নিরাপদ খাদ্যই অগ্রাধিকার

নতুন সরকার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত। জনগণের প্রত্যাশা, এই সরকার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির পরিসীমা অতিক্রম করে মানুষের মৌলিক অধিকার এবং জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ও বাস্তবধর্মী উদ্যোগ গ্রহণ করবে। নাগরিক সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো, সরকারের প্রথম একশ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচির মধ্যে ‘খাদ্য নিরাপত্তা’কে প্রাধান্য দেওয়া। দুর্ভাগ্যজনকভাবে নির্বাচনী ইশতেহারে, নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়নি, যা সচেতন নাগরিকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে। তবু আশা করা যায়, সরকার বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে খাদ্য নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে এবং জনগণের আস্থার প্রতিফলন ঘটাবে। যে জাতি প্রতি পদক্ষেপে বেঁচে থাকার জন্য ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাকে সুস্থ বা কল্যাণকর জাতি হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের এই বিশাল জনপদে, সুস্থতার চেয়ে অসুস্থতাই যেন এক অনিবার্য বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। যদি উন্নত সব দেশের ওষুধের দোকান একত্রে হিসাব করা হয়, তবুও তা হয়তো বাংলাদেশের সংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছাবে না, এমনকি অর্ধেকও হবে না। এটি কোনো উন্নয়নের সূচক নয়, বরং একটি জাতির মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করে। নাগরিকের ঘরে বিশুদ্ধ ও শতভাগ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা একটি মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তব চিত্র উদ্বেগজনক। আমাদের খাবার, খাদ্য উপাদানে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক উপস্থিতি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আমরা প্রতিদিন যে খাদ্য গ্রহণ করছি, তার মধ্যে কখনো ভারী ধাতু, কখনো কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থেকে যাচ্ছে। পাশাপাশি কৃত্রিম রঙ, ক্ষতিকর রাসায়নিক দূষণ এবং কখনো তেজস্ক্রিয় উপাদানের মতো বিপজ্জনক উপাদান অজান্তেই শরীরে প্রবেশ করছে। সকালের নাশতায় আমরা যে ডিম খাই কিংবা দুপুরে মাছ, মাংস বা পটোলসহ বিভিন্ন সবজি দিয়ে যে ভাত খাই, প্রতিটি খাদ্য উপাদানের মধ্যে বিষাক্ত উপাদানের মিশ্রণের আশঙ্কা  তৈরি হয়েছে। যদি বিভিন্ন খাদ্যের যথাযথ ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করা হয় এবং সেই ফলাফল প্রকাশ করা হয় তাহলে সেখানে রেডিয়াম, থোরিয়াম কিংবা ইউরেনিয়ামের মতো তেজস্ক্রিয় উপাদানের উপস্থিতি ধরা পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই ধীর বিষক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং জাতির সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। খাদ্যে নিরাপত্তাহীনতা উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোগ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে সৃষ্টি হয় এবং প্রতিটি ধাপেই ঝুঁকির মাত্রা ক্রমে বেড়ে ওঠে। ফসল ফলানোর সময় অতিরিক্ত রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং আগাছা নাশকের অনিয়ন্ত্রিত ও অযৌক্তিক ব্যবহার জমি ও উৎপাদিত খাদ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিষাক্ত অবশিষ্টাংশ রেখে যায়, যা পরে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। খাদ্যশস্য উত্তোলন ও সংরক্ষণ পর্যায়ে সঠিকভাবে শুকানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং নিরাপদ গুদাম ব্যবস্থার অভাবে ছত্রাক, বিষাক্ত জীবাণু কিংবা নানা ধরনের রাসায়নিক সংক্রমণ ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বাজারজাত করার পর্যায়ে অধিক লাভের আশায় কৃত্রিম রঙ, ফর্মালিন অথবা অন্যান্য ক্ষতিকর সংরক্ষণ উপাদান মেশানোর প্রবণতা খাদ্যকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ করে তোলে। পাশাপাশি শস্য, ফল ও শাকসবজি রান্না বা খাওয়ার আগে যথাযথভাবে ধোয়া, নিরাপদ পানি ব্যবহার, সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ এবং অস্বাভাবিক রঙ বা গন্ধযুক্ত খাদ্য পরিহার না করলে এসব দূষণ সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। খাদ্য শুধু মানুষের পুষ্টি ও জীবনধারণের অপরিহার্য উপাদান নয়, এটি জাতির স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের টেকসই বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে ও অবিচ্ছিন্নভাবে সম্পর্কিত। খাদ্য নিরাপত্তার অভাব শুধু একটি জাতির কর্মক্ষমতা হ্রাস করে না, এটি চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়, সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়নের গতি ব্যাহত হয় এবং জাতির সামগ্রিক সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে একটি উন্নত, আত্মমর্যাদাশীল ও টেকসই রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের একটি মৌলিক, অপরিহার্য এবং প্রাথমিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার কেবল মাটির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে না, বরং উৎপাদিত খাদ্যের গুণগতমানকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অধিক উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে অনেক কৃষক অনিয়ন্ত্রিতভাবে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করছেন, ফলে মাটি ধীরে ধীরে তার প্রাকৃতিক শক্তি হারাচ্ছে এবং পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে কেবল মাটির গুণমান নয়, বরং সম্পূর্ণ কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। যে কারণে রাসায়নিক সারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য সরকারের একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক রোডম্যাপ প্রণয়ন অত্যন্ত প্রয়োজন। এই রোডম্যাপে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার কমানোর পরিকল্পনা এবং বিকল্প নিরাপদ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের কৌশল অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যে কৃষিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সফলতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ যদি উন্নত ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়, তবে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে কৃষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, নিরাপদ বালাইনাশক ব্যবহার, সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ এবং পরিবেশবান্ধব কৃষিপদ্ধতি সম্পর্কে তাদের প্রশিক্ষণ জরুরি।

নতুন সরকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অনন্য সুযোগ যে, তারা খাদ্য নিরাপত্তাকে দেশের জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে স্থাপন করতে পারে। এটি শুধু জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে নয়, দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কেবল বর্তমান প্রজন্মকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয় নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। সুতরাং নাগরিক সমাজের জোর দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন সরকারকে উচিত তাদের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মসূচির মধ্যে নিরাপদ খাদ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। এ উদ্যোগের মধ্যে রাসায়নিক সারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, জৈব বালাইনাশক এবং জৈব সার ব্যবহারে ভর্তুকি বৃদ্ধি, সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ প্রণয়ন, কৃষক ও খাদ্যসংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং ক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা, পাশাপাশি জনসাধারণের মধ্যে গণসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেত হবে। এই ধরনের সমন্বিত ও ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন একটি অপরিহার্য, অগ্রাধিকারপূর্ণ এবং নীতিনির্ধারক দাবি। এই সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গণমাধ্যম অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। টেলিভিশন, রেডিও, পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যের গুরুত্ব এবং করণীয় সম্পর্কে সহজ এবং বোধগম্য ভাষায় প্রচার চালানো হলে সমাজের সব স্তরের মানুষ সচেতন হবে। সরকারের উচিত, গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে একটি সমন্বিত সচেতনতা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা।

নিরাপদ খাদ্য কেবল স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অনিরাপদ খাদ্যের কারণে জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি পেলে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে এবং কর্মক্ষমতা কমে যায়, যা জাতীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা গেলে একটি সুস্থ, কর্মক্ষম এবং উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী গড়ে ওঠে, যা টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিকে শক্তিশালী করে। নতুন সরকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য সুযোগ যে, তারা খাদ্য নিরাপত্তাকে দেশের জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে স্থাপন করতে পারে এবং এর মাধ্যমে সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কেবল বর্তমান প্রজন্মকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয় নয়, বরং এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সরকারকে উচিত, প্রথম ১৮০ দিনের কর্মসূচির মধ্যে নিরাপদ খাদ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। এর মধ্যে রাসায়নিক সারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, জৈব বালাইনাশক এবং জৈব সার ব্যবহারে ভর্তুকি বৃদ্ধি, সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ প্রণয়ন, কৃষক এবং খাদ্যসংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনসাধারণের মধ্যে গণসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। এ ধরনের সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের একটি অপরিহার্য ও অগ্রাধিকারপূর্ণ দাবি, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিকে দৃঢ় করবে। একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে, নাগরিকদের জন্য নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং নাগরিকদের সম্মিলিত দায়িত্ব। তবে এই পরিবর্তনের সূচনা সরকারই করতে পারে সঠিক নীতি প্রণয়ন, পরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা, নিরাপদ খাদ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি সুস্থ, শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে।

লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, চেয়ারম্যান ডিআরপি ফাউন্ডেশন

rssarker69@gmail.com