প্রায় ৩০ বছর পর এবার অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে। ২৯ মিন্টো রোডের লাল রঙের বাড়িটিতে এবার সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা উঠতে পারবেন। জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান এ বাড়িটিতে বসবাস করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সেই চিন্তায় গণপূর্ত অধিদপ্তর বাড়িটি বসবাস উপযোগী করে তুলেছে। তবে এখনো ওই বাড়িতে ওঠার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানাননি বিরোধীদলীয় নেতা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে বিরোধী দলের প্রতি সরকারি দলের এক ধরনের আক্রোশে বাড়িটি অবহেলিত ছিল। যে কারণে কোনো বিরোধীদলীয় নেতা ওই বাড়িতে বসবাসে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না। ১৯৯৬ সালের পর ওই বাড়িতে কোনো বিরোধীদলীয় নেতা বসবাস করেননি। তবে কেউ কেউ কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
গণপূর্তের কর্মকর্তারা বলছেন, মিন্টো রোডে সরকারি বাড়িগুলোর মধ্যে পাঁচটি বাড়ির স্থায়ী বরাদ্দ রয়েছে। এগুলোর বরাদ্দ কখনো পরিবর্তন হয় না। ডিসির বাংলো এবং বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবন এর মধ্যে অন্যতম। তারা যদি কোনো কারণে এই বাড়িতে না ওঠে, গণপূর্ত চাইলেই অন্য কাউকে বরাদ্দ দিতে পারে না। সেজন্য প্রায় ৩০ বছর বাড়িটিতে কেউ বসবাস করেনি।
এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশে ইতিবাচক রাজনীতির ধারা তৈরি হয়েছে। গতকাল শনিবার প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের ইফতার মাহফিলে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্প্রতি রাজনীতিতে যা বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক মহল। একই সঙ্গে নির্বাচনের আগে থেকে জামায়াত আমির ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছেন। সংসদ সদস্যদের ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি ও ফ্ল্যাট গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। যদিও নির্বাচনের পর সরকারি দলের সংসদ সদস্যরাও একই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইতিবাচক রাজনীতির অংশ হিসেবে ডা. শফিক দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা সরকারি এই বাড়িটি ব্যবহার করবেন বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
আলাপকালে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাড়িতে ওঠার ব্যাপারে এখনো কোনো চিঠি পাওয়া যায়নি। আনুষ্ঠানিক চিঠি পেলে বাড়িটি পরিদর্শন করা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে এবং ওনার বসবাসের উপযোগী বলে বিবেচিত হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সম্প্রতি বাড়িটিতে ব্যাপক সংস্কার করছে সরকার। অবকাঠামো সংস্কারের পাশাপাশি নতুন রঙ করা হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতার চাহিদা অনুয়ায়ী আরও সংস্কার করতে প্রস্তুত রয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বাড়িটির সংস্কারকাজ শেষ করেছি। প্রাথমিকভাবে বাড়িটি বিরোধীদলীয় নেতার ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রেখেছি। উনি চাইলে যেকোনো সময় উঠতে পারবেন। বিরোধীদলীয় নেতার সম্মান ও বয়স বিবেচনায় ওনার চাহিদামতো আমরা আরও সংস্কার করব। স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাসের জন্য যা যা দরকার, তাই করে দেওয়া হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। তখন বিরোধী দল নেতা ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তখন তিনি মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবনে ওঠেন। এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেতা হন। তিনি তখন ওই বাড়িটিকে রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করতেন। এরপর ২০০১ সালে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলে বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা বাড়িটি বরাদ্দ পেলেও তিনি ধানম-ির সুধা সদনেই থাকতেন। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেতা হলেও তিনি ক্যান্টনমেন্টের মঈনুল রোডের বাড়িতে বসবাস করতেন। বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাড়ির জন্য আবেদনও করেননি তিনি।
জানা গেছে, ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তৎকালীন বিরোধী দল নেতা রওশন এরশাদ এবং ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ বাড়িটি বরাদ্দ পাওয়ার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু ভবনটি সংস্কারের অজুহাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ওই বাড়িতে উঠতে আবেদন করেছিলেন জিএম কাদের। কিন্তু সংস্কার শেষ হওয়ার আগেই গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতন হয়।
গণপূর্ত অধিদপ্তর বলছে, ২০০৯ সালে বিরোধীদলীয় নেতার জন্য বরাদ্দ লাল ভবন ভেঙে নতুন নকশায় সেগুলো নির্মাণের নির্দেশনা দেয় সরকার। এই নির্দেশনার পরই স্থাপত্য অধিদপ্তর নকশা প্রণয়নসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বিরোধীদলীয় নেতার বাড়িটির নতুন নকশা প্রণয়নের কাজ শুরু করেন স্থাপত্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাছির। কিন্তু কাজ কিছুদূর এগোনোর পর তিনি অবসরে চলে যাওয়ায় সেই কাজ আটকে যায়।
এরপর ২০০৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বিরোধীদলীয় নেতার বাড়িসহ পুরান ঢাকার পাঁচটি বাড়িকে ঐতিহ্য বা হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এরপর ২০১২ সালে এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হেরিটেজ ভবন ভাঙার ওপর উচ্চ আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে বাড়িটি ভেঙে নতুন ভবন তৈরির উদ্যোগও থমকে যায়। আবার বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ভবনটি দূর থেকে চাকচিক্যময় দেখা গেলেও ভেতরে ছিল জরাজীর্ণ। দেয়ালগুলো স্যাঁতসেঁতে, প্লাস্টার খসে পড়ছে। বৃষ্টি হলে পানিও পড়ে এই বাড়িতে। বেশিরভাগ আসবাব এরই মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে বাড়িটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় মূল স্থাপত্যনকশা ঠিক রেখে বাড়িটি মেরামত ও সংস্কার করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।
১৯০৫ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার সরকারি কর্তাদের বসবাসের জন্য মিন্টো রোডে কয়েকটি বাড়ি নির্মাণ করে। এরপর স্বাধীন বাংলাদেশে ২৯ মিন্টো রোডের বাড়িটি বিরোধীদলীয় নেতার জন্য বরাদ্দ করা হয়। এখানে প্রায় আড়াই একর জমির ওপর থাকা এই বাড়িতে দোতলা মূল ভবনের প্রত্যেক তলায় চারটি করে কক্ষ রয়েছে।