আমদানির চাপে, দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত অনেকটা ভেঙে পড়েছে। দল-মত-নির্বিশেষে এ কথা এখন সবাই স্বীকার করেন। এরপরও বিভিন্ন সরকারের মধ্যে আমদানির ঝোঁক কমার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং আরও কীভাবে বাড়ানো যায়, সেই প্রতিযোগিতা চলছে। যার সবশেষ উদাহরণ দেখা গেল, বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত অসম বাণিজ্য চুক্তিতে। ক্ষমতার শেষ লগ্নে, প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের করা এই চুক্তি নতুন করে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সামান্য শুল্ক সুবিধার বিনিময়ে চুক্তিতে যে শর্তগুলো যুক্ত হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্বেগজনক হলো জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি আমদানি নির্ভরতার ফাঁদ তৈরি হওয়া। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির বাধ্যবাধকতা। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশকে আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এলএনজি কিনতে হবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এই চুক্তি বহাল থাকলে, আগামী বছরগুলোতে শুধু আমেরিকা থেকে বছরে ১২ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার গ্যাস কিনতে হবে। যা বাংলাদেশের দুর্বল অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করবে। এ ছাড়া এই চুক্তিকে কেবল একটি বাণিজ্যিক সমঝোতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একই সঙ্গে এটি জ্বালানি নীতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ খাতের কাঠামো নির্ধারণে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে প্রশ্নটি এখন শুধু বাণিজ্যের নয়, এটি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও নীতিগত স্বাধীনতার প্রশ্ন।
আওয়ামী লীগ আমলে ২০১৭-১৮ সালে বাংলাদেশে এলএনজি আমদানি শুরু হয়েছিল মূলত গ্যাস সংকট মোকাবিলার একটি অস্থায়ী সমাধান হিসেবে। দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের অবহেলা, দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, শিল্প খাতের চাহিদা এবং ব্যাপক দুর্নীতির সুযোগ এসব বাস্তবতা মিলেই এলএনজি আমদানির পথ তৈরি হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই অস্থায়ী সমাধানই স্থায়ী নির্ভরতায় পরিণত হয়েছে। এর খেসারতও দিতে হয়েছে দ্রুত। আমদানির পরিমাণ স্বল্প হলেও এই চাপই সইতে পারেনি বাংলাদেশ। ফলে বিদ্যুৎ-জ্বালানির ব্যয় মেটাতে সরকারের হিমশিম অবস্থা। ২০১৭ সালে, এলএনজি আমদানির প্রাক্কালে সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে তৎকালীন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ পেট্রোবাংলার হাবিবুর রহমান অডিটোরিয়ামে বলেছিলেন, ‘জাপান-কোরিয়া এলএনজি আমদানি করতে পারলে বাংলাদেশ কেন পারবে না?’ জাপান-কোরিয়া পারলেও বাংলাদেশ কেন পারবে না এই দম্ভোক্তি কাটতে নসরুল হামিদের সময় লেগেছে মাত্র ৬ বছর। ২০২৪ সালে আরেকটি এক তরফা নির্বাচনের পর আবারও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী হলে, সেই পেট্রোবাংলার হাবিবুর রহমান অডিটোরিয়ামে এরপর তিনি বলেন, ‘এত টাকা দিয়ে আর এলএনজি কিনতে পারব না’। এমনকি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান-উত্তোলন করতে না পারলে, পেট্রোবাংলা-বাপেক্স কর্মকর্তাদের চাকরি থাকবে না বলে হুমকি দেন। যদিও এলএনজি আমদানি বা তেল-গ্যাস অনুসন্ধান না হওয়ার পেছনে তাদের কোনো হাত নেই। নসরুল হামিদের দম্ভোক্তি কেটে যাওয়ার কারণ, ক্ষমতার শেষ বছরগুলোতে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বিরোধীদের চাইতে জ্বালানি খাত সামাল দিতে বেশি হিমশিম খেতে হয়েছে।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের সময় স্পট মার্কেটে দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় এলএনজি আমদানি কমাতে বাধ্য হতে হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে, অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ এলএনজি নির্ভরতা শুধু ব্যয় বাড়ায় না, এটি জ্বালানি নিরাপত্তাকে ব্যাপকভাবে অনিশ্চিত করে। এই বাস্তবতায় আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন জ্বালানি কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া একটি ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কারণ এটি ভবিষ্যতে জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্য করার নীতিগত স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। যখন বিশ্ব ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে, তখন দীর্ঘমেয়াদি জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির অঙ্গীকার ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে। বিদ্যুৎ খাতের সংকট : বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত ইতোমধ্যেই উচ্চ ব্যয়ের এক চক্রে আটকে গেছে। কয়লা, তেল ও এলএনজি তিন ক্ষেত্রেই আমদানিনির্ভরতা বাড়ায় ডলার সংকটের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও জ্বালানি না থাকায়, উৎপাদন কমে যাওয়ার ঘটনা গত কয়েক বছরে বারবার দেখা গেছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এর চাপ শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়ে কখনো বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে, কখনো করের মাধ্যমে। রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থাও দ্রুত অবনতির দিকে গেছে। পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ইতোমধ্যেই দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ভারে বিপর্যস্ত। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি প্রতিশ্রুতি আর্থিক ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো, এ ধরনের আমদানি চুক্তি দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানকে নিরুৎসাহিত করে। যখন নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি কিনতেই হবে, তখন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের প্রণোদনা কমে যায়। ফলে জ্বালানি খাত দীর্ঘমেয়াদে একটি পর নির্ভরশীল অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, এর কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক সামান্য কমানোর বিনিময়ে বাংলাদেশ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে ব্যাপক নীতিগত ছাড় দিয়েছে। চুক্তিতে ‘চেষ্টা করবে’ ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে তা চাপের লক্ষ্যেই পরিণত হতে পারে, কারণ চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে শাস্তিমূলক শুল্ক পুনরায় আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে এটি স্পষ্টত এটি আমেরিকার আধিপত্যবাদী নীতির অংশ বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বাংলাদেশ হয়তো স্বল্পমেয়াদে কিছু সুযোগ-সুবিধা পাবে তবে এর বিনিময়ে জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, কৃষি খাতসহ নানা জায়গায় ব্যাপক দীর্ঘমেয়াদি দায় গ্রহণ করতে হবে। জ্বালানি খাতের ক্ষেত্রে এটি আরও স্পষ্ট।
মার্কিন চাপের কারণে ইতোমধ্যে আমেরিকা থেকে উল্লেখযোগ্য হারে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। দেশটির এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) বলছে, ২০১৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি কিনছে বাংলাদেশ। ওই বছর ৩,৪১৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কেনা হয়। ২০২৪ সালে তা দ্রুত ৪০,১৭৫ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছায়। ২০২৫ সালে এই হার আরও বেশি হওয়ার কথা। যদিও ২০২৫ সালে আমদানির পরিমাণ কত ইআইএ কিংবা পেট্রোবাংলা থেকে পাওয়া যায়নি। এই চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর কৌশলগত প্রভাব। নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে পারমাণবিক জ্বালানি বা প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সীমিত করার শর্ত ভবিষ্যতে বিকল্প অংশীদার বেছে নেওয়ার সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে ‘নন-মার্কেট’ দেশের সঙ্গে বিশেষ বাণিজ্য চুক্তি করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে বাণিজ্য সম্পর্ক সরাসরি ভূরাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। এটি স্পষ্টত চীন, রাশিয়া কিংবা ইরানকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা মানে শুধু জ্বালানি পাওয়া নয়; বরং তা সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য এবং বৈচিত্র্যময় উৎস থেকে পাওয়া। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ এবং আমদানিনির্ভরতা কমানো। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানি প্রতিশ্রুতি এই তিন লক্ষ্যকেই দুর্বল করে। ভবিষ্যতে যদি সৌর বা বায়ুবিদ্যুৎ আরও সস্তা হয়ে যায়, তবুও চুক্তিগত বাধ্যবাধকতার কারণে বাংলাদেশ ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানিতে আটকে থাকতে পারে। এতে বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার বিলম্বিত হবে এবং অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে। বর্তমান বৈশি^ক বাস্তবতায় বাণিজ্য আর শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার। বড় অর্থনীতিগুলো নিজেদের বাজার ও জ্বালানি স্বার্থরক্ষায় বাণিজ্য চুক্তিকে ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ হলেও বাংলাদেশের জন্য এটি নীতিগত ভারসাম্যের প্রশ্ন। চুক্তির অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট সরবরাহকারীর কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তও একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারের পরিবর্তে নির্দিষ্ট বাজারের ওপর নির্ভরতা তৈরি হলে অর্থনৈতিক দক্ষতা কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যয় বাড়ে।
বাংলাদেশ-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি এখন একটি বাস্তবতা তবে এটি অপরিবর্তনীয় নয়। ফলে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের দায়িত্ব হবে জ্বালানি সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজন হলে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া। প্রথমত, নির্দিষ্ট অঙ্কের এলএনজি কেনার বাধ্যবাধকতাকে শিথিল করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য নীতিগত জায়গা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, শুল্ক সুবিধার সঙ্গে বাধ্যতামূলক জ্বালানি ক্রয়ের সম্পর্ক আলাদা করতে হবে, যাতে জ্বালানি নীতি বাণিজ্য চুক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়। এই সংশোধন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নয়, বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষার পদক্ষেপ। শুল্ক কমানোর সুবিধা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এর মূল্য কত? যদি সেই মূল্য হয় জ্বালানি নীতির স্বাধীনতা, তবে এখনই পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে। বাংলাদেশের জ্বালানি খাত ইতোমধ্যেই সমস্যার পাহাড়ে চাপা। এখন প্রয়োজন এমন স্বাধীন নীতি, যা দেশকে আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে নেবে।
লেখক: সাংবাদিক
mandalcenter18@gmail.com