তিস্তার চরে হাজারো কৃষকের জীবিকা

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তাপারের ছয় ইউনিয়নের হাজার হাজার কৃষকের জীবন-জীবিকা নির্ভর করছে ধু ধু বালুচরের চাষাবাদের মাধ্যমে। বলা হয় হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তাপারের মানুষের দুঃখ তিস্তা নদী। এই তিস্তা নদী বর্ষার সময় যেমন ভাসিয়ে নিয়ে যায় তিস্তা পাড়ের হাজারো মানুষের স্বপ্ন, ঠিক তেমনি শুষ্ক মৌসুমে কিছুটা আশার আলো জাগায় পলি বেষ্টিত বালুর চরে ফসল চাষের মাধ্যমে।

প্রতিবছর বর্ষার পানি শুকিয়ে যাবার পর যখন জেগে ওঠে তিস্তার বালুর চর তখন জীবন-জীবিকার তাগিদে, বেঁচে থাকার লড়াই শুরু করেন কৃষকরা। তারা ভুট্টা, তামাক, গম,আলু, পেঁয়াজ, সরিষা, মিষ্টি কুমড়া, তরমুজ, মরিচ সহ নানা রকমের কৃষি পন্যের চাষ  করেন। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাত্র দুই মাস আগেই বর্ষার মৌসুমে ভারতের উজানের ঢলে যে তিস্তা নদী হয়ে উঠেছিল ভয়ংকর রাক্ষসী নদী, সেই নদী এখন তার বুক চিতিয়ে উজার করে দিয়েছে পলিমিশ্রিত বালুচর। আর সেখানেই  হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তাপারের কৃষকরা স্বপ্ন বুনছে তাদের বেঁচে থাকার জন্য। সবুজে সবুজে ছেয়ে গেছে তিস্তা নদীর  বালুচর।  সারাদিন  পরিশ্রম করে বালুমাটিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করে  যাচ্ছে কৃষকরা। 

এই মৌসুমে হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা নদীর  ১২টি চরে প্রায় ৪১৭৫ হেক্টর জমি রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ২৩৫০ হেক্টর জমিতে কৃষকরা  চাষ করছেন ভুট্টা, তামাক, গম,আলু, পেঁয়াজ, সরিষা, মিষ্টি কুমড়া, তরমুজ, মরিচসহ নানা রকমের কৃষি শস্য। 
তিস্তা নদীর চরের ব্র্যান্ডিং ফসল হচ্ছে ভুট্টা। তাই এই মৌসুমের মোট চাষের জমির অধিকাংশতেই প্রায় ১৭৯৮ হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে এই ভুট্টা। ধুবনি চরের কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন,এবার চরে ভুট্টা, গম, তামাক, আলু, পিয়াজ, রসুনসহ আরো অনেক ধরনের ফসল চাষ করা হয়েছে। আশা করছি এবার ফলন ভালো হবে। 

সিন্দুরণা চরের চাষী কোনা মিয়া বলেন, আমাদের এই চরে আমরা যা চাষ করি তাই ভালো চাষ হয়। এটা আল্লাহর নেয়ামত।এইবার চরে আমরা ভুট্টা, গম, তামাক, আলু, মরিচ, মিষ্টি কুমড়াসহ অনেক ধরনের ফসল ফলিয়েছি। কিন্তু আমরা কষ্ট করে  যা ফলাই সেটার ন্যায্য মূল্য আমরা পাইনা। সরকারের কাছে আবেদন আমরা যাতে আমাদের পণ্যের ন্যায্য মূল্যটা পাই। কৃষক গফুর মিয়া বলেন, যেহেতু চরের মাটি বেলে মাটি তাই এখানে ফসল চাষ করতে সারের প্রয়োজনটা অনেক বেশি হয়। সরকার যে দুই এক বস্তা সার দেয়, সেই সার দিয়ে আমাদের ফসল চাষ করা  সম্ভব না। খোলা বাজারে সারের দাম অনেক বেশি। বাধ্য হয়ে বেশি দাম দিয়েই সার কিনতে হচ্ছে।

ভুট্টাচাষী তারেক বলেন,ভুট্টা চাষের জন্য আমাদের কীটনাশক, ডিজেল  এবং সারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু গত বছরের তুলনায় এ বছর  কীটনাশক,ডিজেল  সারের দাম অনেক বেশি। সরকারের কাছে আবেদন কীটনাশক, ডিজেল,সারের দাম কমানো হোক যাতে করে আমরা কৃষকরা উপকৃত হই।
হলদিবাড়ি চরের  কৃষক  শরীফ বলেন, সারা বছরে শুধুমাত্র একবারই আমারা এই নদীর চরে  চাষ করার সুযোগ পাই। আমাদের চাষ করার জন্য অন্য কোন  জমি নেই।  আমরা খুব অভাবী মানুষ। চাষের জন্য পর্যাপ্ত টাকাও থাকে না।তাই বাধ্য হয়ে, দাদনের কাছে চড়া সুদে টাকা নিয়ে চাষ করতে হয়। সরকারের কাছে আবেদন আমাদের স্বল্প সুদে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা হোক।

উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নুর ইসলাম বলেন, কৃষি প্রকল্প থেকে সেচ সহায়তার জন্য মেশিন এবং পাইপ রয়েছে যা আগামী কয়েক  দিনের মধ্যে বিতরণ করা হবে। এছাড়াও চরের কৃষকদের জন্য কৃষি বিভাগ থেকে যে পরামর্শ আছে তা সব সময়  চলমান। 

ফাল্গুন, চৈত্র, বৈশাখ, এই সময়ের মধ্যেই কৃষকদের ফসল ঘরে তুলতেই হবে, কেননা বৈশাখের পর  আবার শুরু হবে ভারতের উজানের ঢল এবং বন্যা। তাই কৃষকরা বর্ষা শুরু হওয়র আগেই তাদের ফসল ঘরে উঠানোর জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। কেননা এই ফসলেই যে তাদের সারা বছরের বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা পাড়ের হাজার হাজার কৃষক দিনের পর দিন অপেক্ষায় এবং নতুন সরকারের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন, কখন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে? কখন এই অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি মিলবে? কখন তারা তাদের জমিতে সারা বছর ফসল চাষ করতে পারবে?