২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল কিছু বিডিআর সৈনিক, তার পেছনে ছিল দেশের সার্বভৌমত্ব নস্যাতের অপপ্রয়াস। জাতীয় শহীদ সেনা দিবসের সকালে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর, বিকেলে আলোচনা সভায় এই মন্তব্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। পিলখানা হত্যাযজ্ঞের পর উপলব্ধি করা যায় যে, জাতীয় নিরাপত্তার কাঠামো কতটা দুর্বল। নিরাপত্তা কতটা জরুরি বিষয়, তা আমাদের বোঝা উচিত। দেশের নিরাপত্তার প্রশ্নে সীমান্তরক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সুসংহত ও আধুনিক করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বিডিআর/বিজিবিকে তাদের পেশাগত উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী করে তুলতে হবে। কারণ ভূমিগত সীমান্ত রক্ষাই কেবল নয়, দেশের সাধারণ মানুষের জীবন ও কাজকে নিরাপদ করার দায়িত্ব বিজিবির ওপর। এই বাহিনীর মূল শক্তির নেতৃত্বে থাকেন সেনাবাহিনীর যোগ্য লোকেরা। পেশাদারিত্বের প্রশিক্ষণে এসে যুক্ত হয় বিজিবির সৈনিকদের সাহস, শক্তি, কর্তব্যপরায়ণতা ও দেশপ্রেমবিধৌত প্রেরণা। সেই শক্তি ও সাহসের শিরদাঁড়া গুঁড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই বিদেশি ইন্ধনে ওই বিদ্রোহ করা হয়।
বর্তমান সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘পিলখানা হত্যাকা-ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সেনাবাহিনীর প্রধান মইন উ আহমেদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।’ তিনি বলেন, ‘সামরিক শক্তিকে দুর্বল করার এক গভীর ষড়যন্ত্র ওই হত্যাকা-। যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের পরিকল্পিতভাবে বদলি করে আনা হয়েছিল। দুটি তদন্ত কমিশন গঠিত হলেও কোনোটিরই পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি আজও।’ এমনকি তৎকালীন সরকার হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকায় প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি বলে মন্তব্য করেন জামায়াত আমির। তখনকার চলমান সংসদেও এ নিয়ে আলোচনা হয়নি। কেন তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করেনি তৎকালীন হাসিনা সরকার, সে ব্যাপারে নানা গুজব হয়েছে। সেসব গুজবের হাঁড়ি ভেঙে আসল সত্য প্রকাশ না হওয়ার পেছনেও আছে সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিকদের যোগসাজশ। এমন অনেক নাম বিডিআর হত্যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে, যা সরকারকে এ নিয়ে সামনে এগোবার পথ থেকে সরিয়ে আনে। ১৭ বছরের দুর্বিষহ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিকটিম পরিবারগুলোকে কেবল আইনি পথের উদ্যোগকেই ঠেকিয়ে রাখেনি, ভেতরে ভেতরে ভীতির চাপ নির্মাণ করা হয়েছিল।
বিচার হলেও তা যে লোকদেখানো হতো, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তৎকালীন উচ্চ আদালত হাসিনার বশংবদ থাকায়, তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে হত্যাকা- নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। সত্যকে মেরে ফেলার জন্য বিচারিক প্রহসন হলেও তা জনগণের চোখে ধরা পড়ত। বিচারের নামে, তদন্তের নামে এই যে সময়ক্ষেপণ হলো, এর দায় এখন কোন সরকারের কাঁধে যাবে? বিচার না পেয়ে ভিকটিম পরিবারগুলোর গুমোট কান্না কে থামাবে? সত্য প্রকাশ পেলে জাতির বুকে চাপা ক্ষোভ মুক্তি পাবে। অথচ বিডিআর হত্যার ন্যায়সংগত বিচার হওয়া জরুরি। তাহলে জাতির বুকে থাকা অবিচারের ক্ষুব্ধ চাপ দূর হবে। দোষীরা সাজা পাবে। তা যদি না হয়, তাহলে তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট কেন প্রকাশ করা হলো না, হচ্ছে না এ প্রশ্ন থেকেই যাবে। মূলত আধিপত্যবাদী শক্তি বিডিআরকে সীমান্ত রক্ষার অতন্দ্র প্রহরীতে পরিণত করার বিরোধী। তারা বিডিআরের শক্তি ও মনোবল ধসিয়ে দিয়ে ১৭ বছর ধরে নিজেদের অপকর্ম সাধন করেছে। হাসিনা সরকার এই হত্যাযজ্ঞের বিচার করেনি। ভিকটিম বিডিআর পরিবারগুলোর মনে আশা জেগেছিল অন্তর্বর্তী সরকার বিচারকাজ শুরু করবে। কিন্তু সেখানেও কোনো গরলচক্র যে ক্রিয়াশীল ছিল, তা বোঝা যায়। হত্যাযজ্ঞের পুনরায় তদন্ত করতে আগ্রহী নয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কেন! বিডিআর হত্যাযজ্ঞ যে আমাদের সার্বভৌমত্ব নস্যাতের অপপ্রয়াস ছিল, এতে ভুল নেই। একই অভিযোগ জামায়াত নেতাও করেছেন। কেবল তা নতুন করে তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসতে পারে।