মানুষ কথা বলতে চায়। নিজের অধিকারের কথা, ন্যায়ের কথা, ক্ষুধার কথা, সন্তানের ভবিষ্যতের কথা। কথা বলার অধিকার মানে ভয় ছাড়াই কোনো বিষয়ে মতপ্রকাশ করা, অন্যায় দেখলে প্রশ্ন তোলা, ভিন্ন মত প্রকাশ করা এবং ক্ষমতার কাছে জবাব চাওয়া। মানুষ সর্বপ্রথম কথা বলার অধিকার চায় কারণ কথা বলা বা মনের ভাব প্রকাশ করার মাধ্যমেই মানুষের বেঁচে থাকার প্রথম পরিচয়। কথা বলতে না পারলে মানুষ ‘মনুষ্য’ হিসেবে বাঁচতে পারে না। দার্শনিক ভলতেয়ার বলেছেন, ‘তোমার মতের সঙ্গে আমি হয়তো একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমি আমার জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে যাব।’ তার চিন্তাধারা আজও সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক। আমরা কথা বলার অধিকার বা মতপ্রকাশ ছাড়া কিছুই করতে পারি না। যা করতে চাই, যা ভাবি, যা বলি সবকিছুর মাধ্যম ভাষা। এই ভাষা প্রকাশ করেই আমরা কাজ করি, চিনতে পারি, বুঝতে পারি, অনুভব করি। এটি আমাদের অস্তিত্বের মূল উপাদান। মতপ্রকাশই মানুষের জীবনে বড় ভিত্তি। এ অধিকার খর্ব হলে পুরো সমাজের সৃষ্টিশীলতা, অগ্রগতি এবং সমৃদ্ধিও ব্যাহত হয়। যেখানে কথা বলার স্বাধীনতা নেই, সেখানে মানুষ নীরব দর্শক হয়ে যায় তার ভাবনা, প্রতিবাদ, স্বপ্ন আর আশা ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে পড়ে। এই অধিকার কেড়ে নেওয়া হলে, রাষ্ট্র ও সমাজের দার্শনিক ভিত্তির মূল্যবোধ অর্থহীন হয়ে যায়। মানুষ কথা বলতে চায় রাষ্ট্র নিয়ে কেমন হবে তা নিয়ে। এমন রাষ্ট্র, যেখানে সংবিধান জনজীবনের কাজে লাগে। যেখানে ক্ষমতার সীমা আছে, জবাবদিহি আছে। যেখানে ধর্ম বিশ^াসে থাকবে, রাজনীতির হাতিয়ার হবে না। যেখানে ইতিহাস বিকৃত হবে না, শহীদের আত্মত্যাগ নিয়ে রাজনীতি করা যাবে না।
মানুষ চায় উন্নয়ন মানে বড় বড় দালান নয়, মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। করের টাকা যেন দুর্নীতি লুটপাটে না গিয়ে হাসপাতাল, স্কুল আর মানুষের কল্যাণে যায়। গ্রাম আর শহরের ফারাক কমুক, নদী, বন, প্রকৃতি বাঁচুক, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হোক। তাই কথা বলার অধিকার মানুষের মর্যাদা, নাগরিক পরিচয় আর আগামী দিনের নিরাপত্তার প্রধান প্রশ্ন। গণতন্ত্র জনগণের মতামত, অধিকার, স্বাধীনতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এর ভিত্তি হলো ক্ষমতায়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সুষ্ঠু নির্বাচন, আইনের শাসন, জবাবদিহি ও মানবাধিকার সংরক্ষণ। গণতন্ত্র শুধু ক্ষমতার হাতবদল নয়, এটি জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক। মৌলিক চাহিদা পূরণ, দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান না হলে গণতন্ত্র অর্থবহ হয় না। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি। গণতান্ত্রিক শাসনে সরকারের বৈধতা নির্ভর করে জনগণের ভোটের ওপর। জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই সরকার গঠিত হয় ও পরিবর্তিত হয়। জনগণের স্বার্থ উপেক্ষিত হলে জনতাই ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি পরিবর্তন করে এটাই গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা ও নিয়ম। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো পরিবর্তন টেকসই হয় না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছাড়া সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির সমন্বয়ে রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব নয়। এটি মানুষের চিন্তা, মতামত এবং সৃজনশীলতার বিকাশের পথকে বাধাগ্রস্ত করে, যা সমাজের ন্যায়বিচার ও সাম্যের ভিত্তিকে দুর্বল করে। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের জন্য সবার কণ্ঠস্বর শোনা এবং তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি যা কেবল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মাধ্যমেই সম্ভব।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দমন বা হরণ প্রসঙ্গে বিভিন্ন দার্শনিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারারকে বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা শুধু ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়, সমগ্র সমাজের নৈতিক ও বৌদ্ধিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য। লিবারেল দার্শনিকদের মতে, যেমন জন লক, জঁ জ্যাক রুশো ও মিল, মানুষের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার মৌলিক এবং অঙ্গীকারযোগ্য। তারা দেখান যে, মতপ্রকাশের দমন কেবল ব্যক্তির স্বাধীনতা সীমিত করে না, বরং মানবাধিকারের মৌলিক লঙ্ঘন সৃষ্টি করে। মুক্ত মতপ্রকাশ মানুষের চিন্তা ও সামাজিক বিকাশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে দার্শনিক সৌরেন কিয়ের্কেগার্ড সুন্দর একটা পর্যবেক্ষণ দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন- ‘আমাদের যা আছে, তা আমরা যথাযথ ব্যবহার করি না। আর আমাদের যা নাই, তার জন্য আন্দোলন করি।’ অর্থাৎ আমাদের রয়েছে চিন্তার স্বাধীনতা। আমরা তার কতটুকু ব্যবহার করি? আমাদের নেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আমরা তার জন্য আন্দোলন করি। কিয়ের্কেগার্ড আরও বলেছেন, ‘লেখালেখি হচ্ছে সত্যকে প্রকাশ করা। আর সত্য হচ্ছে আগুনের মতো। আর সত্যকে স্পর্শ করলে হাত পুড়ে যেতে পারে।’ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার, যা ব্যক্তির চিন্তা, বিবেক, বাক্ এবং ভাব প্রকাশের স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেয়। এটি শুধু বাংলাদেশের সংবিধান নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমেও স্বীকৃত। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদ বলে বাক্স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। সংবিধানের ৩৬, ৩৭ ও ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদে যথাক্রমে চলাফেরার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা ও সংগঠনের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অপরিহার্য, তবে তা অন্যের অধিকার, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা এবং অপরাধ প্ররোচনার মতো শর্ত ক্ষুন্ন না করেই নিশ্চিত করতে হবে। সংবিধান নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিলেও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা এবং অপরাধ প্ররোচনার মতো শর্ত আরোপ করেছে। তবে এসব শর্তের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ সরকার নির্ভর, যা অনেক সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। যেমন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আন্দোলন সমর্থনকে উসকানি হিসেবে গণ্য করা বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও তথ্যপ্রযুক্তি আইন সাংবাদিকতার স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টি করছে। সেল্ফ সেন্সরশিপের কারণে সাংবাদিকরা অনেক বিষয় প্রকাশ্যে বলতে পারছেন না। ইউরোপের তুলনায় বাংলাদেশের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অনেক বেশি শর্তাধীন, যেখানে ইউরোপীয় কোর্ট সুনির্দিষ্ট ও গণতান্ত্রিক আইন প্রণয়নে গুরুত্ব দেয়।
গণতন্ত্রের জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অপরিহার্য, তবে তা অন্যের অধিকার ক্ষুন্ন না করেই নিশ্চিত করতে হবে। কোনো গণতন্ত্রই নিখুঁত কিংবা চূড়ান্ত নয় প্রতিটি অর্জন, প্রতিটি বাধা পেরিয়ে যাওয়ার মাধ্যমেই গণতন্ত্র ক্রমাগত সমৃদ্ধ হয়। স্বাধীন মতপ্রকাশের সবচেয়ে বড় শক্তি, জবাবদিহি। সরকার বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যখন জানে, তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে তখন তারা দায়িত্বশীল থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হয় উল্টো। এখানে সাংবাদিক, লেখক ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের ওপর নানা আইন প্রয়োগ করে, ভয় দেখানো হয়। মানুষ যখন যৌক্তিক মতপ্রকাশ করতে ভয় পায়, তখন সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন থেমে যায়। তরুণরা প্রশ্ন তুলতে বা নতুন ধারণা প্রকাশ করতেও আগ্রহ হারায়। বিশ^বিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা মিডিয়া সব জায়গায় এক ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়। সমাজ ভয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়, যেখানে সত্য প্রকাশের বদলে তোষণ আর ভণ্ডামিই টিকে থাকে। সবাই জানে সমস্যার কথা, কিন্তু কেউ মুখ খোলে না। এতে সমস্যাগুলো আরও গভীর হয় এবং রাষ্ট্রের সংকট অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে যে অরাজকতা বিরাজ করছে, তার মূল কারণ হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ। যখন মানুষের নিজস্ব মতামত প্রকাশ করার সুযোগ থাকে না, তখন অস্থিরতা এবং সংঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। যত হত্যা, খুন এবং সন্ত্রাস ঘটেছে, তার পেছনে এই মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার কারণই প্রধান। আমাদের দেশে বাক্স্বাধীনতার অপব্যবহারও কম নয়। নাস্তিক বা জঙ্গি, প্রগতিশীল, রক্ষণশীল, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী ও নানা ধর্মমত নিয়েও বাক্স্বাধীনতার অপব্যবহারের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। দুর্নীতি, অর্থপাচার, কালোবাজারি, মাফিয়া এবং সন্ত্রাস মোকাবিলার জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি গণতন্ত্র এবং ন্যায়ের মূল ভিত্তি।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত, যা রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করে। যদি গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে এটি সমাজের প্রকৃত সত্যগুলো উন্মোচন করতে সক্ষম হয় এবং অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জনমত তৈরি করে। ফলে দুর্নীতি এবং সন্ত্রাসের মতো সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডের শেকড় উপড়ে ফেলা সহজ হয়। তাই একটি সুশাসিত রাষ্ট্র গঠনে মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য শর্ত। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা না থাকলে জনআকাক্সক্ষার ধারণা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যায়। ফলে মানুষের সম্মিলিত আশা, প্রত্যাশা ও চাহিদা, যা ন্যায়বিচার, সুশাসন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং মানবাধিকার পূরণ হয় না। জনগণ তাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরতে না পারলে ন্যায্যতা, জবাবদিহি এবং মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। মতপ্রকাশের অনুপস্থিতিতে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য দূর করা সম্ভব হয় না। বৈষম্যের প্রকৃত চিত্র উদ্ভাসিত হয় না, ফলে সঠিক সমাধানের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এটি নিপীড়িত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে তাদের অধিকার আদায়ের শক্তি ও সাহস জোগায়। সুন্দর, সৃজনশীল ও সমতার সমাজ গঠনের জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই সমৃদ্ধ ও দায়িত্বশীল অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের ভিত্তি।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
sk.rafiq1982@gmail.com