ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে যখন জনমনে চাপ-শঙ্কা-উৎকণ্ঠার পারদ ঊর্ধ্বমুখী, তখন সমান্তরালে মিলেছে দুটি সুবার্তা। ১৩ সেপ্টেম্বর দেশ রূপান্তরে বলা হয়েছে, ১২ সেপ্টেম্বর সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তিন মাসব্যাপী ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সারা দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানো, এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং সরকারি-বেসরকারি ও সামাজিক উদ্যোগকে সমন্বিত করার লক্ষ্যে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। দেশের তরুণ সমাজকে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে দেশ থেকে অন্তত ৮০ শতাংশ ডেঙ্গু সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। আমরা প্রধানমন্ত্রীর সময়োপযোগী পদক্ষেপের জন্য সাধুবাদ জানাই। একই সঙ্গে তরুণদের নিয়ে তিনি যে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন আমরা এরও সাধুবাদ জানাই।
অন্যদিকে এডিস মশার বংশবিস্তার ঠেকানোর একটি বিশেষ ফাঁদ তৈরি করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার। ‘ডেন-এক্স-ট্র্যাপ’ নামের এই ফাঁদে স্ত্রী এডিস মশাকে ডিম পাড়ার উপযোগী পরিবেশে আকৃষ্ট করা হয়। গবেষকদের দাবি, ফাঁদে ডিম পাড়ার পর মশাটি মারা যায় এবং ওই ডিম থেকেও পরবর্তী প্রজন্মের মশার জন্ম রোধ করা সম্ভব। অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশনের (আইআরইএস) গবেষক দল প্রায় ৫ বছরের গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ফাঁদটি তৈরি করেছেন। এডিস মশার আচরণ ও ডিম পাড়ার প্রবণতাকে কাজে লাগিয়েই তৈরি করা হয়েছে এর পরিবেশ। জনস্বাস্থ্যোর সংকট মোকাবিলা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এই উদ্ভাবনের জন্য তাদের আমরা অভিনন্দিত করি। তাদের এই অর্জন জনকল্যাণের নিরিখে অপরিমাপের। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গবেষক ও উদ্যোক্তাদের পাশে থাকবে সরকার।
বিদ্যমান পরিস্থিতি সাক্ষ্য দেয়, ডেঙ্গু প্রতিরোধে অতীতে যত কথা হয়েছে কাজের কাজ হয়নি এর কিয়দংশও। একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও মশক নিয়ন্ত্রণে গত ৯ বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন প্রায় ৭০৭ কোটি টাকা খরচ করেছে। মশক নিয়ন্ত্রণে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কাক্সিক্ষত সুফল মেলেনি। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যসেবা বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দিয়েছে ১২১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় সাড়ে তিনগুণ বেশি। এত খরচের কত অংশ প্রকৃতপক্ষে কাজের কাজে লেগেছে আর মহল বিশেষের ভোগে কত লেগেছে এই প্রশ্নটি ইতিমধ্যে বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছে। আমরা আশা করতে চাই, দেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বিপুল জনরায়ে গঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করে কল্যাণের পথ সুগম করতে সক্ষম হবে। আমরা দেখেছি পতিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ও বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলো জনসাস্থ্যের সুরক্ষা ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার নজির স্থাপন করে গেছে।
করোনা দুর্যোগে এ খাতের অসাধুদের কদাচার-দুরাচারের দীর্ঘ খতিয়ানের যথাযথ প্রতিবিধানেও নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতি লক্ষ করা গেছে। আমরা আশা করছি, বর্তমান সরকার এসব বিষয়ে বিন্দুমাত্র অনুকম্পা দেখাবে না। একই সঙ্গে গবেষণালব্ধ মশক নিধন পদ্ধতির প্রক্রিয়াগত বাস্তবায়নে সহযোগিতার হাত প্রসারিত রাখবে। সারা দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান সফল করার লক্ষ্যে জনসম্পৃক্ততা বাড়িয়ে দায়িত্বশীল মহলগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আমরা মনে করি, যূথবদ্ধভাবে কাজ করলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব। দেশ যাতে আরও ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে এ জন্য জনসচেতনতাও সমগুরুত্বপূর্ণ। আমরা ডেঙ্গু চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ কমানোর আহ্বান জানাই। যেহেতু প্রায় সারা দেশেই ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে সেহেতু চিকিৎসাসেবার পরিসরও বাড়ানো প্রয়োজন। ডেঙ্গু রোধে শুধু মৌসুমভিত্তিক কার্যক্রম নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া বাঞ্ছনীয়। ডেঙ্গু যেমন একদিকে প্রাণহানি ঘটাচ্ছে অন্যদিকে বাড়াচ্ছে আর্থিক ক্ষতি এবং এর পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক সংকটও প্রকট হচ্ছে। আমরা আরও মনে করি, সবার আগে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় সমন্বয়হীনতা ঘোচানো জরুরি। করোনা-বাণিজ্যের সেই প্রেক্ষাপট যাতে কোনোভাবেই সৃষ্টি হতে না পারে এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সজাগ-সতর্ক থাকতে হবে।