পলাশের আগুনে আত্মসমর্পণ

আমি বসন্ত এলে অকারণে বদলে যাই। মনে হয়, আমার ভেতরে বহুদিন ঘুমিয়ে থাকা এক অগ্নিশিখা হঠাৎ জ্বলে উঠেছে। চারদিকে পলাশ ফোটে, শিমুলে আগুন ধরে, কোকিল ডাকে আর আমি বুঝতে শুরু করি, প্রকৃতি কেবল বাহ্যিক নয়; সে আমার অন্তর্লোকেরও প্রতিচ্ছবি। বসন্ত আমাকে একসঙ্গে প্রেমিক, ইতিহাস-সচেতন মানুষ ও নির্মাণে বিশ্বাসী স্রষ্টায় রূপান্তরিত করে। এ শুধু ঋতুর পরিবর্তন ও জাগরণ নয়, এক অন্তর্জাগরণ।

ফাগুনের বাতাসে আমি যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান শুনি ‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান’ আমি সেখানে প্রেমের চেয়েও বড় এক সত্য পাই। দান মানে তো হারানো নয়; দান মানে আত্মবিস্তার। শিলাইদহ কুঠিবাড়ির পদ্মাপাড়ে বসে তিনি যে বসন্তকে দেখেছিলেন, তা ছিল এক নৈতিক জাগরণ। তাঁর চিঠিপত্রে দেখি প্রকৃতির উল্লাসের পাশাপাশি গভীর আত্মসমালোচনা। বসন্ত তার কাছে আনন্দের পাশাপাশি দায়ও। আমি যখন নিজের জীবনের দিকে তাকাই, দেখি বসন্ত আমাকে তেমনি দায়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রেমে নিবেদন যেমন চাই, তেমনি নির্মাণেও অঙ্গীকার চাই।

সংস্কৃত কবি কালিদাসের ‘ঋতুসংহার’ পড়লে দেখি, বসন্তকে তিনি শৃঙ্গার-রসের শিখরে বসিয়েছেন। মুকুলিত শাখা, সুগন্ধি বাতাস, কোকিলের ডাক সবই মিলনের আহ্বান। কিন্তু ভারতীয় রসতত্ত্ব আমাকে শেখাচ্ছে, শৃঙ্গারের দুই দিক সংযোগ ও বিপ্রলম্ভ। বসন্ত তাই মিলনের যেমন ঋতু, তেমনি বিরহেরও। আমি যখন প্রিয়জনের অনুপস্থিতি নিয়ে ফাগুনের বিকেলে হাঁটি, তখন বুঝি, বিরহও বসন্তের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আবুল হাসান লিখেছিলেন মানুষ বিরহকামী হলেও তার মিলনই মৌলিক। বসন্ত আমাকে এই মৌলিকতার কথা মনে করিয়ে দেয়।

পারস্যের কবি জালালউদ্দিন রুমির পঙ্্ক্তি আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয় বসন্ত এলে প্রতিটি শাখা আবার নতুন করে বাঁচতে চায়। আমি ভাবি, আমার হৃদয়ও কি তেমন? শীতের দীর্ঘ অবসাদ শেষে ফাগুন এলে কি আমিও নতুন করে বাঁচতে চাই না? পারস্যের নওরোজ উৎসবের ইতিহাস- দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো দেখায়, বসন্ত কেবল প্রকৃতির নয়, সভ্যতারও পুনর্জন্ম। আগুন জ্বালিয়ে পুরনো অন্ধকার বিদায় জানানো হয়। হাফিজের গজলে গোলাপ ফোটে, প্রেমিকের অনুপস্থিতিও রসের অংশ হয়ে ওঠে। বসন্ত সেখানে ইশকের রূপক। আমি বুঝি, আমার প্রেমও তেমন যেখানে অনুপস্থিতিও এক প্রকার উপস্থিতি।

ইউরোপীয় কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ বসন্তে প্রকৃতির সঙ্গে আত্মার সখ্য খুঁজেছেন। তার কাছে বসন্ত নৈতিক পুনর্জাগরণ। আবার জিওফ্রে চসার এপ্রিলের বৃষ্টিতে যাত্রার আহ্বান শুনেছেন। কিন্তু টি. এস. এলিয়ট লিখেছেন এপ্রিল নিষ্ঠুরতম মাস। কারণ বসন্ত মৃত স্মৃতিকে জাগিয়ে দেয়। আমি এই তিনটি দৃষ্টিভঙ্গির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকি। আমার কাছে বসন্ত কখনো আনন্দ, কখনো নির্মম স্মৃতির প্রত্যাবর্তন।

দর্শনের দিকে তাকালে দেখি, ফ্রিডরিখ নীৎশে জীবনের প্রতি ‘হ্যাঁ’ বলার সাহসকে সর্বোচ্চ শক্তি বলেছেন। বসন্ত সেই ‘হ্যাঁ’-এর সময়। আবার আলবেয়ার কামু বলেছেন, শীতের গভীরে তিনি তার ভেতরে এক অপরাজেয় গ্রীষ্ম আবিষ্কার করেছেন। আমি সেই গ্রীষ্মকে বসন্তেরই অন্য নাম দিই। যত শীত, যত অবসাদ, যত ইতিহাসের অন্ধকারই আসুক আমার ভেতরে এক ফাগুন রয়ে যায়।

জাপানি কবি মাতসুও বাশো সাকুরা-ফুলের ক্ষণস্থায়ী প্রস্ফুটনে জীবনের অনিত্যতা দেখেছেন। ফুল ঝরে পড়ে, তবু তার ঝরাতেই পূর্ণতা। আমি যখন পলাশের ঝরা পাপড়ির ওপর দিয়ে হাঁটি, তখন বুঝি আমার প্রেম, আমার স্মৃতি, আমার নির্মাণ সবই হয়তো ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু তার মধ্যেই পূর্ণতার আভাস আছে।

বসন্তের মনস্তত্ত্বও আমাকে ভাবায়। বিজ্ঞানীরা বলেন, দিনের আলো বাড়লে সেরোটোনিন ও ডোপামিন বাড়ে; মানুষ বেশি উচ্ছ্বসিত হয়। কিন্তু আমি জানি, কেবল রাসায়নিক ব্যাখ্যায় বসন্তের দহন ধরা পড়ে না। বসন্ত আমাকে ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড় করায়। ফেব্রুয়ারির ভাষা, মার্চের মুক্তিযুদ্ধ সব বসন্তেই। বসন্ত তাই কেবল প্রেমের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে না; প্রতিবাদেরও আধার।

আমি যখন তপন চৌধুরীর কণ্ঠে শুনি ‘পলাশ ফুটেছে শিমুল ফুটেছে’ আমি বুঝি, বসন্তের উল্লাসের পাশে এক দীর্ঘশ্বাসও থাকে। প্রিয়জন না ফিরলে রঙ আরও উজ্জ্বল লাগে, অথচ হৃদয় ফাঁকা হয়। বসন্তের এই দ্বান্দ্বিকতা আমাকে সম্পূর্ণ মানুষ করে।

বসন্তে আমি চিঠি লিখতে চাই। টিস্যু কাগজেও চিঠি লিখেছি। প্রথম তারুণ্যে। ২০০৩ সালে ড. আখতার হামিদ খানের কুমিল্লার বার্ডে তখন বসন্তের আগুন। বার্ডে ঢুকেই মনে হলো এ রকম পাগলপারা মুহূর্তে তো সংবেদীহৃদয় ঘুমিয়ে থাকতে পারে না। কাগজ হাতে নেই। সাদা টিস্যু আছে। তাতেই মেডিকেল পড়ুয়া বান্ধবীকে চিঠি লিখে ডাকে পাঠিয়ে দিই। এর পেছনে বসন্তই ভূমিকা রেখেছে, ভাষা উপহার দিয়েছে। এমনকি বসন্তে আমি সন্তানের চোখে ভবিষ্যৎ দেখি, সঙ্গিনীর মুখে আশ্বাস দেখি, আবার নিজের ভেতরে অনামিকা এক ফুলের প্রস্ফুটন দেখি যে ফুলের নাম নেই, কিন্তু সে নির্মাণের প্রতীক। এই ফুল কেবল শিল্পী দেখে, ভাবুক দেখে, যে মানুষ ভেতরের আলোকে ভয় না পেয়ে ধারণ করে সে দেখে।

আমি জানি, বসন্তে পাগলপারা হওয়া মানে দুর্বলতা নয়। এটি এক প্রকার পূর্ণতা। প্রেমে নিবেদন মানে নিজেকে হারানো তা মনে হয় না; বরং নিজেকে বৃহত্তর বৃত্তে স্থাপন করা। বিরহ মানে ভাঙন এটি আমি মানি না; বরং মিলনের সম্ভাবনাকে গভীর করা, এ রকমটিই বুঝি। বসন্ত আমাকে শেখাচ্ছে, জীবনকে আলিঙ্গন করতে হলে দহনকেও আলিঙ্গন করতে হয়।

ফাগুন এলে আমি তাই নিজেকে নতুন করে চিনে নিই। আমার ইতিহাস, আমার প্রেম, আমার নির্মাণ সব একসঙ্গে স্পন্দিত হয়। আমি জানি, শীত আবার আসবে; অন্ধকারও আসবে। তবু আমার অন্তরে অবিনাশী ফাগুন রয়ে যাবে। সেই ফাগুনই আমাকে বারবার জাগাবে, বারবার নির্মাণে ডাকবে, বারবার প্রেমে সমর্পিত করবে।

আমি বসন্তে পাগলপারা হই কারণ আমি তখন সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠি। আমার ভেতরের আগুন, আমার দীর্ঘশ্বাস, আমার গান সব মিলিয়ে আমি এক বসন্তমানব। আর এই বসন্তমানবই আমার নিয়তি, সুন্দরের অনিবার্য গন্তব্য।

বসন্ত কেবল ঋতুচক্রের একটি বিন্দু নয়; এটি মানবসভ্যতার গভীরতম নন্দন-দার্শনিক উন্মেষের সময়, যখন প্রকৃতি ও মানুষের অন্তর্জগৎ এক অদৃশ্য সেতুবন্ধনে আবদ্ধ হয়। ফাগুনের হাওয়ায় পলাশের অগ্নিরঙা প্রস্ফুটন যেমন আমাদের চোখে দৃশ্যমান, তেমনি মানুষের চৈতন্যে ঘটে এক অন্তঃস্ফুরণ যা প্রেম, বিদ্রোহ, সৃজন ও স্মৃতির বহুমাত্রিক সম্মিলন। তাই আমরা দেখি রবিঠাকুরের শিলাইদহের দিনগুলো শিলাইদহ কুঠিবাড়ির পদ্মাপাড় বাংলা বসন্তকে দিয়েছে এক অতীন্দ্রিয় বোধ, যেখানে প্রকৃতি মানবহৃদয়ের অন্তর্লিখন হয়ে ওঠে। ১৯০১ থেকে ১৯০৫ এই সময়কালে তার বহু বসন্তগান রচিত হয়; গবেষকরা দেখিয়েছেন, ওই সময় তার চিঠিপত্রে প্রকৃতি-উল্লাসের সঙ্গে গভীর আত্মসমালোচনাও পাশাপাশি আছে।

পারস্য সাহিত্যে বসন্ত আরও বিস্তৃত, আরও তীব্র। জালাল উদ্দিন রুমির মসনবিতে বসন্ত আত্মার পুনর্জন্ম; শীতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ঈশ্বরীয় প্রেমের উন্মেষ। পারস্যের নওরোজ উৎসব বসন্তের প্রথম দিন কেবল ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; এটি সাংস্কৃতিক পুনর্জন্মের প্রতীক, যেখানে আগুন, ফুল, জল সবই শুদ্ধতার চিহ্ন। এই ঐতিহ্য মধ্য এশিয়া থেকে আনাতোলিয়া হয়ে উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বসন্ত তাই এক সভ্যতার অভিন্ন ভাষা।

অন্যদিকে Albert Camus  তার বিখ্যাত উক্তিতে বলেন, ‘In the depth of winter, I finally learned that within me there lay an invincible summer’ এই ‘অপরাজেয় গ্রীষ্ম’ বসন্তেরই সমার্থক মানুষের অন্তরে অদম্য উষ্ণতা। ইউরোপীয় মানবতাবাদ বসন্তকে তাই অন্তর্গত আশার রূপক হিসেবে গ্রহণ করেছে।

এশিয়ার অন্য প্রান্তে জাপানি হাইকু ঐতিহ্যে বসন্ত ‘সাকুরা’র ক্ষণস্থায়ী প্রস্ফুটন; জীবনের অনিত্যতার স্মারক। বাশো লিখেছেন, ফুল ঝরে পড়ার মুহূর্তেই তার সৌন্দর্য পূর্ণ হয়। এই অনিত্যতাবোধ বৌদ্ধ দর্শনের সঙ্গে যুক্ত; বসন্ত মানে জন্ম ও বিলয়ের চক্র। চীনা কবি তাও ইউয়ানমিং প্রকৃতির নির্জনতায় বসন্তকে দেখেছেন সরলতার পুনরাবিষ্কার হিসেবে।

বাংলা আধুনিকতায় বসন্ত আবার রাজনৈতিক। ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯১১-এর মার্চ সবই বসন্তঘন সময়। বসন্ত তাই প্রতিবাদেরও ঋতু। আহমদ ছফা রাষ্ট্রচিন্তার যে নির্মোহ সমালোচনা করেছেন, তার ভেতরেও ছিল পুনর্জাগরণের আকাক্সক্ষা। বসন্তের রূপক সেখানে সামাজিক আত্মসমালোচনা।

এই বহুবিচিত্র ঐতিহ্যের ভেতরে দাঁড়িয়ে যখন আমরা কুমিল্লার Bangladesh Academy for Rural Development (BARD)-এর সবুজ প্রাঙ্গণে বসন্তের দুপুর দেখি, তখন ইতিহাসের ছায়াও আমাদের ঘিরে ধরে; কারণ একই ভূখণ্ডে যেমন সেগুনবনের সৌন্দর্য, তেমনি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের স্মৃতি। বসন্ত তাই সরল নয়; সে দ্বান্দ্বিক।

সৃষ্টির আনন্দ ব্যক্তিগত প্রেমের চেয়েও গভীর। গ্রিক পুরাণে অ্যাফ্রোদিতি যেমন সৌন্দর্যের প্রতীক, তেমনি রেনেসাঁর মানবতাবাদ বসন্তকে দেখেছে শিল্প-উন্মেষের কাল হিসেবে। ইতালীয় চিত্রশিল্পী বত্তিচেল্লির ‘Primavera’ চিত্রকর্মে বসন্ত দেবী ফ্লোরার মাধ্যমে সৌন্দর্যের নন্দনকানন রচিত হয়েছে; সেখানে প্রকৃতি ও মানবদেহ এক অপরূপ সামঞ্জস্যে যুক্ত।

বাঙালির বসন্তও তাই বহুরূপী রবীন্দ্রনাথের সুর, নজরুলের দ্রোহ, জীবনানন্দের নীরবতা, আবুল হাসানের মিলন-দর্শন, আহমদ ছফার আত্মসমালোচনা সব মিলিয়ে বসন্ত এক বৌদ্ধিক ও নান্দনিক ঐতিহ্য। বসন্তে মানুষ প্রেমে পড়ে, আবার প্রতিবাদেও নামে; বসন্তে সে চিঠি লেখে টিস্যু কাগজে, আবার রাজপথেও নামে পতাকা হাতে। বসন্তে সে শিলাইদহের পদ্মাপাড়ে গীত গায়, আবার এলিয়টের মতো প্রশ্ন তোলে সভ্যতার শূন্যতা নিয়ে।

এ কারণেই বসন্তের দার্শনিকতা শেষ পর্যন্ত মানবমিলনের প্রতিশ্রুতি। মানুষ বিচ্ছিন্ন হতে পারে, কিন্তু তার মৌলিক আকাক্সক্ষা মিলনের। বসন্ত সেই মিলনের স্মারক। পলাশের অগ্নিরঙা পাপড়ি আমাদের মনে করিয়ে দেয় দহন ছাড়া দীপ্তি আসে না; বিরহ ছাড়া প্রেম পূর্ণ হয় না; শীতের নিস্তব্ধতা ছাড়া বসন্তের উল্লাস অনুধাবন সম্ভব নয়।

এশিয়া থেকে ইউরোপ, পারস্য থেকে বাংলা সব সাহিত্য-দর্শন একবাক্যে স্বীকার করে, বসন্ত মানে পুনর্জন্ম এবং এই পুনর্জন্মের  ভেতরেই লুকিয়ে আছে মানুষের অনিবার্য মিলন, তার সৃজনশীল উন্মাদনা, তার অপরাজেয় আশা।