুলতে পারে।

বিশ্ব জুড়ে ইতিমধ্যে এই যন্ত্রের পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হয়েছে। স্কুল, হাসপাতাল, শরণার্থী শিবির এবং খরাপ্রবণ অঞ্চলে এর সফল প্রয়োগ প্রমাণ করছে বাতাসও হতে পারে নির্ভরযোগ্য পানির উৎস। যদিও বর্তমানে উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি, তবে প্রযুক্তি বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এর দাম কমবে বলেই আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এই আবিষ্কার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানির সমস্যা, উত্তরের খরাপ্রবণ এলাকা কিংবা পাহাড়ি জনপদ  সবখানেই বাতাস থেকে পানি সংগ্রহের এই প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এটি নিরাপদ পানির সংকট কমানোর পাশাপাশি পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপও সৃষ্টি করবে না।

সব মিলিয়ে, নোবেলজয়ী অধ্যাপক ওমর ইয়াগির পরিবেশবান্ধব এই আবিষ্কার আমাদের শেখায় সমাধান সবসময় দূরে নয়, কখনো কখনো তা আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে থাকে। বাতাসে লুকিয়ে থাকা জলকণাগুলোই হয়তো একদিন ভবিষ্যৎ মানবসভ্যতার পানির প্রধান ভরসা হয়ে উঠবে। বিজ্ঞানের হাত ধরে বাতাস যখন পানিতে রূপ নেয়, তখন আশাও নতুন রূপে ফিরে আসে।