তৈরি পোশাক রপ্তানির সূতিকাগারখ্যাত বন্দরনগরী চট্টগ্রামে দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর আগে গার্মেন্টসপল্লী গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। এর মধ্যেও এখানে এ শিল্পের যে বিকাশ ঘটেছে তা সংকটে পড়েছে। রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি সংকট ও কমপ্লায়েন্স ব্যয়ের চাপে পড়ে ছোট ও মাঝারি অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে যেসব উদ্যোক্তা এখনো টিকে আছেন তারাও অস্তিত্ব রক্ষায় হিমশিম খাচ্ছেন। এ অবস্থায় চট্টগ্রামে ‘গার্মেন্টসপল্লী’ প্রতিষ্ঠার দাবি আবারও সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পক্ষে বর্তমান শিল্পনীতির সব শর্ত মেনে বিদ্যমান কারখানা টিকিয়ে রাখা কিংবা নতুনভাবে কারখানা স্থাপন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যে কারণে কারখানার সংখ্যা প্রতি বছর কমে আসছে। কঠিন শর্তের বেড়াজালে কিংবা আর্থিক সংকটে পড়ে যে সংখ্যক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তার স্থলে নতুন কারখানা স্থাপিত হচ্ছে না। এ অবস্থায় বিচ্ছিন্নভাবে ছোট ও মাঝারি পোশাক কারখানা পরিচালনার পরিবর্তে একটি পরিকল্পিত শিল্পপল্লীতে এসব কারখানা স্থানান্তর করা গেলে একই সঙ্গে অবকাঠামো, অগ্নিনিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও অন্যান্য সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বিজিএমইএর সাবেক ও বর্তমান পরিচালকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে নগরীর কালুরঘাট এলাকায় প্রায় ১১ দশমিক ৫৫১ একর জমির ওপর গার্মেন্টসপল্লী প্রতিষ্ঠার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিজিএমইএ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষর হয়েছিল। কিন্তু জমির মূল্যসহ নানা জটিলতায় সেই প্রকল্প আর বাস্তবায়িত হয়নি।
পরে মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৫০০ একর জমির বিশাল এলাকাজুড়ে গার্মেন্টস সেক্টরের জন্য বিশেষায়িত অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়। বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটি (বেজা) এবং বিজিএমইএর মধ্যে এ বিষয়ে একটি সমঝোতাও হয়। এর মধ্যে ২০২১ সালে ৪১টি পোশাক কারখানার জন্য ২৩৯ একর জমিও বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু এ খাতের চট্টগ্রামের ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বড় অংশ সেখানে কারখানা স্থাপনে আগ্রহী হয়নি। ফলে এই উদ্যোগও কাজে আসেনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, জমি বরাদ্দের পরও প্রয়োজনীয় রাস্তা, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোগত সুবিধাা নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিনিয়োগকারীরা সেখানে যাননি।
বিজিএমইএর বর্তমান পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও চট্টগ্রামে গার্মেন্টসপল্লী স্থাপনের বিষয়টি সামনে এসেছে। প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমানের নেতৃত্বে বিজিএমইএর একটি প্রতিনিধিদল চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় পোশাক শিল্প সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি ‘ডেডিকেটেড গার্মেন্টস ভিলেজ’ প্রতিষ্ঠার জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়ার জন্য বিজিএমএমইএ’র পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এজন্য সম্ভাব্য স্থান হিসেবে আমিন জুট মিল, কালুরঘাট ও জঙ্গলসলিমপুরকে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে বলে বিজিএমইএ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিজিএমইএ সূত্র জানায়, একসময় চট্টগ্রামে প্রায় ৭০০ গার্মেন্টস কারখানা ছিল এবং পোশাক রপ্তানিতে প্রায় ৪০% অবদান রাখত এই গার্মেন্টগুলো। ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধস-পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের গার্মেন্টস কারখানাগুলোর একটি বড় অংশ বড় ধরেণের বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। বৈশি^ক কমপ্লায়েন্স ধরে রাখতে না পারায় এ সময় অনেকগুলো কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে অবকাঠামোগত সুবিধার অভাব, গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, ব্যাংকিং জটিলতা ইত্যাদি কারণে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ে চট্টগ্রামের গার্মেন্টস খাত। নানা শর্তের বেড়াজাল ও আর্থিক সংকটের কারণে প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছোট ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে চালু গার্মেন্টস কারখানার সংখ্যা নেমে এসেছে তিনশর কোঠায়। এই বাস্তবতায় চট্টগ্রামের পোশাক কারখানার অস্তিত্ব রক্ষায় গার্মেন্টসপল্লী প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
বিজিএমইএ’র পরিচালক ও মেলো ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ মানছুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রামে গার্মেন্টস সেক্টরে যে অবস্থা বিরাজ করছে তাতে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একসময় যেখানে ৭০০ গার্মেন্টস ছিল এখন ২৫০-২৬০টি আছে। এ অবস্থায় সরকার যদি গার্মেন্টসপল্লী প্রতিষ্ঠা করে দেশীয় উদ্যোক্তা ও এসএমই সেক্টরে পৃষ্ঠপোষকতা না দেয় তাহলে দেশের প্রধান এই রপ্তানি খাতের কর্তৃত্ব বিদেশিদের হাতে চলে যাবে। এই সেক্টরকে টিকিয়ে রাখতে হলে গার্মেন্টসপল্লী প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।
বিজিএমইএর এই নেতা বলেন, সিডিএ মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী যেখানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন হিসেবে চিহ্নিত করে দেওয়া আছে। এর বাইরে গার্মেন্টস বিল্ডিং করা যাবে না। শহরের সঙ্গে লাগোয়া যেসব উপজেলা আছে আনোয়ারা, পটিয়া, সীতাকুন্ড মিরসরাইসহ এ ধরনের এলাকাগুলোতে কৃষিজমিতে কারখানা করা যাবে না। বর্তমান শিল্পনীতি অনুযায়ী আমাদের কারখানা করতে হলে কলকারখানা অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স লাগবে, ফায়ার সার্ভিস থেকে লাইসেন্স লাগবে। কলকারখানার লাইসেন্স পেতে হলে কারখানা হতে হবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে, বিল্ডিং অবশ্যই বিএনবিসি কোড অনুযায়ী হতে হবে, ফায়ার লাইসেন্স পেতে হলে ফায়ার হাইড্রেন্ট থাকতে হবে। একজন ব্যক্তির পক্ষে সেটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই এই সেক্টরকে টিকিয়ে রাখতে গার্মেন্টসপল্লী লাগবেই এটা বিজিএমইএর এই সময়ের বার্নিং ইস্যু।
সাইফুল্লাহ মানছুর বলেন, আগে বাংলাদেশের নিউ এন্ট্রাপ্রেনাররা যাতে গার্মেন্টস সেক্টরে আসতে পারে সেই জন্য ইপিজেডের বাইরে কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারীর এ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ ছিল না। কিন্তু রহস্যজনকভাবে সেই সেই নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর ফলে একদিকে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা যেখানে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে, সেখানে বড় ব্যবসায়ীদের অনেকে এখন চায়নাসহ বিভিন্ন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারে ইপিজেডের বাইরে গার্মেন্টস করছে। চীনে ওদের কাপড় কারখানা আছে। ওখান থেকে এফওবি-তে (ফ্রি অন বোর্ড) কাপড় নিয়ে আসতেছে। তারপর এখানে তা সেলাই করে আমেরিকায় ওদের ওয়্যারহাউজে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে এখানে দেশীয় মালিকানাধীন আর কোনো ছোট বা মাঝারি গার্মেন্টস কারখানা গড়ে উঠবে না এবং একসময় আমাদের অবস্থাও কম্বোডিয়ার মতো হয়ে যাবে। হয়তো একসময় এখানে সব গার্মেন্টসের মালিক হয়ে যাবে বিদেশিরাই।