গ্রেপ্তারে আগাম ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন

চট্টগ্রাম নগরীতে অপরাধী গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের আগাম ঘোষণা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। গত রবিবার মধ্যরাতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে বিশেষ অভিযানের ঘোষণা দেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী। কিন্তু ঢাকঢোল পিটিয়ে এমন ঘোষণা দেওয়া সত্ত্বেও মূল অপরাধীদের গ্রেপ্তারে উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। রবিবার মধ্যরাত থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত নগরের ১৬ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করে। এ ছাড়া একটি দেশি অস্ত্র (এলজি), ১০ রাউন্ড পিস্তলের গুলি ও ৪৬৯ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। তবে চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।

এই অভিযানের পটভূমিতে রয়েছে গত শনিবার ভোরে নগরীর চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসভবনে অত্যাধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলিবর্ষণের ঘটনা। পুলিশি পাহারায় থাকা এ শীর্ষ ব্যবসায়ীর বাসা লক্ষ্য করে দুই মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় গুলিবর্ষণের ঘটনায় নগর জুড়ে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। মুখোশধারী চার অস্ত্রধারী মেশিনগান ও চাইনিজ রাইফেল ব্যবহার করে এ হামলা চালায়। এতে বাড়ির জানালার কাচ ভেঙে গেলেও কেউ হতাহত হয়নি।

এদিকে ওই চার অস্ত্রধারীকে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গত রবিবার সচিবালয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। নগরবাসীর মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে অপরাধীদের চিহ্নিত করা গেলে কেন দ্রুত গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না? পুলিশি পাহারার মধ্যে তারা কীভাবে ভারী অস্ত্র বহন করে হামলা চালাতে পারে? এসব অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র তারা পেল কোথায়?

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বলেন, ‘ব্যবসায়ীর বাসায় গুলির ঘটনার পর থেকেই অপরাধীদের ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে এ ঘটনায় নগরবাসীর মনে কিছুটা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।’

তবে পুলিশের আগাম ঘোষণা নিয়ে সমালোচনা করেছেন অনেকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে মন্তব্য করেছেন, অভিযান শুরুর আগে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দিলে মূল অপরাধীরা সরে যাওয়ার সুযোগ পায়। একযোগে অভিযানের উদ্দেশ্য যেখানে অপরাধীদের পালানোর পথ রুদ্ধ করা, সেখানে আগাম ঘোষণা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা আসাদুল হক বলেন, “সিএমপির এই ‘টোটকা’ কাজে আসবে না। পুলিশকে আরও সক্রিয় ও কৌশলগতভাবে কাজ করতে হবে।”

অন্যদিকে সিএমপি মুখপাত্র সহকারী পুলিশ কমিশনার আমিনুর রশিদ জানান, নগরবাসীর নিরাপত্তাহীনতা দূর করে আস্থা অর্জনের জন্য ‘এস ড্রাইভ’ নামে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, পুলিশি পাহারায় থাকা স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে দুই দফায় গুলিবর্ষণের ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। চিহ্নিত চার অস্ত্রধারীর মধ্যে একজন মোহাম্মদ রায়হান (রায়হান আলম) এবং অন্যজন মোবারক হোসেন ওরফে ইমন। এই দুজন ভারতে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চাঁদা না পেলে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য গুলি চালায় সাজ্জাদ বাহিনীর সদস্যরা। নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন বাড়িঘর নির্মাণ, ব্যবসা বা জমি বিক্রির লেনদেন শুরু হলেই চাঁদার দাবি আসে।

স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের দাবি, তার কাছে প্রথমে ১০ কোটি, পরে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে বড় সাজ্জাদ। দাবি না মেটানোয় গুলির ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করে আসা সাজ্জাদ বাহিনীর সক্রিয় কিলিং স্কোয়াডের নেতৃত্বে রয়েছেন রায়হান ও ইমন। বড় সাজ্জাদের আরেক অনুসারী ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর (গত বছর ১৫ মার্চ) বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন রায়হান ও ইমনের হাতে চলে আসে। রায়হান একজন দুর্ধর্ষ শুটার; টার্গেট কিলিং করে দ্রুত পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপনে যাওয়াই তার কৌশল।

পুলিশ জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগরী ও জেলায় অন্তত আটটি হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ঘটনায় রায়হানের বিরুদ্ধে দেড় ডজন মামলা রয়েছে। তার সঙ্গে থাকে আরেক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ইমন।

সহকারী পুলিশ কমিশনার (সদর) ও অতিরিক্ত দায়িত্বে জনসংযোগ কর্মকর্তা আমিনুর রশিদ জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারি চকবাজার এলাকায় গুলির ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পলাতক রায়হান ও ইমনকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, দুই দশক ধরে দেশের বাইরে বসে সাজ্জাদ আলী নগর ও জেলার বিস্তৃত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছেন। তিনি ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় রয়েছেন (নাম সাজ্জাদ খান)। চাঁদা না পেলে তার অনুসারীরা গুলি চালায়। নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজানসহ পাঁচ থানার পাঁচ লাখের বেশি মানুষ সাজ্জাদ বাহিনীর কারণে আতঙ্কে রয়েছে।

গত বছর ৫ আগস্টের পর জেলায় জোড়া খুনসহ ১০টি খুনে সাজ্জাদের অনুসারীদের নাম উঠে এসেছে। তারা আধিপত্য বজায় রাখতে প্রতিপক্ষকে খুন করছে, আবার ভাড়াটে খুনি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে বড় সাজ্জাদের বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন বুড়ির নাতিখ্যাত ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন। বর্তমানে তিনি কারাগারে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী রয়েছে। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর নেতৃত্ব আসে ১৮ মামলার আসামি মোহাম্মদ রায়হান ও মোবারক হোসেন ওরফে ইমনের হাতে। দলে আরও রয়েছে খোরশেদ, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক, এরশাদসহ অনেকে। যাদের অধিকাংশই অস্ত্র চালনায় দক্ষ। দলটিকে বিদেশ থেকে ফোনে নিয়মিত নির্দেশনা দেন বড় সাজ্জাদ।