দেশ এখন অনেকটাই রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল বা শান্ত পরিবেশে রয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা বা প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া অর্থনৈতিক দৈন্যের কী হবে? রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া দেশের অর্থনীতিকে কখনোই ধ্বংসস্তূপ থেকে তুলে আনা সম্ভব নয়। সরকার গঠনের পর পরিবহন খাতে চাঁদা বা কল্যাণ তহবিলের নামে অর্থ আদায় এবং একটি শব্দকে কেন্দ্র করে যে জলঘোলা করা হচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে চিন্তার বিষয়। কারণ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে, বিনিয়োগ বাড়বে না এবং অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। তাই বর্তমান সরকারের জন্য অন্যতম দুটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দেশের অর্থনীতিকে সুসংগঠিত ও কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করা। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয়েছে, নতুন ও পুরাতনের সংমিশ্রণে, যেখানে নবীন ও প্রবীণদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করে অর্থনীতিকে গতিশীল করা। কিন্তু বর্তমান সরকার কি প্রকৃত অর্থে দেশের মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে মুক্তি দিতে পারবে? বর্তমান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, অর্থনীতির গতি সচল করা। কারণ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেশে প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে এবং ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে দেশের বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
তৎকালীন সরকার বাধ্য হয়ে আমদানি বাণিজ্যে ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে। ফলে বেসামাল মূল্যস্ফীতি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মূল্যস্ফীতি নিয়ে সাধারণ মানুষও অস্থির হয়ে পড়ে, কারণ মানুষের আয়ের সঙ্গে সংগতি না রেখে দ্রব্যমূল্য দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় জুলাই অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী যে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়, সেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করে। সেই সময় আওয়ামী লীগ সরকার পালাতে বাধ্য হয়। পরে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। কিন্তু সেই সরকারও অর্থনীতির গতি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অর্থনৈতিক বিচার-বিশ্লেষণের চেয়ে, বর্তমান সরকারের প্রতি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা বেশি হওয়ায় চ্যালেঞ্জটাও তাদের অনেক বেশি। বর্তমান সরকারের সর্বপ্রথম চ্যালেঞ্জ হলো, দারিদ্র্য নিরসন। যদিও বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণের কথা বলেছে। কার্ড বিতরণের মাধ্যমে দারিদ্র্য নিরসন একটি স্থিতিশীল অবস্থায় ধরে রাখা যেতে পারে। তবে এসব উদ্যোগ দারিদ্র্য নিরসনে কতটুকু সফল ভূমিকা পালন করবে, তা দেখার বিষয়। দারিদ্র্য চিরতরে নির্মূল করতে হলে, অবশ্যই নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে বা বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পেলে, কখনোই দারিদ্র্য স্থায়ীভাবে নির্মূল করা সম্ভব নয়। কার্ড বিতরণের মাধ্যমে সাময়িকভাবে সাধারণ জনগণের মধ্যে স্বস্তি আনা যেতে পারে কিংবা জনপ্রিয়তা অর্জন করা যেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি কোনো সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করতে হলে, অবশ্যই বিষয়টি নিয়ে গভীর বিচার-বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
দেশে দারিদ্র্যের হার নির্ধারণ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সংস্থাটির খানা আয়-ব্যয় জরিপে এসব তথ্য উঠে দারিদ্র্যের হার। সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপ করা হয়েছিল ২০২২ সালে। সে সময় সার্বিক দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল, যা বিগত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অপরদিকে পিপিআরসি দারিদ্র্য হার নিয়ে গত আগস্টে একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ২০২৫ সালে দেশের সার্বিক দারিদ্র্য বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রকৃত অর্থে, দারিদ্র্য নিরসন বর্তমান সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এর মাধ্যমেই দেশকে স্বাবলম্বী করা সম্ভব। প্রতিটি মানুষের জন্য যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়, তবেই জাতির মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসবে। সেই সঙ্গে বর্তমান সরকারও মানুষের হৃদয়-মন জয় করতে সক্ষম হবে। এর মধ্য দিয়েই বিজয় লাভ করবে বাংলাদেশ। পরবর্তী বিষয় হলো বেকারত্ব। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব একই ধরনের মনে হলেও, এদের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান। দারিদ্র্য হলোএকজন দিনমজুর দৈনিক যে আয় করে, তা দিয়ে তার সংসার চলে না। অপরদিকে, বেকারত্ব হলোএকজন ধনাঢ্য বা সাধারণ বাবার সন্তান যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পাওয়ায় সে বেকার থাকে। ফলে দেশে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য একই সঙ্গে দূর করা উচিত। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দারিদ্র্য ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে এবং বেকারত্ব চরম আকার ধারণ করেছে। তাই রাষ্ট্রকে এখানে গভীর মনোযোগ সহকারে বিচার-বিশ্লেষণ করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বেকারত্ব বেড়েছে প্রায় দুই লাখের মতো। যদিও বাংলাদেশের বেকারত্বের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয় আইএলও-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী। প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের বেকারত্বের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। বেকারত্ব দূর করা এবং তরুণ সমাজকে কর্মে ফিরিয়ে আনা বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করবে। একটি অন্যতম খাত হলো ব্যাংকিং খাত এবং পুঁজিবাজার। বড়ই পরিতাপের বিষয় হলো, পুঁজিবাজারকে পাশ কাটিয়ে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরী মূলধনের জন্য ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। ফলে একই সঙ্গে পুঁজিবাজার এবং ব্যাংকিং খাত দুটোই একসঙ্গে ধ্বংসের দিকে চলে যায়। একটি প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হলে, নির্দিষ্ট সময় পরপর আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে হয় এবং শেয়ার মালিকদের লভ্যাংশ দিতে হয়। অথচ ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করলে এ সবের কোনো বালাই থাকে না। অতএব এই জায়গাটিতে সরকারকে গভীরভাবে মনোযোগ দিতে হবে এবং সমস্যা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাংকিং খাতে যে অস্থিরতা চলছে, তা নিরসনে সরকারকে আরও বেশি অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
বর্তমান সরকার ইতিমধ্যে একটি ব্যাংকের তারল্য সংকট মেটাতে, পাঁচ হাজার কোটি টাকা দিয়ে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি এক শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে, মন্দ ঋণগুলো পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র এক শতাংশ অর্থ জমা দিয়ে, ঋণগুলোকে অনাদায়ীর তালিকা থেকে মুক্ত করা যাবে। এটি রাষ্ট্রের জন্য কতটা মঙ্গলজনক তা গভীরভাবে ভাবার বিষয়। এর ফলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও কয়েক গুণ বেড়েছে। বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ, যা একটি সুস্থ ও সবল দেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। এই হুমকিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে শক্ত হাতে দমন করতে হবে। একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশই হলো ১০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে বিতরণকৃত ঋণ। সুতরাং মাত্র এক শতাংশের বিনিময়ে খেলাপি ঋণকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া, নিঃসন্দেহে বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার শামিল। যদি তাই হয়, তাহলে তা রাষ্ট্রের জন্য চরম ব্যর্থতা। ঋণ আদায়ে সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে এবং ঋণ পরিশোধ না করার অপসংস্কৃতিকে ভেঙে ফেলা জরুরি। নতুন করে টাকা ছাপিয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সহযোগিতা করলে, দেশের জন্য বিষয়টি হবে আত্মঘাতী। কারণ অতিরিক্ত টাকা ছাপালে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধি পাবে, ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। তখন হয়তো দেশ পরিণত হবে জিম্বাবুয়ের মতো মানুষ টাকার বস্তা নিয়ে বাজারে যাবে এবং বিনিময়ে একটি ব্যাগে বাজার নিয়ে ফিরবে।
ব্যাংকিং খাতকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় কখনোই নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়। ছোট্ট এই দেশে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা ইতিমধ্যেই অনেক বেশি। বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত গভর্নরের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে মাত্র ১০ থেকে ১২টি ব্যাংক থাকলেই যথেষ্ট। তাই এসব বিষয় গভীরভাবে বিবেচনা করা উচিত। দুর্নীতিকে গুরুত্ব দিয়ে, একে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। দুর্নীতি আমাদের সমাজে এমন একটা সংক্রামক ব্যাধি, যা রাষ্ট্রের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়েছে। এই বিষয়গুলো সরকারকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যদিও বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরতে চেয়েছে। তাই দুর্নীতি দূর করতে হলে, এখনই সোচ্চার হতে হবে। চিরতরে দুর্নীতি বন্ধ করতে পারলে, দেশের অর্থনীতি চরম উচ্চতায় পৌঁছাবে। সবক্ষেত্রে যদি আমরা রাজনৈতিক চিন্তাকে প্রাধান্য দিই, তাহলে কোনোভাবেই দুর্নীতি দূর করা সম্ভব হবে না। যে কারণে প্রথমেই আন্তরিকভাবে মানসিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কী চাই? যদি দেশের উন্নতি চাই, তাহলে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। যে যোগ্য, যে সৎ এবং যে কর্মনিষ্ঠ তাকে কাছে টানতে হবে। এখানে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধ্যান্য পেলে কখনো দুর্নীতি দূর হবে না।
লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট
aktarrofikul@gmail.com