হজযাত্রী-প্রবাসীরা চরম আতঙ্কে

চোখেমুখে আতঙ্কের চাপ। এদিক-সেদিক তাকাচ্ছেন কখন আসবে সুখবর। বন্ধ হবে যুদ্ধের দামামা। কথাও বলতে পারছেন না। শুধু বিমানকর্তাদের নরম সুরে বলছেন ‘স্যার কখন বিমান ছাড়বে?’ না শব্দ শোনার পর হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন চাঁদপুরের আবদুর রাজ্জাক। সাত বছর পর যাচ্ছেন গ্রামের বাড়িতে। অজানার শঙ্কায় আছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। একই কথা বলেছেন ওমরাহ করতে আসা রহিমা বেগম। তিনি জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে তাদের ফ্লাইট ছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে ফ্লাইট বাতিল হয়ে গেছে। শুধু ভয় লাগছে, যেখানে আছেন সেখানেই বোমা মারবে কি না। দেশে ফিরিয়ে নিতে আকুল আকুতি জানান তিনি। এ দুজনের মতোই সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশি শ্রমিক ও হজ করতে আসা নারী-পুরুষরা আছেন চরম আতঙ্কের মধ্যে।

দেখা গেছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হলে হঠাৎ করেই আকাশপথে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশেও বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ বন্ধ থাকে। এতে বিপাকে পড়েন হজযাত্রী ও শ্রমিকরা। এ অবকাশে জেদ্দা, মক্কা ও মদিনায় হোটেল ভাড়া বেড়ে যায় কয়েকগুণ। হোটেল মালিকরা ‘অমাবস্যার’ চাঁদ পেয়ে বসেন। তবে এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে। তাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে হোটেলে রাখা ও খাবারের দায়িত্ব নিলেও অনেক যাত্রী নিজস্বভাবে চড়ামূল্যে হোটেল ভাড়া করে আছেন। ছয় হাজারের মতো যাত্রী আটকা পড়েছেন। অনেকেই রাত জেগে পার করছেন। সীমিত পর্যায়ে ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছে গতকাল থেকে। তারপরও আতঙ্কের মধ্যেই আছেন মানুষ।

দেখা গেছে, ওমরাহ পালন এবং কর্মস্থলে ফেরার স্বপ্নে বিভোর বাংলাদেশিরা সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছেন। ফ্লাইট বিপর্যয়, হোটেলের সংকটের কারণে যাত্রীরা দিশেহারা। গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৪টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। মক্কা-মদিনার হোটেল লবি থেকে শুরু করে বিমানবন্দরের মেঝেতে রাত কাটছে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের। তাদের বুকফাটা আর্তনাদ হাহাকার চলছে। অনেক হজযাত্রী তাদের সর্বস্ব দিয়ে ওমরাহ পালন করতে এসেছিলেন। কিন্তু ফেরার সময় নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় তারা এখন আক্ষরিক অর্থেই পথে বসা। বিশেষ করে বৃদ্ধ ও অসুস্থ যাত্রীদের আহাজারিতে মক্কার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। অনেক প্রবাসী শ্রমিক তাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার শঙ্কায় কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। একজনের আকুতি ছিল এমন ‘বাবা, পকেটে টাকা নেই, থাকার জায়গা নেই। আমরা কি আর দেশে ফিরতে পারব না?’

মক্কা-মদিনায় আটকা ৬ হাজার যাত্রী : বেসরকারি ও সরকারি বিভিন্ন সূত্রমতে, ফ্লাইট শিডিউল ভেঙে পড়ায় অন্তত ৬ হাজার যাত্রী মক্কা ও মদিনার বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়েছেন। এর বড় একটি অংশ ওমরাহ যাত্রী এবং বাকিরা ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরতে যাওয়া প্রবাসী শ্রমিক। জেদ্দা ও মদিনা বিমানবন্দরে যাওয়ার পর জানা যাচ্ছে ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য বিলম্বিত, ফলে পুনরায় তাদের শহরে ফিরে আসতে হচ্ছে। সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে তিলধারণের জায়গা নেই। বিমানবন্দরের প্রতিটি কোণ এখন ক্লান্ত-বিপর্যস্ত যাত্রীদের দখলে। অন্যদিকে, মক্কা ও মদিনার হোটেলগুলোর লবিতে শত শত যাত্রী তাদের ব্যাগ নিয়ে বসে আছেন। তপ্ত রোদে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অনেক যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে টয়লেট ব্যবহার এবং সুপেয় পানির সংকটে নারী ও শিশুদের অবস্থা শোচনীয়।

সুযোগ নিচ্ছেন হোটেল মালিকরা, ভাড়া আকাশচুম্বী : মানবিক সংকট পুঁজি করে একশ্রেণির অসাধু হোটেল মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগী মেতে উঠেছে পকেট কাটার উৎসবে। স্বাভাবিক সময়ে যে রুমের ভাড়া ছিল ২০০-৩০০ রিয়াল, এখন তা ৭০০ থেকে ১০০০ রিয়াল ছাড়িয়ে গেছে। অনেক হোটেল মালিক আগের বুকিং বাতিল করে বেশি টাকার বিনিময়ে নতুন যাত্রী তুলছেন। ফলে নিরুপায় হয়ে অনেক যাত্রী রাস্তার পাশে বা মসজিদের বারান্দায় রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।

রাত জেগে পার করছেন হাজারো মানুষ : আটকাপড়া যাত্রীদের জন্য রাত হয়ে উঠেছে বিভীষিকার নাম। থাকার জায়গা না পেয়ে হাজার হাজার বাংলাদেশি যাত্রী রাত পার করছেন। মক্কা, রিয়াদ, দাম্মাম, আভা, জাজান, মদিনা, বুরাইদহ, হেজাজ, তাবুক, হাইল, নাজরান, সাকাকা, আল-বাহা, আরআর এলাকায় বাংলাদেশের শ্রমিকরা কাজ করছেন সবচেয়ে বেশি। সেই অনুসারে জেদ্দার আল-বালাদ, আল-আজওয়াদ, রিমান, আল-খুমরাহ, আল-সাফা, আল-মারওয়াহ, আল-মোহাম্মাদিয়াহ, আল-নাহদা, কিলো এলাকা, দাহাবান এলাকায় হোটেলের সংখ্যাও বেশি। ফ্লাইট বন্ধ থাকায় হোটেল মালিকদের কদরও বেড়ে গেছে। তবে বিমানের কর্মকর্তারা বলছেন, যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।

যেসব ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে : নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে শনিবার বিকেল থেকে ১ মার্চ সকাল পর্যন্ত ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী ৫৪টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য এমিরেটস এয়ারলাইনসের (সংযুক্ত আরব আমিরাত) ১টি, গালফ এয়ারের (বাহরাইন) ১টি, ফ্লাইদুবাইয়ের (সংযুক্ত আরব আমিরাত) ১টি, এয়ার অ্যারাবিয়ার (সংযুক্ত আরব আমিরাত) ৩টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের (বাংলাদেশ) ৬টি, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের (বাংলাদেশ) ১১টি, জাজিরা এয়ারওয়েজের (কুয়েত) ২টি, এমিরেটস এয়ারলাইনসের (সংযুক্ত আরব আমিরাত) ৫টি, গালফ এয়ারের (বাহরাইন) ২টি, ফ্লাইদুবাই (সংযুক্ত আরব আমিরাত) ৪টি, কাতার এয়ারওয়েজের (কাতার) ২টি, সালামএয়ারের (ওমান) ২টি, এয়ার অ্যারাবিয়ার (সংযুক্ত আরব আমিরাত) ৮টি, কুয়েত এয়ারওয়েজের (কুয়েত) ২টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের (বাংলাদেশ) ৪টি, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের (বাংলাদেশ) ৯টি, কাতার এয়ারওয়েজের (কাতার) ৪টি, এমিরেটস এয়ারলাইনসের (সংযুক্ত আরব আমিরাত) ৫টি ও গালফ এয়ারের (বাহরাইন) ২টি।

আবাসন, খাবার ও স্বাস্থ্যসেবা সংকট : বিমানের এক কর্মকর্তা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া আকস্মিক সামরিক সংঘাতের জেরে মক্কা ও মদিনায় ওমরাহ পালন করতে যাওয়া কয়েক হাজার বাংলাদেশি যাত্রী আটকা পড়েছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে ইরান, ইরাক, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ছয়টি দেশ তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়ায় এ নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওমরাহযাত্রীরা এখন আবাসন, খাবার এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সংকটে দিনাতিপাত করছেন। অনেক যাত্রী হোটেল থেকে চেক-আউট করার পর নতুন করে থাকার জায়গা না পেয়ে হোটেল লবি বা করিডরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত সমাধান করতে।

ঢাকাগামী সব ফ্লাইট স্থগিত : ঢাকাগামী ইউএস-বাংলা, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং সৌদি এয়ারলাইনসের নিয়মিত ফ্লাইটগুলো স্থগিত হওয়ায় এ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইউএস-বাংলার যে ফ্লাইটটি রবিবার ঢাকা থেকে সৌদি আরবে যাওয়ার কথা ছিল, সেটি ঢাকা ত্যাগ করতে না পারায় ফিরতি যাত্রীদের নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। ওমরাহ পালন শেষে দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের অনেকেই সঙ্গে থাকা নগদ অর্থ শেষ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন।

শিশু-বৃদ্ধদের অবস্থা শোচনীয় : শিশু এবং বৃদ্ধদের নিয়ে আসা পরিবারগুলোর অবস্থা আরও শোচনীয়; অনেকেরই নিয়মিত সেবনের ওষুধ ফুরিয়ে এসেছে কিন্তু স্থানীয়ভাবে তা সংগ্রহের উপায় পাচ্ছেন না। মক্কা থেকে মো. জাকির হোসেন নামে এক যাত্রী জানিয়েছেন, তাদের ৩০ জনের একটি দল বর্তমানে খোলা জায়গায় অবস্থান করছে এবং ফ্লাইটের কোনো নিশ্চিত তথ্য পাচ্ছে না।

বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন : মানবিক সংকটে সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে। জরুরি ভিত্তিতে আটকেপড়া যাত্রীদের ভিসার মেয়াদের জটিলতা নিরসন, অস্থায়ী আবাসন এবং খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য দূতাবাসের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকেই। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিশ্চিত না হওয়ায় এ অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এই মুহূর্তে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ বা উদ্ধারকারী ফ্লাইটের ব্যবস্থা না করা হলে কয়েক হাজার বাংলাদেশির দুর্ভোগ চরমে পৌঁছাতে পারে।