সংঘাতের প্রভাব পড়ছে বিশ্বজুড়ে

ইরানের নজিরবিহীন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছে। নিজেদের আকাশসীমায় আঘাত আসার পর দেশগুলোকে এখন হয় পাল্টা হামলায় ইসরায়েলের পাশে দাঁড়াতে হবে, নয়তো নিজ শহরে হামলার পরও নিষ্ক্রিয় থাকতে হবে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এ খবর জানিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব ও ওমানে ইরানের হামলায় ইতিমধ্যে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এবং বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার তৃতীয় দিনেও বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশে হামলা অব্যাহত রেখেছে তেহরান। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ অঞ্চলের দেশগুলো কখনোই এমন যুদ্ধ চায়নি। হামলার ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত ওমান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার মধ্যস্থতা করছিল এবং শান্তি আলোচনায় যথেষ্ট অগ্রগতিও হয়েছিল। কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো তাদের বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট ও জ্বালানি স্থাপনা। এই গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো ধ্বংস হলে পুরো অঞ্চলটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের অশান্তির বাইরে এ অঞ্চলটি নিরাপদ বিনিয়োগ ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে সম্প্রতি দোহা, দুবাই ও মানামাতে আছড়ে পড়া ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শুধু কিছু ভবনের কংক্রিট আর কাচ’ই ভাঙেনি, একই সঙ্গে তা মধ্যপ্রাচ্যের বাকি অংশের সংঘাত-সংকট থেকে মরুদ্যানের এই অংশটুকু নিরাপদ, স্থিতিশীল উপসাগরের দেশগুলোর সযত্নে লালিত এমন ভাবমূর্তিও খসিয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিজেদের শহরে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত আসার পর এখন আর নিরপেক্ষ থাকার বিকল্প হয়তো দেশগুলোর হাতে নেই। তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ এখন অনেকখানি নির্ভর করছে ইরান কীভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে, তার ওপর। দেশগুলো এখন দ্রুত তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আবু ধাবির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক রাজনীতির অধ্যাপক মনিকা মার্কস আলজাজিরাকে বলেন, শার্লট, সিয়াটল বা মিয়ামিতে বোমা পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের যেমনটা হতো, মানামা, দোহা আর দুবাইয়ে বোমা পড়াটাও এখানকার জনগণ আর রাজনৈতিক নেতাদের কাছে ঠিক ততটাই আশ্চর্য ও অকল্পনীয় লাগছে।

শনিবার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে বিস্তৃত হামলা শুরু করার পর তেহরান ইসরায়েল ও অঞ্চল জুড়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি, স্থাপনা ও সম্পদে পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া শুরু করলে তার ধাক্কা উপসাগরের দেশগুলোতে লাগা শুরু হয়। এ অভিযান এরই মধ্যে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ ইরানি অনেক শীর্ষ নেতাদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। দেশটির সামরিক ও সরকারি স্থাপনাগুলোতে লাগাতার হামলা চলছে। তাদের হামলায় বেসামরিক প্রাণহানিও প্রচুর হচ্ছে। ইরানে মেয়েদের এক প্রাইমারি স্কুলে ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় ২০০ মানুষের মৃত্যুর খবরও এসেছে। তেহরানের পাল্টা হামলায় গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্তত তিনজন নিহত ও ৫৮ জনের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রতিহত করা ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ দুবাইয়ে বিমানবন্দর ও সুপরিচিত সব ভবন, মানামার সুউচ্চ একাধিক ভবন এবং কুয়েতের বিমানবন্দরে আঘাত হানে; পরে দোহার অনেক এলাকা থেকে ধোঁয়া উঠতেও দেখা যায়। রিয়াদ ও দেশের পূর্বাঞ্চলে ইরানের হামলার খবর দিয়েছে সৌদি আরব। কাতার বলেছে, হামলায় তাদের ভূখণ্ডে ১৬ জন আহত হয়েছে। ওমানে আহত হয়েছে ৫ জন, কুয়েতে ৩২, বাহরাইনে ৪ জন।

তবে উপসাগরীয় দেশগুলো এ যুদ্ধ চায়নি। যদিও সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ইরানে আক্রমণ করতে ওয়াশিংটনে তদবির চালিয়েছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একাধিকবার ফোন করেছিলেন বলে খবর বেরিয়েছে। তবে হামলার আগের বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে ওমান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অপ্রত্যক্ষ আলোচনায় মধ্যস্থতা করে গেছে। সর্বশেষ ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি বলেছিলেন, ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ না করতে এবং এখন যে পরিমাণ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আছে তা রাতারাতি কমিয়ে ফেলার প্রস্তাবে রাজি হওয়ায় শান্তি ‘নাগালের কাছাকাছি’ চলে এসেছে। অথচ তার কয়েক ঘণ্টা পরই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ব্যাপক মাত্রার হামলা চালায়। বিশ্লেষক মার্কসের মতে, যুদ্ধ আসছে মাস না হোক কয়েক সপ্তাহ ধরেই সেøা মোশনে এমনটা দেখছিল জিসিসি (গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল) দেশগুলো; তারা তা থামাতে ব্যাপক উদ্যোগও নিয়েছিল। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আবু ধাবির এ অধ্যাপকের ভাষ্য এই দেশগুলো জানত, কোণঠাসা ইরানি শাসকরা ‘আত্মহত্যার আগে ভ্রাতৃহত্যার পথ বেছে নেবে’, অর্থাৎ হার মানার চেয়ে উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের জিম্মি করাটা তাদের জন্য বেশি সুবিধাজনক। উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানে সামরিক অভিযান ঠেকাতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, এমন দাবির সঙ্গে একমত লন্ডনের কিংস কলেজের প্রভাষক রব গাইস্ট পিনফোল্ড। তিনিও বলেছেন, জিসিসি দেশগুলো এ যুদ্ধ চায়নি; তারা এর বিরুদ্ধে লবিং করেছিল। তাছাড়া, যুদ্ধে যোগ দিলে তাদের ‘ইসরায়েলের সহযোগী’ হিসেবে দেখা হবে, এতে তাদের ‘রাজনৈতিক বৈধতাও’ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলছেন পিনফোল্ড। আবার ইরানের লাগাতার হামলার মুখে চুপচাপ বসে থাকাও ঝুঁকিপূর্ণ। সব মিলিয়ে তারা এখন ‘দোদুল্যমান অবস্থায়’ আছে।

পিনফোল্ড বলেছেন, দিনশেষে এই সরকারগুলোকে জনমতের দিকে তাকিয়েই চলতে হয়। তাদের নিজেদের এমন রূপে দেখাতে হয় যে, তারা জনগণকে সুরক্ষা দিচ্ছে, ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত রাখছে। মার্কস, পিনফোল্ড উভয় বিশ্লেষকই মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত জিসিসি দেশগুলোকে কোনো না কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতেই হবে, তবে সেটা তারা এমনভাবে করতে পারে, যেন দেখানো যায় যে, অন্য কারও কারণে নয়, নিজের ইচ্ছাতেই তারা এ পথে নেমেছে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য আকাশপথ খুলে দেওয়ার বদলে তারা পেনিনসুলা শিল্ড ফোর্সের (পিএসএফ) মতো কিছুর সাহায্যে ইরানে হামলা চালাতে পারে, মনে করেন পিনফোল্ড। জিসিসি ১৯৮৪ সালে এ ঐক্যবদ্ধ পিএসএফ সেনাবাহিনী গঠন করেছিল, পরে ২০১৩ সালে এসে যা ইউনিফায়েড মিলিটারি কমান্ডে পরিণত হয়। এই বিশ্লেষক বলছেন, তারা ইসরায়েলের হয়ে কাজ করছে বা ইসরায়েলের সঙ্গে কাজ করছে নিজেদের এমনভাবে হাজির করতে চায় না। তারা নেতৃত্ব দিতে চায়, অনুসারী হতে নয়। পিএসএফকে সামনে ঠেলে দেওয়ার মাধ্যমে তারা নিজেদের ‘চালকের আসনে’ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করতে পারে। পিনফোল্ডের মত যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করেছে, ইরান যুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়েছে। এখন উপসাগরীয় দেশগুলো এমন অবস্থানে আছে যে তারা চাইলে দেখাতে পারে যে তারা চুপচাপ বসে থাকার পাত্র নয়, শুধু বোমার শিকার হবে এমন লোকজন নয় তারা।

পাল্টা জবাব হতে পারে ‘দুঃস্বপ্ন’ : যুদ্ধে জড়ানোর ক্ষেত্রে উপসাগরীয় নেতাদের তাৎক্ষণিক ভয় হলো তাদের সংবেদনশীল অবকাঠামো। তাদের বৈদ্যুতিক গ্রিড, পানি লবণাক্ত মুক্তকরণ কেন্দ্র ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হলে সেটা হবে তাদের জন্য ‘সত্যিকারের দুঃস্বপ্নের মতো পরিস্থিতি’, বলছেন মার্কস। তিনি জানান, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও পানি লবণাক্ত মুক্তকরণ ছাড়া, তীব্র গরম আর খটখটে মরুর উপসাগরের দেশগুলো মূলত বসবাসের অযোগ্য। জ্বালানি অবকাঠামো না থাকলে তারা একেবারেই অলাভজনক। এসব স্বার্থ সবচেয়ে কম বিঘ্নিত হবে, এমন চিন্তা করেই তাদের পরের পদক্ষেপগুলোর কথা ভাবতে হবে। আর পিনফোল্ড বলছেন ‘ভাবমূর্তিগত ক্ষতির’ কথা। অস্থিতিশীল এলাকাতেও নিজেদের স্থিতিশীল এবং বিনিয়োগ ও পর্যটনের জন্য সেরা হিসেবে দেখানোর যে চেষ্টা তাতে সবচেয়ে বড় দাগ লেগে যাবে। তার যুক্তি, এসব হামলা তাদের সেই ভাবমূর্তির ক্ষতি করবে।

রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র যুদ্ধ : চলমান সংকট পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোতে নাটকীয় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন দুই বিশ্লেষকই। বছরের পর বছর ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো লেবাননের হিজবুল্লাহ বা ইয়েমেনের হুতিদের মতো বিভিন্ন ছায়া গোষ্ঠী ছিল তাদের উদ্বেগের কেন্দ্রে। এখন সে হিসাব পুরোপুরি বদলে গেছে। পিনফোল্ড বলেন, আমরা মধ্যপ্রাচ্যে হয় একটি নতুন ধারা দেখছি, কিংবা রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র যুদ্ধের একটি অতি পুরনো ধারায় ফিরে যাচ্ছি। এখন আমরা ভুল তথ্য প্রচার, ছায়া যুদ্ধ এবং এ রকম আরও অনেক কিছুর মতো গ্রে জোন ওয়ারফেয়ার দেখছি না। প্রকৃতপক্ষে আমরা এখন নতুন মাত্রার সংঘাত দেখছি। এদিকে মার্কস বলছেন, এবারের যুদ্ধের আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরের বেশিরভাগ দেশই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য ইরানের চেয়েও ইসরায়েলকে বড় হুমকি মনে করত, বিশেষ করে গত সেপ্টেম্বরে কাতারে হামাস নেতাদের ওপর ইসরায়েলের হামলার পর থেকে। তিনি বলেন, এখন ওই মূল্যায়ন পুরোপুরি বদলে গেছে।