এক বিস্ফোরণে ঝরে গেল স্বপ্নের সংসার

নুরজাহান আক্তার রানী। বয়স ৪০। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার হরিশপুর ইউনিয়নের আলম গাজী পাটোয়ারীর বাড়ির মোস্তফা কামালের আদরের মেয়ে। ছোটবেলা থেকে স্নেহ-ভালোবাসায় বেড়ে ওঠা রানীর জীবন যেন ছিল স্বপ্নময়। বিয়ে হয় কুমিল্লার বাসিন্দা মো. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। সংসার গড়ে তোলেন চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর থানার ওয়াপদা মোড়ের ‘ফাতেমা মঞ্জিল’ নামের একটি বাসায়।

প্রচলিত ধারা ভেঙে সন্দ্বীপের বাইরে বিয়ে হলেও ভালোবাসা আর আস্থায় এগোচ্ছিল তাদের ছোট্ট সংসার। কিন্তু নিয়তি যেন অপেক্ষায় ছিল নির্মম এক পরিণতির।

গত সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ভোরে বাসায় জমে থাকা গ্যাস থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তেই আগুনে দগ্ধ হয় পুরো পরিবার। স্বজনরা তাদের উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যান। ভর্তি করা হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। সেখানেই শুরু হয় মৃত্যুর মিছিল। প্রথমে প্রাণ হারান রানী। এরপর একে একে চলে যান তার ছেলে শাওন, ছোট ভাই সামির আহমেদ সুমন, সুমনের স্ত্রী আশুরা আক্তার পাখি। সর্বশেষ বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান স্বামী মো. সাখাওয়াত হোসেন (৪৬)।

বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান জানান, সাখাওয়াতের শরীরের শতভাগ পুড়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারেননি।

বর্তমানে পরিবারের আরও চার সদস্য মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। সাখাওয়াতের মেয়ে উম্মে আয়মান স্নিগ্ধা (৩৮%), ভাইয়ের মেয়ে আয়েশা (৪৫%), ভাইয়ের ছেলে ফারহান আহমেদ আনাস (৩০%) এবং আরেক ভাই শিপন হোসেন (৮০%) দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক।

একটি সুখী পরিবার, যেখানে ছিল হাসি, স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। সেই ঘর আজ শোকের স্তব্ধতায় ভরা। সন্দ্বীপের গ্রাম থেকে শুরু করে নগরের মহল্লা, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা, বাসায় জমে থাকা গ্যাস থেকেই বিস্ফোরণের সূত্রপাত। তবে তদন্ত চলছে।

একের পর এক মৃত্যু যেন নিভিয়ে দিচ্ছে একটি পরিবারের জীবনপ্রদীপ। রানীর বাবার বাড়িতে এখন শুধু কান্না—আর একটি প্রশ্ন, এত বড় শোক সইবে কীভাবে এই পরিবার?