১১ হাজার কোটি টাকা পাচার

আসিফের বিরুদ্ধে অভিযোগের খোঁজ নেবে দুদক

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৯ এএম

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের নতুন অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তার বিরুদ্ধে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ, এলজিইডির প্রকৌশলী নিয়োগ, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ও দরপত্রের কমিশন এবং জেলা প্রশাসক পদায়নসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে এসব অর্থ হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচারের অভিযোগ ওঠে। নতুন অভিযোগগুলোকে তার বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করে অনুসন্ধান করা হবে। দুদকের জনসংযোগ শাখার সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন।

তানজির আহমেদ বলেন, ‘উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ, ডিসি পদায়ন, বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ নেওয়ার  অভিযোগ রয়েছে আসিফের বিরুদ্ধে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সেতু নির্মাণ, সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার ও শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।’

তানজির বলেন, ‘বিদেশে বিপুল অর্থ পাচার করে পর্তুগাল, দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইস ব্যাংকে সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে। আসিফের বাবা, এপিএস ও পিওর বিরুদ্ধেও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এসেছে। আসিফের বিরুদ্ধে আগে থেকেই একটি অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। নতুন অভিযোগটি চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে খতিয়ে দেখা হবে।’

দুদকের কাছে যাওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফের বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সারা দেশে ৩৬ জন ডিসিকে পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়ার  অভিযোগ আছে। এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে টেন্ডার বাণিজ্যে আসিফের সম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডারেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া আসিফের নিজ উপজেলা কুমিল্লার মুরাদনগরের জন্য গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়টি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিকভাবে ব্যয় বাড়ানো এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে কোটি কোটি টাকা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ, এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগ দিয়ে ৫২ কোটি টাকা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগ দিয়ে ৬৫ কোটি টাকা এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে ৬০ কোটি টাকা নিয়েছেন আসিফ। তিনি এই চার পদে নিয়োগ দিয়ে ১৮৭ কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে, হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের অভিযোগও করা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা আসিফের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া আসিফ হোটেল ওয়েস্টিনসহ পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে থাকা ও দামি গাড়িতে চলাফেরা করতেন।

চার দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ : অভিযোগে বলা হয়েছে, দুর্নীতির অর্থ দিয়ে পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। সবমিলিয়ে তার চার দেশে পাচারের পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া তার দুই বোনজামাই ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও রয়েছে।

আসিফের বাবা বিল্লাল হোসেন ও এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে। পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষ দেওয়ায় তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ এখনো অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে বলে দুদক জানায়।

গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। অন্য তিনজন হলেন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, সাবেক যুগ্মসচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন ও উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ।

দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি দল ওই অনুসন্ধান করছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আসিফের দায়িত্বকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট নথিও চেয়েছে দুদক।

অনুসন্ধান চলাকালে গত ৯ সেপ্টেম্বর দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান বলেন, ‘আসিফের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ে আমলযোগ্য বিবেচিত হওয়ায় অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলার সুযোগ নেই।’

অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আসিফ : দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান চলাকালে গত ৯ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে আসিফ তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দুদকের অনুসন্ধানকে মিডিয়া ট্রায়াল ও রাজনৈতিকভাবে হয়রানির অংশ বলেন। তিনি পদোন্নতি-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে বলেন, ১৩৫ সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির আদেশ হয়েছিল ২০২৬ সালের ১১ মে। তখন তিনি আর সরকারের দায়িত্বে ছিলেন না। ৩৮ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিলের অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার দাবি, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রায় কার্যকর করতে ১১২ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করা হয়েছিল।

দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলামের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে তাকে আইনি নোটিসও পাঠান আসিফ।

আসিফ মাহমুদ ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। পরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পান। ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যোগ দিয়ে দলটির মুখপাত্র হন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত