রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। অধিকাংশ যুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, জড়িয়ে রয়েছে আমেরিকা। কোথাও অর্থ-অস্ত্র সাহায্য, কোথাও সরাসরি অথবা কোথাও নীতিগতগতভাবে সমর্থন জানাচ্ছে তারা। অনেকে মনে করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকার গঠন করতে পারলে, বিশ্বে যুদ্ধের ভয়াবহতা কমবে। বিশেষ করে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হবে। তা তো হলোই না, নতুন করে বিভিন্ন দেশে আবার যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এখানেও জড়িয়ে আছে সেই আমেরিকা। গতকাল ইরানের বিভিন্ন শহরে উপযাজক হয়ে হামলা করে বসল ইসরায়েল। কেন? সবাই বুঝতে পারছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নেপথ্যে রয়েছে পারমাণবিক (!) শক্তিধারী ভিন্ন কোনো দেশ। বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, ইরান কোন পথ বেছে নেবে? তারা কি পাল্টা আক্রমণ করবে নাকি আত্মরক্ষার কৌশল নেবে? বেশি সময় লাগেনি। কিছুক্ষণ পরই তারা পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। এক্ষেত্রে রাশিয়া, চীন এবং উত্তর কোরিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েল সফর শেষ করার পরই এই হামলা হলো। অনেক সমালোচক বলছেন, হয়তো কোনো না কোনোভাবে এর সঙ্গে ভারতের যোগ থাকতেও পারে! যদিও তার বাস্তবসম্মত কোনো প্রমাণ নেই। হয়তো বিষয়টি নিছকই কুৎসা।
মধ্যপ্রাচ্য ইস্যু যারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, এই মুহূর্তে যে প্রশ্নটি তাদের নিশ্চিত করেছে তা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ একমাত্র ইসরায়েলের হাতে থাকবে। আবার ইসরায়েলের মাথার ওপরে বসে আছে যুক্তরাষ্ট্র। পরোক্ষভাবে আমেরিকার একচেটিয়া আগ্রাসন চলবে মধ্যপ্রচ্যে যেখানে একমাত্র বাধা ইরান। সুতরাং তাকে ধ্বংস করতে হবে। অনেক দিন ধরে, ইরানের কাছাকাছি যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে স্থির বসে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে অনেক আগেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের যুদ্ধজাহাজগুলো পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর, লোহিত সাগর এবং আরব সাগরে মোতায়েন করে রেখেছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানান, ‘দেশের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতেই তাদের এ পদক্ষেপ।’ জানা গিয়েছে, তেহরানে খামেনির দপ্তরের কাছে হামলা হয়েছে। এলাকার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। তবে নিরাপদেই রয়েছেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বর্তমানে তেহরানে নেই। আগেই তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার ছেলে মোজতবাকে হত্যা করার ছক কষেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। এমনই দাবি করেছিল, মার্কিন এক সংবাদমাধ্যম। তারপরই সতর্ক হয় তেহরান। অন্যদিকে গতকাল মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইরান। আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কাতারে বিমান হামলা চালিয়েছে তারা। এরপর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। ইরানে সামরিক অভিযানে আমেরিকার হাত রয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে স্বীকার করে নিয়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানকে ‘জঙ্গিরাষ্ট্র’ বলেছেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের কথায়, ‘একটি জঙ্গিরাষ্ট্রের হাতে কোনোভাবেই পরমাণু অস্ত্র থাকতে পারে না।’ এই উত্তেজনা এমন সময় বেড়েছে যখন ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে যে বিরোধ চলছে, তা পূরণ না হওয়া থেকে তিক্ততা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইসরায়েল এই হামলাকে ‘প্রতিরোধী’ বললেও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এটি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাব ও কূটনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে এই সংঘাতের প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে। ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস হামলার জবাবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রথম ধাপের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কিন্তু এই পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শেষ কোথায়? মূল উদ্দেশ্য কী? খামেনিকে হত্যা করে মধ্যপ্রাচ্যে একচেটিয়াভাবে ইসরায়েলের রাজত্ব কায়েম করা? প্রকারান্তরে এটি যে আমেরিকার শক্তি বাড়াবে, তা সবাই বোঝে। যদি ইরানে পারমাণবিক হামলা হয়, তখন কি রাশিয়া, চীন বসে থাকবে? রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত মেদভেদেভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, ইরানকে লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান চালানোর আগে যুক্তরাষ্ট্র মূলত পরমাণু আলোচনাকে একটি ‘ছদ্মবেশ’ বা কভার-আপ হিসেবে ব্যবহার করেছে। মেদভেদেভ বলেছেন, ‘তথাকথিত শান্তিকামীরা আবারও তাদের আসল চেহারা দেখাল। ইরানের সঙ্গে যাবতীয় আলোচনা ছিল আসলে একটি সাজানো অপারেশন। এ নিয়ে কারোর মনেই কোনো সন্দেহ ছিল না। আসলে কেউ কখনোই কোনো বিষয়ে একমত হতে বা সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়নি।’
এই যখন অবস্থা, তখন যুদ্ধ পরিস্থিতি হঠাৎ করে ভিন্নমাত্রা ধারণ করতে পারে। যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ইরান এবং ইসরায়েলের বাইরে দুদেশের সমর্থনে থাকা রাষ্ট্রগুলো এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে তখন তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। মূলত এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে ইরানের তেল শক্তি। ২০২৫-২৬ সালের তথ্যানুযায়ী, ইরানের তেলের মজুদ প্রায় ২০৮ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি। যা বিশ্বের মোট তেল মজুদের প্রায় ১১.৮২ শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ তেল মজুদের কারণে ইরান বিশ্বের শীর্ষ ৩ বা ৪টি তেলসমৃদ্ধ দেশের অন্যতম। দেশটির প্রধান খনিজ সম্পদগুলো খুজস্তান এবং পারস্য উপসাগরীয় উপকূলে রয়েছে। ফলে ইরানকে পরাস্ত করতে পারলে, শুধু মধ্যপ্রাচ্যে একক আধিপত্য নয়, দেশটির তেল এবং খনিজ সম্পদ খুবলে নেওয়া যাবে। তখন ইসরায়েল যেমন তেমন, যুক্তরাষ্ট্রই হবে সর্বেসর্বা। কিন্তু সমস্যা হবে অন্য জায়গায়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইরান চীনের কাছে সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে। এটি তাদের মোট রপ্তানির ৮০%-এরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সম্পর্ক আদা-কাঁচকলায়। যদি ইরানের নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যায়, তখন চীন কী করবে? এই যুদ্ধে চীন এবং রাশিয়া পরোক্ষভাবে ইরানের পাশে থাকলেই যত ভয়! সব পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পরস্পরের মুখোমুখি হলে, পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়াবে, তা বলা কী কঠিন!
লেখক : সাংবাদিক
tapas.raihan@gmail.com