সততা ও সহমর্মিতায় রোজার সার্থকতা

বেহেশতি স্নিগ্ধতা নিয়ে প্রতিবছর আমাদের মধ্যে আগমন করে পবিত্র মাস রমজান। রোজাদারের প্রাত্যহিক আচরণে যখন সততা ও সহমর্মিতার প্রকাশ ঘটে, তখনই এই ইবাদতের আসল সার্থকতা ফুটে ওঠে। সম্পর্কের টানাপড়েন মিটিয়ে দেওয়া কিংবা পরের হক আদায়ে সচেতন হওয়া, সবই এই মাসের আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণের অংশ। তাকওয়ার নুর যখন হৃদয়ে প্রবেশ করে, তখন দুনিয়াবি লোভ-লালসা তুচ্ছ হয়ে যায়। পরকালে মুক্তির স্বাদ পেতে হলে এই এক মাসের আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে সারা বছর।

রোজা একই সঙ্গে আত্মশুদ্ধি ও শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করার উত্তম পদ্ধতি। এটা মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে যেমন সত্য, সামাজিক ও সামগ্রিক জীবনেও তেমন সত্য। কোরআনে বর্ণিত ‘যেন তোমরা আল্লাহভীরু হতে পারো’ বাক্য থেকে সিয়াম সাধনার উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়। এই উদ্দেশ্যের প্রতিফলন ঘটবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। সেটা হতে পারে লেনদেন, অধিকার, সম্পর্ক, আত্মীয়তা, আত্মীয়তার অধিকার, মুসলিম প্রতিবেশী, অমুসলিম প্রতিবেশী, ঘর ও পরিবারের ব্যাপারে।

মুমিনের কোনো কাজই আল্লাহর ভয় ও সন্তুষ্টির চিন্তা থেকে মুক্ত হবে না। আল্লাহভীতির মূল কথা হলো, আত্মিক পরিশুদ্ধি ও নৈতিক জীবনের জন্য ক্ষতিকর সব বিষয় থেকে নিজেকে দূরে রাখা। তাকওয়া অর্জনের উপকারিতা হলো, এতে পরকালীন জীবনের স্বাদ ও অনুগ্রহগুলোর মর্ম অনুধাবনের যোগ্যতা তৈরি হয়। এ জন্য হাদিসে রোজা ও রোজাদারের বহু মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ইমান ও প্রতিদানের আশায় রোজা রাখবে তার অতীতের সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।’ (সহিহ বুখারি ১৯০১)

আরও অনেক হাদিসে রোজাদারের সম্মান, মর্যাদা ও প্রতিদানের কথা বলা হয়েছে। যা অন্য কোনো আমলের ব্যাপারে আসেনি। এসব বর্ণনা থেকে আল্লাহর কাছে রোজাদারের মর্যাদার ধারণা পাওয়া যায়। রোজাদারের অনন্য মর্যাদার কারণে তাকে ইফতার করানোর বিশেষ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি হালাল উপার্জন থেকে রোজাদারকে ইফতার করায় তার কাছে প্রতি রাতে রহমতের ফেরেশতা প্রেরণ করা হয় এবং কদরের রাতে জিবরাইল (আ.) (কুদরতি উপায়ে) তার সঙ্গে মুসাফা করেন। জিবরাইল (আ.) মুসাফা করার একটি নিদর্শন হলো, তার অন্তর বিগলিত হবে এবং চোখে অশ্রু আসবে।

একটু ভেবে দেখুন, যে রোজাদারকে ইফতার করানো এত পুণ্যের কাজ, সেই রোজাদারকে আমরা কত কষ্ট দিই, তাদের গিবত করি, অধিকার নষ্ট করি। রোজাদারের জন্য বর্ণিত মর্যাদা ও সম্মান থেকে প্রমাণ হয় যে, রোজাদাররা আল্লাহর বিশেষ বান্দা। আর একজন বিশেষ বান্দার গিবত করলে, তার অধিকার হরণ করলে, গালমন্দ করলে, অন্তরে কষ্ট দিলে আল্লাহ কি অসন্তুষ্ট হবেন না? এসব বিষয় চিন্তা-ভাবনা করি না বলেই রোজা মানুষের জীবনে যেসব পরিবর্তন আনার কথা, সেসব পরিবর্তন আসে না।

অন্যের অধিকার হরণ, অন্যের ক্ষতি করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং সন্তানদের দ্বীনি অধিকারগুলো আদায় করার ব্যাপারে আমরা একেবারেই উদাসীন। এর অর্থ হলো, রোজার মূল উদ্দেশ্য আল্লাহভীতি অর্জনের কোনো চিন্তা ও চেষ্টা আমাদের নেই। রমজানে শুধু সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অনাহারে থেকে এবং তারাবির নামাজ আদায় করে অন্য সব বিষয় থেকে যেভাবে উদাসীন হয়ে যাই তা খুবই ভয়ের। আল্লাহতায়ালা অনুগ্রহ করে আমাদের রোজার মতো নেয়ামত দান করেছেন। এর উদ্দেশ্যও বলে দিয়েছেন। আর আমরা উদ্দেশ্য ভুলে কেবল অনাহারে দিন কাটিয়ে এবং সামান্য কিছু ইবাদত করে আত্মতৃপ্তিতে ভুগছি। এ কারণেই পবিত্র রমজানের বরকতের ছায়া আমাদের জীবনে পড়ে না।

এমন যেন না হয় যে, সারা মাস রোজা রাখার পর যখন রমজান বিদায় নেবে তখন অনুভূতি হবে আমরা শেকল থেকে মুক্ত হলাম, সুতরাং এখন আর জায়েজ-নাজায়েজ এবং হালাল-হারামের পার্থক্য করার প্রয়োজন নেই। এসব চিন্তা না করে এমনভাবে রমজান কাটাব যেন রমজানের পরও পবিত্র মাসের বরকত আমাদের ও আমাদের পরিবারের ওপর অব্যাহত থাকে, বিশেষ করে এই যুগে বহু মানুষ উপার্জনে হালাল-হারামের পার্থক্য করে না। অথচ হারাম উপার্জন এমন বিষ, যা সব নেককাজের বরকত নষ্ট করে দেয়।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ মুসলিম কাউন্সিল