বারবার ভূমিকম্প কীসের ইঙ্গিত

সাম্প্রতিককালে দেশে বারবার ভূমিকম্প নিয়ে জনমনে আতঙ্ক থাকলেও বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে, গতকাল শুক্রবার সাতক্ষীরায় ৫ দশমিক ৪ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পে বিপদমুক্ত হয়েছে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকা! এর ফলে ঢাকা হয়ে দেশের মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এর চেয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা কমে আসছে। গত ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে ৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পের পর এ পর্যন্ত দেশের ভেতরে ২০ দফা ভূমিকম্প হয়েছে। আর মৃদু ও মাঝারি মাত্রার এসব ভূমিকম্পের কারণে মাটির ভেতরের শক্তি বের হয়ে আসায় শক্তিশালী ভূমিকম্প ঝুঁকি কমে আসছে বলেও অভিমত কয়েকজন বিশেষজ্ঞের।

সাতক্ষীরার আশাশুনি এলাকায় গতকাল শুক্রবার দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে মাটির ১০ কিলোমিটার গভীরে ৫ দশমিক ৪ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প হয়েছে। যদিও ভারতীয় সিসমোলজি সেন্টার এই ভূমিকম্পের তীব্রতা ৫ দশমিক ৫ নির্ধারণ করেছে। এর আগে গত ২ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার কলোরোয়াতে ৪ দশমিক ১ রিখটার স্কেলের, গত বছর ২৭ সেপ্টেম্বর যশোরের মনিরামপুরে ৩ দশমিক ৫ এবং ২০২২ সালের ৩ এপ্রিল যশোরের চৌগাছায় ৪ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে।

এই এলাকা সবচেয়ে কম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা উল্লেখ করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. জিল্লুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই এলাকায় এত বড় মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার কথা নয়। যেহেতু ৫ দশমিক ৪ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প হয়েছে, তাই এ স্পটটি নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। শুধু এ স্পটই নয়, আশপাশ এলাকায়ও এর আগে মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। তাই বিষয়গুলো আমলে নিয়ে ডিটেইল গবেষণা প্রয়োজন।

সাতক্ষীরায় কেন এত বড় মাত্রার ভূমিকম্প : দেশের ভূমিকম্পের জোনিং ম্যাপ তৈরি করেছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. তাহমিদ আল হোসাইন। এ ছাড়া দেশের ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০২০ প্রণয়নেও কাজ করেছেন এ বিশেষজ্ঞ। সাতক্ষীরা ভূমিকম্প প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই এলাকাটি কম ভূমিকম্পপ্রবণ ঠিক, কিন্তু এত বড় মাত্রার যে ভূমিকম্প হতে পারবে না তা নয়। আর এই এলাকার দক্ষিণে সুন্দরবন অংশে একটি ফল্ট রয়েছে এবং সেই এলাকায় বড় ভূমিকম্প হতে পারে বলে আমাদের ধারণা রয়েছে।

এ বিষয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. বদরুদ্দোজা মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, সাতক্ষীরার ভূমিকম্পটি আমার মতে বিক্ষিপ্ত ভূমিকম্প মনে হয়। কারণ, এই এলাকায় এমন বড় মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার কোনো দালিলিক গবেষণা নেই। তবে এই এলাকায় যেহেতু এর আগেও ছোট মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে এবং এখন আবারও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হলো, তাই ডিটেইল গবেষণা প্রয়োজন।

বিক্ষিপ্ত নয়, ময়মনসিংহ ফল্টের অংশে এই ভূমিকম্প : সাতক্ষীরার ভূমিকম্প বিক্ষিপ্ত কোনো ভূমিকম্প নয় বলে দাবি করেন বাংলাদেশ জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশের উপপরিচালক (ভূতত্ত্ব) আখতারুল আহসান। বর্তমানে আমেরিকায় পিএইডি গবেষণারত এই ভূতত্ত্ববিদের একটি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপিত নতুন এই ফল্ট লাইনের বিষয়টি উঠে এসেছে। সাতক্ষীরা ভূমিকম্পের পর তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই ভূমিকম্পটি কলকাতা থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফল্ট লাইনের মধ্যে হয়েছে। আর এ ফল্ট লাইনটি প্রায় ৩০ কিলোমিটার চওড়া। এ এলাকায় এর আগেও মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে এবং গতকালের ৫ দশমিক ৪ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পটি এর সর্বোচ্চ ধাপ।

একই মন্তব্য করেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক ও বিশিষ্ট ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, এই এলাকায় যেহেতু এর আগেও মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে এবং এখন ৫ দশমিক ৪ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প হলো, এতে প্রমাণিত হয় এই এলাকায় একটি ফল্ট রয়েছে। ফল্ট না থাকলে এত বড় ভূমিকম্প হওয়ার কথা নয়।

এদিকে গতকালের ভূমিকম্পের তীব্রতা বলতে গিয়ে কথা হয় সাতক্ষীরা সদরে অবস্থানরত সালমা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ভূমিকম্পটি যেখানে হয়েছে, সেখান থেকে আমাদের বাসার দূরত্ব প্রায় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার হবে। ভূমিকম্পের সময় শোকেসের কাচের জিনিসপত্রগুলো যেভাবে কেঁপে উঠেছে, মনে হয়েছে যেন এগুলো এখনই ভেঙে পড়বে। প্রবল ঝাঁকুনি খেয়েছে। আর আমরা কখনোই জানতাম না যে এই এলাকায় কোনো ফল্ট লাইন রয়েছে।

সাতক্ষীরা ভূমিকম্পে ঢাকা নিরাপদ হয়ে গেল : বাংলাদেশ জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশের উপপরিচালক (ভূতত্ত্ব) আখতারুল আহসান বলেন, সাতক্ষীরার ৫ দশমিক ৪ রিখটার স্কেলের কারণে ঢাকা ও আশপাশ এলাকা নিরাপদ হয়ে গেল। এখন ঢাকা ও আশপাশ এলাকায় বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি থেকে কিছুটা রেহাই পেয়েছে।

সাতক্ষীরার সঙ্গে ঢাকার ভূমিকম্পের সম্পর্ক কী? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নরসিংদী ভূমিকম্পটি ছিল ৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের। ওই ভূমিকম্পের পর দক্ষিণ-পশ্চিমে সাতক্ষীরায় হলো ৫ দশমিক ৪ রিখটার। উভয় ভূমিকম্পের কেন্দ্রের মধ্যে দূরত্ব থাকলেও নরসিংদী ভূমিকম্পের পর উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পগুলোকে প্লটিং করলে একটি জোন পাওয়া যাবে। আর সেই জোনে সাতক্ষীরা অঞ্চলও আসবে। পুরো এ জোনটিতে ছোট আকারের ১০টির বেশি ফল্ট লাইন থাকতে পারে।

তাহলে সাতক্ষীরার ভূমিকম্পের কারণে ঢাকায় ঝুঁকি কেন কমবে? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নরসিংদীতে যেহেতু ৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প হয়েছে আর এরপর গতকাল সাতক্ষীরায় হলো ৫ দশমিক ৪। তাই এই এলাকায় নিকট ভবিষ্যতে আর বড় মাত্রার ভূমিকম্প হবে না। সাতক্ষীরারটি নরসিংদী ভূমিকম্পের আফটার শক।

তবে এ মতের সঙ্গে অনেক ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞের মতপার্থক্য রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. তাহমিদ আল হোসাইন বলেন, এ কথা বলা যায় যে, নরসিংদীতে ৫ দশমিক ৭ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পের পর এর চেয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্প ওই এলাকায় হওয়া কঠিন। একইভাবে সাতক্ষীরা এলাকায় যেহেতু বড় কোনো ফল্ট লাইন নেই, তাই ওই এলাকায়ও এর চেয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই বলে সাতক্ষীরার কারণে ঢাকায় বড় ভূমিকম্প হবে না এটা বলা যাবে না।

একই মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, উভয় ভূমিকম্প পৃথক ঘটনা। একটার সঙ্গে আরেকটা সম্পর্কযুক্ত নয়। তবে দেশের ভেতরে মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হলে মাটির অভ্যন্তরে জমে থাকা শক্তি বের হয়ে আসে। আর আমাদের এখানে যেসব ভূমিকম্প হচ্ছে সেগুলো মাটির ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার গভীরের বেজমেন্টে (পলিমাটির নিচের স্তর)।

৩ মাসে ২০ দফা ভূমিকম্প : দেশের ভেতরে গত তিন মাসে ২০টি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। আগে এত বেশি ভূমিকম্প হতো না। এর মধ্যে গতকাল সাতক্ষীরা ভূমিকম্পের আগে বৃহস্পতিবার রাতে হয়েছিল ঝিনাইদহে ৩ দশমিক ২ রিখটার স্কেলের এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি হয়েছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ দশমিক ৪ রিখটার স্কেলের। এ ছাড়া ২০ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের নেত্রকোনায় ৩ দশমিক ৬ রিখটার স্কেল, ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতকে ৪ দশমিক ১ রিখটার স্কেলের, সিলেটের গোয়াইনঘাটে ১০ ও ৮ ফেব্রুয়ারি যথাক্রমে ৪ দশমিক ৪ ও ৩ দশমিক ৩ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে। এসব ভূমিকম্প প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের অভ্যন্তরে ভূমিকম্প হওয়া স্বাভাবিক। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে দেশের ভেতরে বড় ভূমিকম্প উৎপত্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকলেও সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চল ভারত ও মিয়ানমারের কারণে বড় ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে।

সারা বিশ্বে প্রতি বছর দুই হাজারবার ভূমিকম্প হয়। এর মধ্যে বছরে ১০০ ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়ে থাকে। ছোট-বড় ২৭টি প্লেট নিয়ে গঠিত পৃথিবী প্রতিনিয়ত গতিতে থাকার কারণে প্লেটগুলোর প্রান্তসীমায় ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়ে থাকে। ইন্ডিয়া ও বার্মা প্লেটের মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণেই টেকনাফ থেকে নেপাল পর্যন্ত হিমালয়ান পর্বতমালা পর্যন্ত গঠিত হয়েছিল। দেশে ২০২১ থেকে এ পর্যন্ত ১৭৯টি ভূমিকম্প রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে ৬৩টি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে দেশের অভ্যন্তরে এবং এগুলোর মধ্যে গত ১৪ মাসে হয়েছে ৩২টি। এসব ভূমিকম্পের প্রায় সবই মাটির ১০ কিলোমিটার গভীরে উৎপত্তি হয়েছে।