জ্বালানি সংকটের মুখে

ইরানে হামলার পর, জ্বালানি আমদানি ঝুঁকিতে পড়ে গেল বাংলাদেশ আপাতত তাই মনে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ১০ শতাংশ বেড়ে গেছে জ্বালানির দাম। যুক্তরাষ্ট্রের যোগসাজশে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে, দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে, সংকট মারাত্মক পর্যায়ে যেতে পারে। দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতই কেবল এই ক্ষতির মধ্যে পড়বে না, কৃষি উৎপাদনও ব্যাহত হবে, যা খাদ্য খাতকে ঝুঁকিতে ফেলবে। জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর বিধায় এই সংকট হবে বলে আশঙ্কা। ইতিমধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব দেশগুলো থেকে জ্বালানি সংগ্রহের কথা বলেছেন মন্ত্রী। দেশের খনিজ তেল ও গ্যাসের উৎসগুলোর ওপর দৃষ্টি দেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের ওপর দাঁড়াবার ওপর জোর দিয়েছেন তারা। অন্তত তিন মাসের জ্বালানি মজুদ, সংরক্ষণের কথাও বলেছেন। আমরা আশা করছি, ইরানের ওপর থেকে মার্কিনি সামরিক অভিযান দীর্ঘায়িত হবে না। জ্বালানি বহনকারী জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি ব্যবহারে সংঘাতের মধ্যে পড়বে না। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান আমাদের এই শিক্ষা দিচ্ছে যে, ভবিষ্যতে আরও সতর্ক থাকতে হবে জ্বালানি ও খাদ্যশস্য আমদানির ব্যাপারে।

পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, আমদানি কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। আত্মনির্ভরশীলতাই বিভিন্ন দুর্যোগ থেকে বাঁচার একমাত্র পথ। আমদানিনির্ভরতার কারণে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে আসবে। প্রবাসীদের পাঠানো মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ ৩৪ বিলিয়নে পৌঁছালেও তা কমে যেতে সময় লাগবে না। তেলের দাম যেহেতু ১০ শতাংশ বেড়েছে, তার চাপ তো আমাদেরই বহন করতে হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেছেন, দুই সপ্তাহের মধ্যে সংঘাত বন্ধ না হলে সব ধরনের জ্বালানি সরবরাহে বড় সংকট হবে। পাশাপাশি ব্যয়ও বাড়বে। ভবিষ্যতে এমন জটিল পরিস্থিতি এড়াতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান করতে হবে। বাংলাদেশের মাটির নিচে তেল ও গ্যাসের অনেক উৎস আছে। ব্লক সৃষ্টি করে সেগুলো বিভিন্ন দেশের অনুসন্ধানী কোম্পানিতে বরাদ্দও দেওয়া হয়েছে। সেই সব কোম্পানির অনুসন্ধানকর্ম কতটা অগ্রগামী হতে পারল, তার দেখভাল করার দায়িত্ব তো খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পেট্রোবাংলার। আবার এই প্রতিষ্ঠানেরই অঙ্গ বাপেক্স, যারা তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজে জড়িত। তাদের অনুসন্ধানে গ্যাসের কূপ পাওয়া গেলেও কর্র্তৃপক্ষ তাতে কেন তেমন উৎসাহ দেখায় না এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। তারা কি আমদানিকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন? সংবাদপত্রেই প্রকাশ পেয়েছিল যে বাপেক্সকে পর্যাপ্ত তহবিল দেওয়া হয় না। ফলে নতুন নতুন কূপ খনন ও অনুসন্ধান করা ব্যাহত হয়। এটা পেট্রোবাংলার পুরনো রোগ বা মন্ত্রণালয়ের কর্তাদের অভিসন্ধি। তারা কি জ্বালানি সেক্টরে স্বনির্ভর হতে আগ্রহী নন? তারা কি কেবল কমিশন প্রাপ্তিকেই প্রাধান্য দেবেন?

নতুন সরকার চায় দেশ সব দিক থেকে স্বনির্ভর হোক। কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতে দেশের পণ্য ব্যবহৃত হোক। বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলেই কেবল উৎপাদনের সব খাত সচল ও সবল হয়ে উঠবে। তাতে করে অর্থনীতির রোগাক্রান্ত সেক্টরও পাবে নতুন গতি ও প্রযুক্তিনির্ভরতার ছোঁয়া। বাংলাদেশ ফার্স্ট এই কথাটি আত্মনির্ভরতার লক্ষণ। নিজেকেই জিজ্ঞেস করা উচিত, দেশের সার্বিক উন্নতি তারা চান কি না। দুর্নীতিপরায়ণ আমলারা যে চান না, এতে কোনো ভুল নেই। তাই আমদানিতেই তাদের লাভ। এই আমদানিনির্ভরতা পরিহার করে তাদের আসতে হবে নিজেদের পায়ে দাঁড়াবার আকাক্সক্ষায়। ওই আকাক্সক্ষাই জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধের কারণে হারিয়েছি মূল্যবান রিজার্ভ। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতে সেই নাকাল অবস্থায় পড়তে যাতে না হয়, সেটা ভাবতে হবে। বিকল্প উপায় হিসেবে, দেশের খনিজ সম্পদের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান আমাদের।