সব কাজের কাজী, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘দ্যা জ্যাক অব অল ট্রেডস’। উইল জ্যাকস যেন এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড দলে নিজের নামের কাছাকাছি ভূমিকাতেই অবতীর্ণ হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপে হাল ধরা থেকে শেষ দিকে চালিয়ে খেলা, মাঝের ওভারে উইকেট নেওয়া কিংবা কঠিন ক্যাচ; জ্যাকস হাজির। ৭টা ম্যাচ এখন পর্যন্ত খেলেছে ইংল্যান্ড, জিতেছে ৬টা; এর ভেতর ৪ ম্যাচেই সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার উঠেছে এই অলরাউন্ডারের হাতে। ১৯১ রান, ৭ উইকেট; সংখ্যার হিসেবে উইল জ্যাকসের চেয়ে বেশি রান বা উইকেট নিয়েছেন আরও অনেকেই, তবে ইম্প্যাক্ট বা খেলায় দলের ফলে পারফরম্যান্সের প্রভাব বিবেচনা করলে ইংল্যান্ডের এই অলরাউন্ডারই অন্যদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সবশেষ ম্যাচের কথাই ধরা যাক। অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক তার হাতে বল দেন ম্যাচের অষ্টম ওভারে,পাওয়ার প্লে শেষ হবার এক ওভার পরেই। নিজের প্রথম ওভারেই জ্যাকস তুলে নেন ফিন অ্যালেনের মূল্যবান উইকেট। ডিপ মিডউইকেটে ফিল্ডার রেখে অফস্পিনে একটু বাউন্স দিয়েই বল করছিলেন জ্যাকস,কাজে লাগে কৌশলটা।১৮তম ওভারটা ছিল জ্যাকসের স্পেলের শেষ ওভার,প্রথম বলেই বোল্ড করেন আরেক বিপজ্জনক ব্যাটসম্যান গ্লেন ফিলিপসকে। এবার আসা যাক ব্যাটিংয়ের প্রসঙ্গে। যখন নেমেছেন, তখন ইনিংসের ১৫তম ওভার চলছে। স্যাম কারান আউট হয়ে গেছেন দলীয় ১০০ রানে,১৪.৩ ওভারে। ৩৩ বলে জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের দরকার ৬২ রান, হাতে ৫ উইকেট। এমন পরিস্থিতি থেকে ইংল্যান্ড ম্যাচটা জিতল ৩ বল আগে, উইকেট গেছে আর মাত্র একটি। ১৮ বলে ৩২ রানে অপরাজিত জ্যাকস।
নেপাল এবং ইতালির বিপক্ষে ম্যাচ দুটো না হয় ছিল গ্রুপ পর্বে, অপেক্ষা কৃত সহজ প্রতিপক্ষ পেয়ে ছড়ি ঘোরানোটা সহজ। তবে শ্রীলঙ্কা ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সুপার এইটের দুটো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ইংল্যান্ডকে জেতানোর পেছনে বড় ভূমিকা জ্যাকসের। চারটা ম্যাচসেরার পুরষ্কারে জ্যাকস এখন ২০১২ সালে শেন ওয়াটসনের অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের কাছাকাছি! সেই বিশ্বকাপে ওয়াটসন করেছিলেন ২৪৯ রান, হয়েছিলেন আসরের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক আর ১১ উইকেট নিয়ে হয়েছিলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। ওয়াটসনও ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছিলেন ৪টা ম্যাচে; আয়ারল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে পৌঁছে যাওয়ায় জ্যাকসের সামনে সুযোগ আছে আরও কমপক্ষে একটি ও সর্বোচ্চ দুটো ম্যাচে খেলার, তবে ওয়াটসনের ভাগ্য নিঃসন্দেহে বরণ করতে তিনি চাইবেন না। গোটা আসর দাপুটে ক্রিকেট খেলা অস্ট্রেলিয়া সেমিফাইনালে বিধ্বস্ত হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে। ৪ ওভারে ৩৫ রান দিয়ে উইকেট শূন্য আর ব্যাট হাতে ৭, দলের সবচেয়ে প্রয়োজনের সময়েই টুর্নামেন্টে সবচেয়ে খারাপ দিনটা এসেছিল ওয়াটসনের।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচসেরার পুরস্কার পাবার পর সংবাদ সম্মেলনে এসে জ্যাকস তাই পা রাখলেন মাটিতেই, ‘অবশ্যই খুব খুশি। একের পর এক ম্যাচে এমন পারফরম্যান্স আসলে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় যে আমি সঠিক পথেই এগোচ্ছি। ক্রিকেটে কিছু দিন আপনার ভালো যাবে, কিছু দিন যাবে না। আমি এখন শুধু খেলাটা উপভোগ করছি।’ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে রান তাড়ায় শেষ ৩ ওভারের সময়ের অনুভূতিটাও জানিয়েছেন সাংবাদিকদের, ‘আমি ওই সময়ে বেশ নার্ভাস ছিলাম। জানতাম যে লক্ষ্যটা অনেক বড়। দুই রাত আগে এই পিচেই শ্রীলঙ্কার ম্যাচটি আমরা দেখেছি; এছাড়া নিউজিল্যান্ড কতটা ভালো বোলিং করছিল এবং আমাদের ব্যাটাররা কতটা হিমশিম খাচ্ছিল, সেটা আমি নিজে দেখছিলাম এবং নিজেও সেখানে বোলিং করেছি। আমি জানতাম ওই রানগুলো তোলা অনেক কঠিন ছিল। তাই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমাদের বিশেষ কিছু একটা করতে হবে’। এরপর রেহান আহমেদের ছক্কাই তাকে আশা জোগায় ‘আর আমি যেমনটা বললাম, রেহান যখন ওর দ্বিতীয় বলেই ওই ছক্কাটা মারল, সেটা আমাকেও মানসিকভাবে শক্তি জুগিয়েছিল। তখন আমার মনে হলো, ঠিক আছে, আমাদের এখনো জেতার সুযোগ আছে। এরপর তো আমি সেই ওভারটি ৬, ৪, ৪ মেরে শেষ করলাম এবং আমরা ম্যাচে ফিরে এলাম। আমার মনে হয় এই ধরনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ; শুধু কত রান হলো তা নয়, বরং কোন পরিস্থিতিতে রানটা আসছে সেটাই বড় কথা। একটা বড় ছক্কা মেরে বোলারকে বুঝিয়ে দেওয়া যে আমরা হাল ছাড়িনি এবং আমরা জিততে পারি এই বিশ্বাসটাই আসল। আমার মনে হয় ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই আমাদের মানসিকতা বদলে গিয়েছিল।’
জ্যাকসকে একাদশে নিয়মিত রাখছেন অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক আর জ্যাকসও তার প্রতিদান দিচ্ছেন নিরন্তর। ক্যারিয়ারের শুরুতে ছিলেন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান, ইনিংসের সূচনায় কিংবা ওয়ানডাউনে নামতেন। সেই সময়টায় তার অলরাউন্ডার সত্তায় খুব একটা বিশ্বাস রাখেনি টিম ম্যানেজমেন্ট, এই সময়টায় অর্থাৎ ২০২২ এর সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ এর নভেম্বর পর্যন্ত যতগুলো ম্যাচ ইংল্যান্ডের হয়ে খেলেছেন জ্যাকস, তাতে সব মিলিয়ে ৩ ম্যাচে ১ ওভার করে মোট ৩ ওভার বল করেছেন। আর এখন, বিশেষ করে বিশ্বকাপের আগে শ্রীলঙ্কা সফর এবং বিশ্বকাপের জ্যাকস হয়ে উঠেছেন নিয়মিত বোলার, এশিয়া সফরে এখন পর্যন্ত তার শিকার ১১ উইকেট।
জ্যাকসের অলরাউন্ড নৈপুণ্যে ভর করে ইংল্যান্ড পৌঁছে গেছে সেমিফাইনালে। উপমহাদেশের কন্ডিশনে ভালো খেলার পেছনে জ্যাকস সবসময় কৃতিত্ব দেন বিপিএলকে। চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের হয়ে খেলা দুটো মৌসুম তাকে উপমহাদেশের স্পিন সহায়ক উইকেটে ব্যাটিং করা শিখিয়েছে, এমনটা বলেছেন একাধিকবার। বিপিএলে খেলে বাইরের ক্রিকেটাররা অনেকেই শিখেছেন অনেক কিছু, শুধু যারা নিয়মিত খেলেন তাদেরই রয়ে গেছে ঘাটতি।