এবারও ফুটপাতই ভরসা মধ্যবিত্তের

পছন্দ হলে দাম মেলে না, যেগুলোর কম দাম সেসব আবার পছন্দ হয় না। তাই টানাপড়েনে থাকা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের ঈদ কেনাকাটায় ফুটপাতই ভরসা হয়ে উঠছে।

কেরানীগঞ্জের আটিবাজারের বাসিন্দা আবু বকর তার স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে রাজধানীর ফার্মেগেট এসেছিলেন ঈদের কেনাকাটা করতে। ফার্মভিউ সুপার মার্কেট ও সেজান পয়েন্টে প্রায় তিন ঘণ্টা ঘুরে সাধ আর সাধ্যের মধ্যে পোশাক কিনতে পারেননি। তাই চলে যান ফার্মগেটের ফুটপাতেই। শেষ পর্যন্ত ফুটপাতের দোকানগুলো থেকে ঈদের কেনাকাটা করছেন তারা।

ইফতার শুরুর ঘণ্টাখানেক আগে তার সঙ্গে কথা হয় আনন্দ সিনেমা হলের বিপরীতে ফুটপাতে দোকানের সামনে। পেশায় মুদিদোকানি আবু বকর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছুদিন পর নিজের দোকানের ব্যস্ততা বাড়বে। শুক্রবার দোকানে বেচা-বিক্রির চাপ কম। আগেই পোশাক কেনার কাজটা শেষ করতে চাই। তাই জুমার নামাজ শেষ করে মার্কেটে আসলাম। এখনো কোনো কাপড় কিনতে পারিনি। অনেক মার্কেট ঘুরলাম। এখন ফুটপাত থেকেই কেনার চেষ্টা করছি।’

পোশাকের বেশি দাম নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে আবু বকরের স্ত্রী বলেন, ‘বড় মার্কেটগুলোতে একদাম, ফুটপাতেও একদাম। গত বছরও একটা ওয়ান পিস জামা ৪০০-৫০০ টাকার মধ্যে কেনা যেত, এখন ফুটপাতেও এ ধরনের জামা কিনতে প্রতি পিসে ১০০-২০০ টাকা বাড়তি দিতে হচ্ছে। একটা থ্রি-পিস কিনলাম ১২০০ টাকায়। এগুলো আগে এক হাজার টাকায় কিনেছি।’

এই এলাকার মতো গতকাল শুক্রবার রাজধানীর নিউ মার্কেট, মৌচাক ও গুলিস্তান এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ঈদ কেন্দ্র করে রাজধানীর ফুটপাতের মার্কেটগুলোতে ক্রেতাদের উপস্থিতি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেড়েছে। তবে ফুটপাতের চিত্রও পাল্টেছে। অধিকাংশ দোকানে লেখা রয়েছে ‘একদাম’। বাধ্য হয়ে একদামেই কিনছেন ফুটপাত থেকে।

সন্তানদের জন্য গুলিস্তান ফুটপাত থেকে প্যান্ট আর থ্রি-পিস কিনছেন জিনিয়া আফরিন নামে একজন গৃহিণী। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘দেখেশুনে কিনতে পারলে এখান থেকে অল্প দামে অনেক ভালো জামাকাপড় কেনা যায়। ছেলের জন্য একটা প্যান্ট কিনেছি ৪০০ টাকায়। শপিং মলে ঢুকলে এ প্যান্টের দাম কম করে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা হতো।’

মৌচাকের আয়শা কমপ্লেক্সের শার্ট বিক্রি করা সাইদুল ইসলাম বলেন, পোশাকের দাম বেড়ে যাওয়ায় নিম্নআয়ের মানুষের কাছে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে বিক্রিও কমেছে। বেশি দামে কিনতে হয় বলে পোশাকের দাম কম রাখতে পারেন না বলে জানান সাইফুল। তিনি বলেন, ‘এ বছর পোলো টি-শার্ট গড়ে ২৫০ টাকায় পাইকারি কিনে এনেছি। আগে কিনতাম ২০০ টাকার কাছাকাছি। গ্রাহকদের ৩০০-৩৫০ টাকা দাম বললে তারা কেনা দামের চেয়েও কম দাম দিতে চায়। ফলে অনেকেই ফুটপাতে চলে যায়।’

ফুটপাতেও রয়েছে পোশাকের বৈচিত্র্য : শাড়ি, থ্রি-পিস, টু-পিস, শার্ট, প্যান্ট, পাঞ্জাবি সব ধরনের ঈদ পোশাক পাওয়া যায় ফুটপাতে। স্থানীয়ভাবে তৈরি কাপড়ের পাশাপাশি ভারত-পাকিস্তানি ডিজাইনের পোশাকও মিলছে ফুটপাতে।

তেজগাঁও কলেজের সামনে কয়েক বছর ধরে ফুটপাতেই মেয়েদের পোশাক বিক্রি করেন সাইদুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বড় মার্কেটগুলোর মতো আমার দোকানে সব স্টাইলের পোশাক আছে। পাকিস্তানি, ভারতীয় সব ধরনের ডিজাইন এখানে আছে। তবে পাকিস্তানি ডিজাইনগুলো ক্রেতারা বেশি পছন্দ করছেন।’

কামরাঙ্গীচর থেকে শপিং করতে এসেছেন সাজেদা খাতুন। সায়েন্স ল্যাবে পোশাক পছন্দ করার সময় তিনি বলেন, ‘মার্কেটে ঢুকতে সাহস পাই না। রাস্তা থেকে ভালো দেখে কেনার চেষ্টা করছি। মার্কেট থেকে কিছুটা কম দামে পাওয়া যায় এখানে।’

গুলিস্তান গোলাপ শাহ মাজারের কাছে রাস্তার ফুটপাত থেকে ঈদবাজার করছেন পোশাক কারখানার কর্মী সজিব মিয়া। তিনি বলেন, ‘মার্কেট আর ফুটপাত সবখানেই দাম শুনলেই মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। গত বছর দুই বাচ্চার জন্য বাজেট ছিল তিন হাজার টাকা। একজনের কাপড় কিনতেই আড়াই হাজার টাকা শেষ।’

এখনো জমে ওঠেনি মার্কেট : ঈদবাজারে যেমন ক্রেতা থাকার কথা, এখন পর্যন্ত কমই দেখা যাচ্ছে। মৌচাক মার্কেটের সামনের ফুটপাতে শিশুদের পোশাক বিক্রি করা সাইম ইসলাম বলেন, গত বছর রমজানের এই সময়ে দিনে প্রায় ৩০ হাজার টাকার বিক্রি হতো। এখন মাত্র ৭-৮ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে। তবে ক্রেতা সামনের সপ্তাহ থেকে বাড়ার ব্যাপারে আশাবাদী তিনি।

ফার্মভিউ সুপার মার্কেটে নিয়াজ নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, বেচাকেনা এখনো বাড়েনি। তার আশা, মাসের শুরুতে সাধারণ চাকরিজীবী মানুষ বেতন পেলে বিক্রি বাড়বে।

যে কারণে দাম বাড়ছে : রাজধানীর নিউ মার্কেটে কেনাকাটা করতে এসেছেন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির প্রতিনিধি আবির হোসেন। দুই মেয়ের জন্য ২১০০ টাকার পোশাক কিনেছেন তিনি। আবির বলেন, ‘একই ধরনের কাপড় গত বছর কিনেছি দেড় হাজার থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকার মধ্যে। এখন এগুলো ২ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে।’

নাফিজা ইয়াসমিন নামে এক ক্রেতার ক্ষোভ, ‘ফুটপাতেও দোকানদার ফিক্সড প্রাইস লিখে রেখেছেন। অথচ সবশেষ সেগুলো দামাদামি করেই কিনতে হচ্ছে। দূর-দূরান্ত থেকে আমরা যারা মার্কেট করতে আসি, তারা একদিনেই সব কাপড় কিনে নিয়ে যাই। এটা ব্যবসায়ীরা ভালো করেই জানেন। সেজন্য দামটাও একটু বেশি চেয়ে বসে থাকে।’

অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতি বছর বিদ্যুৎ বিল, দোকান ভাড়াসহ আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যায়। এর সবকিছু যুক্ত করতে হয় কাপড়ের দামে।