নেই বিক্রি, চিরচেনা কোলাহলও নেই

অমর একুশে বইমেলার চতুর্থ দিনেও গতকাল রবিবার মেলা প্রাঙ্গণে প্রত্যাশিত জনসমাগম দেখা যায়নি। বিকেল গড়ালেও স্টলগুলোর সামনে সেই চেনা কোলাহল নেই, নেই বই হাতে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য। যারা আসছেন, তাদের অনেকেই কিছুক্ষণ ঘুরে, বই হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে ছবি তুলে আবার রেখে দিচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত খুব কমসংখ্যক দর্শনার্থীকেই বই কিনতে দেখা গেছে। ফলে প্রকাশকদের মুখে হাসির বদলে দেখা গেছে চাপা হতাশা।

গতকাল ছিল অমর একুশে বইমেলার চতুর্থ দিন। দুপুর ২টায় মেলা শুরু হলেও প্রথম কয়েক ঘণ্টা ছিল বেশ ফাঁকা। সন্ধ্যার দিকে কিছুটা দর্শনার্থী বাড়লেও তা প্রত্যাশার তুলনায় কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ স্টলেই বিক্রয়কর্মীরা বসে আছেন ক্রেতার অপেক্ষায়। মাঝেমধ্যে দু-একজন এসে বই দেখছেন, দাম জিজ্ঞেস করছেন, তারপর চলে যাচ্ছেন।

স্টলকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যারা আসছেন তাদের বড় একটি অংশই মূলত ঘুরতে বা ছবি তুলতে আসছেন। বই হাতে নিয়ে ছবি তোলা, স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ভিডিও করা- এসব দৃশ্য চোখে পড়েছে বেশি। কিন্তু বিক্রি হচ্ছে না।

অনিন্দ্য প্রকাশনার এক বিক্রয়কর্মী বলেন, এখন যারা আসছেন তাদের বই কেনার আগ্রহ কম। অনেকে বই দেখেন, ছবি তোলেন, তারপর রেখে চলে যান। দিনের শেষে বিক্রির হিসাব খুব একটা ভালো না।

আদর্শ প্রকাশনীর স্টলকর্মী জানান, গত বছরের তুলনায় এবার শুরুটা অনেক ধীর। গত বছর এই সময় দাঁড়িয়ে কথা বলার ফুরসত ছিল না। এবার বেশিরভাগ সময় বসেই কাটছে। তার মতে, রমজান মাস, মানুষের অর্থনৈতিক চাপ এবং অনলাইনে বই কেনার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় এমনটা হয়েছে।

মেলায় আসা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সাব্বির হাসান বলেন, মেলায় আসাটা একটা অভ্যাসের মতো। কিন্তু এবার বাজেট সীমিত। একটা বই কিনেছি, বাকিগুলো পরে টাকা হাতে এলে কিনব।

আরেক দর্শনার্থী তাসলিমা জানান, আজ মূলত ঘুরতে এসেছি। ছবি তুলছি, পরিবেশটা উপভোগ করছি। পরে আবারও আসব, সময় নিয়ে বই কিনব।

ঢাকা কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, কয়েকটা বই ভালো লেগেছে, কিন্তু দাম একটু বেশি মনে হয়েছে। পরে এসে কিনব। আজকে ঘুরতে এসেছি।

প্রকাশকদের কেউ কেউ পরিস্থিতিকে সাময়িক বলে মনে করছেন। তাদের মতে, মেলার শুরুতে এমনটা হতেই পারে। তাছাড়া, রমজান মাস চলছে। ছুটির দিনগুলোতে বিক্রি বাড়তে পারে বলে আশা করছেন তারা। তবে চতুর্থ দিনে যে চিত্র দেখা গেছে, তাতে প্রত্যাশিত পাঠকের উপস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।

মেলায় নতুন বইও এসেছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়। তবু স্টলগুলোর সামনে সেই বই ঘিরে আগ্রহ তুলনামূলক কম। অনেক প্রকাশকের মতে, দর্শনার্থীর সংখ্যা যেমন সীমিত, তেমনি ক্রয়ক্ষমতার দিক থেকেও চাপ রয়েছে। ফলে মেলায় বই বিক্রি এখনো পুরোপুরি গতি পায়নি।

সব মিলিয়ে চতুর্থ দিনের বইমেলায় উৎসবের আমেজ থাকলেও ক্রেতার উপস্থিতি কম এবং যারা আসছেন, তাদের অনেকেই বই না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন। প্রকাশকদের প্রত্যাশা, সামনে দিনগুলোতে প্রকৃত পাঠকের উপস্থিতি বাড়বে এবং মেলার আসল চেহারা ফিরে আসবে।

চতুর্থ দিনে নতুন বই এসেছে ৪২টি : রবিবার মেলার চতুর্থ দিনে মোট নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে ৪২টি। এ নিয়ে সর্বমোট প্রকাশিত বই সংখ্যা ৯৬টি।

বিকেল ৩টায় ব মূলমঞ্চে স্মরণ অনুষ্ঠান : গতকাল হামিদুজ্জামান খান শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নাসিমুল খবির। আলোচনায় অংশ নেন আইভি জামান। সভাপতিত্ব করেন লালারুখ সেলিম।

নাসিমুল খবির বলেন, হামিদুজ্জামান খান ভাস্কর্য নির্মাণে পরিণত-পর্বে ধাতব উপকরণের বাইরেও নানা উপকরণ ব্যবহার করে ভাস্কর্য নির্মাণ করেছেন। বিন্যাসের প্রয়োজনে কখনো কখনো কাঠ, পাথর, প্লাস্টিক, কঁাঁচ, কংক্রিট ইত্যাদি নানাবিধ উপকরণ ব্যবহার করেছেন। নির্মাণ-সংখ্যা, উপকরণ ও গড়নের বৈচিত্র্য এবং উপস্থাপনায় অভিনবত্বে তার নির্মাণ সবসময় ও ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে ও থাকবে।

লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন এবিএম সোহেল রশিদ।

বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন কবি ইউসুফ রেজা। আবৃত্তি পরিবেশন করেন, ফারহানা পারভীন তৃণা। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী আজগর আলীম, আবু বকর সিদ্দিক, নারায়ণ চন্দ্র শীল এবং সামীমা সুলতানা।

আজকের সময়সূচি : আজ সোমবার মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে হবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে সার্ধশত জন্মবর্ষ : শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন হামীম কামরুল হক। আলোচনায় অংশ নেবেন পারভেজ হোসেন। সভাপতিত্ব করবেন সফিকুন্নবী সামাদী। বিকেল ৪টায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।