নিরাপদ খাদ্যে সুস্থ প্রজন্ম

জনস্বাস্থ্যে বড় উদ্বেগের নাম হচ্ছে, অনিরাপদ খাদ্য। প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য যা কিছু গ্রহণ করছি, সব কিছুতে ভেজালের কারণে অদৃশ্য বিষ মেশানো। একটি ভেজালমুক্ত দেশ গড়ার স্বপ্ন কেবল আবেগ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের মানুষের টিকে থাকার লড়াই। খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার পদ্ধতিগুলো বর্তমানে এতটাই আধুনিক ও ভয়াবহ যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মাছ ও সবজি তাজা রাখতে ফরমালিন এবং কাপড়ের রঙ ব্যবহারের কথা আমরা জানি।  কিন্তু চাল উজ্জ্বল করতে ক্ষতিকর পলিশিং, দুধে ভাতের মাড় ও ডিটারজেন্ট মেশানো কিংবা মসলায় ইটের গুঁড়া ও সীসা মেশানোর মতো লোমহর্ষক তথ্য নিয়মিত সামনে আসছে। ফলের বাজারে কৃত্রিমভাবে ফল পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড ও ইথালিন ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সরাসরি মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর আঘাত হানে। এমনকি শিশুখাদ্য এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধও ভেজাল ও নকলে ছেয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে, কাশির সিরাপ বা নিম্নমানের স্যালাইন ব্যবহারের ফলে মৃত্যুর যে খবরগুলো সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। নকল ও ভেজাল ওষুধের এই মরণঘাতী ছোবল রোধ করতে না পারলে, চিকিৎসার সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না।

ভেজাল রোধে আমাদের দেশে আইনের অভাব নেই। কিন্তু প্রচ- আন্তরিকতার অভাব রয়েছে, আইনের সঠিক প্রয়োগ ও সচেতনতায়। মূলত তিনটি প্রধান আইনের মাধ্যমে এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়। প্রথমত, নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩, যার অধীনে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়েছে। এই আইনের ৪১ ও ৪২ ধারায় পরিষ্কার বলা আছে যে, মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক বা বিষাক্ত দ্রব্য মেশালে অপরাধীকে ৫ বছরের কারাদণ্ড অথবা ১০ লাখ টাকা জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯, যা সাধারণ নাগরিকদের সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা দিয়েছে। এই আইনের ৭৬ (৪) ধারা অনুযায়ী, কোনো ভোক্তা যদি ভেজালের প্রমাণসহ অভিযোগ করেন এবং অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবে আদায়কৃত জরিমানার ২৫ শতাংশ ওই অভিযোগকারী ভোক্তা পুরস্কার হিসেবে সরাসরি সরকারের পক্ষ থেকে পান। তৃতীয়ত, বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪, যা এই অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে। সরকার চালের বাজারে কারসাজি ও ভেজাল রোধে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। এখন থেকে চালের প্রতিটি বস্তার গায়ে ধান কাটার সময়, জাত এবং মোড়কজাত করার তারিখ লেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে ভোক্তারা জানতে পারবেন, তারা কতদিনের পুরনো বা কোন জাতের চাল কিনছেন এবং কৃত্রিমভাবে পলিশিং করা চালের কারসাজি বন্ধ হবে। তবে শুধু আইন দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।  ব্যবসায়ীদের নৈতিক পরিবর্তনেরও প্রয়োজন আছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য খাদ্য সুরক্ষা বিষয়ক সরকারি ও বেসরকারি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি, যাতে তারা বুঝতে পারেন যে তাদের অসততা একটি পুরো জাতির জনস্বাস্থ্যকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। 

আমাদের সমাজে ধর্মীয় ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি একটি বড় ভূমিকা পালন করে। ইসলামসহ সব ধর্মে ওজনে কম দেওয়া বা খাদ্যে ভেজাল দেওয়াকে কঠিন পাপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে যদি নিয়মিত খাদ্যে ভেজালের কুফল সম্পর্কে আলোচনা করা হয়, তবে মানুষের মধ্যে নৈতিক বোধ জাগ্রত হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানে অনস্বীকার্য। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও টিভি চ্যানেলগুলোর বিশেষ অভিযানের খবরগুলো অসাধু ব্যবসায়ীদের মনে ভয় ধরিয়ে দেয় এবং সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলে। প্রতি বছর ১০ থেকে ১৫ হাজার বাজার তদারকি অভিযান পরিচালনা করা হয় এবং বড় বড় শহরগুলোতে নামি-দামি রেস্টুরেন্ট বা সুপার শপগুলোকে কোটি কোটি টাকা জরিমানা করা হচ্ছে, তবুও সচেতনতা ছাড়া এর স্থায়ী সমাধান কঠিন। ভোক্তা হিসেবে আমাদের কিছু দায়িত্ব আছে। বাজারে গিয়ে পণ্য কেনার সময় সচেতন হতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে ঘরোয়া উপায়েও ভেজাল শনাক্ত করা সম্ভব। যেমন, পানিতে কয়েক ফোঁটা আয়োডিন দিয়ে দুধ পরীক্ষা করা বা ফল-সবজি খাওয়ার আগে লবণ পানিতে ভিজিয়ে রাখা। এছাড়াও যে কোনো পণ্য কিনে প্রতারিত হলে, সরাসরি জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হটলাইন নম্বর ১৬১২১-এ কল করে অভিযোগ জানানো আমাদের নাগরিক কর্তব্য। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ভোক্তা অধিকারের অ্যাপ ব্যবহার করেও দ্রুত প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।

 দেশের বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আমরা আসলে এক ধরনের সেøা পয়জনিং বা ধীরগতির বিষক্রিয়ার শিকার হচ্ছি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিশিষ্ট ক্যানসার বিশেষজ্ঞের মতে, বর্তমানে হাসপাতালে কিডনি বিকল এবং অল্প বয়সেই ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার যে হার দেখা যাচ্ছে, তার প্রধান উৎস ‘দূষিত খাবার’। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার লোভের কাছে মানুষের জীবনের মূল্য তুচ্ছ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে কেবল আইন দিয়ে নয়, এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে সামাজিক বয়কট এবং পাড়া-মহল্লায় নজরদারি বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মতো খামার থেকে খাবার টেবিল পর্যন্ত তদারকি বা ‘ফার্ম টু টেবিল’ মডেল, আমাদের দেশেও এখন সময়ের দাবি। ভেজালমুক্ত দেশ গড়ে তোলা একজন মানুষের কাজ নয়। নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার। আইনের কঠোর প্রয়োগ, প্রশাসনের সক্রিয়তা, ব্যবসায়ীদের নৈতিক উন্নয়ন এবং তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের সচেতনতাই পারে খাদ্য থেকে বিষ দূর করতে। আজ আমরা যদি রুখে না দাঁড়াই, তবে আগামী প্রজন্মকে একটি অসুস্থ ও পঙ্গু ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে। যে দায় থেকে কেউই রেহাই পাব না। ফলে দল-মত নির্বিশেষে, পাড়া-মহল্লায় নিজস্ব উদ্যোগে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমাদের স্বাস্থ্য আমাদেরই সুস্থ রাখতে হবে। এই ধরনের অসাধু এবং লোভী ব্যবসায়ী চক্র ভেঙে ফেলা জনগণেরই দায়িত্ব। যদি আমরা সচেতনভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে, ভেজাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি তাহলে এই চক্র ভেঙে ফেলা সম্ভব। এক্ষেত্রে সরকার এবং রাজনৈতিক সহযোগিতা জরুরি।

লেখক : সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী

m.s.azamchy@gmail.com