ডালিম ফুলের আখ্যান

উঠল্লু একটা মর্মস্পর্শী উপন্যাস। বাংলাদেশে বিহারি জনগোষ্ঠীর জীবন, মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা এবং বর্তমানে তাদের শেকড়হীন করুণ ক্যাম্পজীবনের ওপর ভিত্তি করে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক দুরবস্থা, এনজিও অ্যাকটিভিস্টের স্বার্থান্বেষী কূটচাল, দেশীয়দের মাদক ব্যবসার মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার সন্নিবেশ; রালফ ফক্সের ভাষায় বলা যায়, ‘উপন্যাস হলো সভ্যতার এক মহান লোকশিল্প, মহাকাব্যের একমাত্র উত্তরসূরি।’

১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের ফলে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ও দেশভাগের সূত্র ধরে ভারতের বিহারসহ উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও কলকাতা থেকে যে সব অবাঙালি বাংলাদেশে এসেছে তারা বিহারি হিসেবে চিহ্নিত। ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে লাখ লাখ উর্দুভাষী আসে আজকের বাংলাদেশে নয়, অবিভক্ত পাকিস্তানে। তারা পাকিস্তানের নাগরিক হতে চায়। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক বিহারি বাঙালি নিধন ও নির্যাতনে পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গ দেয়। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পরও তাদের মধ্য থেকে বাংলাদেশ-বিরোধিতা যায়নি। পাকিস্তান তাদের গ্রহণ করেনি বলে বাধ্য হয়ে এখানে থেকে গেছে। বিহারিরা মাতৃভূমি বিহার বা ভারত ছেড়ে আসার জন্য অনুশোচনা ও নস্টালজিয়ায় ভোগেনি, তারা পাকিস্তানের জন্য হাহাকার করেছে অথচ সে রাষ্ট্রটি কখনোই তাদের ছিল না। বাঙালিরাও বিহারিদের আপন করে নিতে পারেনি, কারণ বিহারিরা ভারত ছেড়ে এসেছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের নাগরিক হতে, উর্দু ভাষাটাও একটা বিষয়। বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটা বিহারি ক্যাম্পে পাকিস্তানি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো জনপ্রিয়। ক্রিকেটে বাংলাদেশ-পাকিস্তান মুখোমুখি হলে এসব ক্যাম্পে পতাকা ওড়ে পাকিস্তানের। বর্তমানে বাংলাদেশে তেরোটা ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের শতাধিক ক্যাম্পে কয়েক লাখ উর্দুভাষী মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পাওয়া বিহারিদের মধ্যে এখন দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম বেড়ে উঠছে। প্রতিনিয়ত তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হওয়া নিষ্পাপ প্রজন্মকে সামনে রেখে সাদিয়া সুলতানা উঠল্লু উপন্যাস লিখেছেন, প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তুলেছেন, স্পর্শকাতর বিষয়াদি বিশ্লেষণ করেছেন, উত্তরও দিয়েছেন। স্বাধীনতার এত বছর পরেও বিহারিরা আজও বাংলাদেশি হয়ে উঠতে পারল না, নাকি উঠতে দেওয়া হলো না, এই প্রশ্ন! কেন তাদের মাথার ওপরে শক্ত ছাউনি নেই, ক্যাম্পের নোংরা ছোট্ট ছাপড়ির মধ্যে ঘুম, খাওয়া, জীবনটাকে টেনে টেনে মৃত্যু পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া, এই প্রশ্ন! এখনও তাদের তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখা, ন্যায্য পারিশ্রমিক বা সম্মান থেকে বঞ্চিত করা, অবৈধ কর্মে লিপ্ত করে ফায়দা লোটা, এসব প্রশ্ন! নিশান, আবাবিল, রওশান, আনজুমরা এই দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তি চায়। নিশানের ‘আব্বু, আম্মির জন্য মায়া হয়। মানুষ দুটো ভালোবাসাবাসির জন্য চার দেওয়ালেও পায় না। এই তো ক্যাম্পজীবন। যেখানে ওরা খাঁচায় বন্দি পাখি। যাদের খাওয়া, পরা, মলত্যাগ, মৈথুন পর্যন্ত অন্যদের জানান দিয়ে করতে হয়।’ এ জন্য নিশান ধনী হতে চায়। ভালো রাস্তা না পেয়ে সে খারাপ পথে পা বাড়ায়। রওশান নিজের জীবনের পুনরাবৃত্তি হতে দিতে চায় না আনজুমের ক্ষেত্রে। তাই সে মেয়েকে পড়তে উৎসাহ দেয়, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মানুষের জীবনে পদার্পণ করতে বলে। ধর্মের নামে, পুরুষতন্ত্রের ধ্বজা ওড়ানো সমাজে মেয়েদের না-মানুষ ভাবা ও সেভাবে গড়ে তোলা, অত্যাচার ও নির্যাতনের আবহমানকাল জারি রাখা, ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণে অক্ষম ও ব্যর্থ সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামোর গহিনে আওয়াজ তোলা, যদিও তা মৃদুস্বরে, তবু তা কয়জনে পারে বা করে। সাদিয়া সুলতানা পলায়নপর ভিতু লেখক নন, তসলিমা নাসরিনও নন, অবশ্য তসলিমা নাসরিন হওয়া কোনো বাঙালির পক্ষে আদৌ সম্ভবপর নয়।

এখনো প্রতি বছর তাজিয়া মিছিল ঘিরে যে বাকবিতণ্ডা, ষড়যন্ত্র, সন্দেহ, হামলার মতো ঘটনা ঘটে তা মর্মান্তিক। নবীজির জন্মদিন পালন করা যাবে কিনা, হাসান-হোসেনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে স্মরণ করে রাস্তায় মিছিল বের করা যাবে কিনা, এখনো তার সুরাহা হলো না। যেমন হয়নি গান গাওয়া হারাম নাকি হালাল। কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠী বাউলগান, মেলার ওপরে এখনো ঝাঁপিয়ে পড়ে, হত্যা করার প্রকাশ্য হুমকি দেয়। কিছুদিন আগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক নিয়োগ বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। অথচ এবারের নির্বাচনেও গানে-সুরে ভোটের প্রচার করেছে সব ধরনের রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা। এ যুগে এসেও আফগানিস্তানে আইন পাস হয়েছে যে নারীদের হাড় না ভাঙা পর্যন্ত প্রহার করা যাবে। অথচ আমাদের দেশের কিছু কাঠনেতা আফগানিস্তান বলতে অন্ধ। এরা ফিলিস্তিনিদের জন্য কাঁদে, কিন্তু নিজ দেশের হিন্দু-আদিবাসীদের মহল্লা পুড়লে উল্লসিত হয়, ধর্ষিতা মেয়ের বিচার চাইলে ক্ষোভে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গরম করে তোলে।

উপন্যাসটি পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল উঠল্লু কেবল করিম বিবি, রওশান, নিশান, আকমালরা নয়, এদেশে আলো ছড়ানো পোকাটাও উঠল্লু, ভালো মানুষ মাত্রই উঠল্লু। তবে কি সমাজ, দেশ পেরিয়ে পৃথিবী কি উঠল্লু মানুষে ভরে উঠছে? এ প্রশ্নও দানা বাধবে পাঠকের মনে, মগজে। পুতুলনাচের ইতিকথা পড়ার পর যেমন পুতুলসদৃশ অনুভব হয়, উঠল্লু পড়তে পড়তে পাঠক নিজেকে যাযাবর, মোহাজের, রিফিউজির কাতারে দাঁড় করাবে। মনে পড়বে একাত্তরের শরণার্থীদের দুঃসহ দিনকাল। দাবদাহ, বর্ষার জল-কাদায় অনাহারে, এক কাপড়ে কাটানো দিন আজও যেন শেষ হয়নি। কিছুদিন আগেই তেজগাঁওয়ের বস্তিতে আগুন লেগে একাত্তরের শরণার্থীরা যেন ফিরে আসে, উঠল্লু উপন্যাসের চরিত্ররা যেন একাকার হয়ে যায়। বস্তিতে, মার্কেটে আগুন লাগে নাকি আগুন লাগানো হয়, সেই তালাশ কেউ করে না, তবে বাঙালি সব বোঝে! আবাবিল ও আনজুম, রওশান ও করিম বিবি চরিত্রে পথের পাঁচালীর অপু, দুর্গা, সর্বজায়া ও ইন্দির ঠাকরুনের মায়া দেখা যায়। লেখক চাইলে উঠল্লুর আরও দুটি পর্ব লিখতেই পারেন, তাতে উপন্যাসের বিস্তৃত ভাবের পূর্ণাঙ্গতা ধরা পড়বে।

উপন্যাসের বাস্তবতা বলিষ্ঠ, ভাষা তার প্রাণ। সিমেট্রিক বাক্যও লক্ষণীয়। তবে পরিবেশের অন্দরমহলে অগভীরতা বা দূর থেকে দেখা চোখের খোলস বিদ্যমান। কাহিনির পারম্পর্য যথাযথ, অতি শ্লথ বা গতিময়তায় খেই হারায়নি। উর্দু-হিন্দিতে সংলাপের যুতসই ব্যবহার, চরিত্রের স্বকীয়তা নির্মাণে লেখকের অধ্যবসায় লক্ষণীয়। উপন্যাস পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হবে এ এক দীর্ঘযাত্রা, যেখানে লেখক ২৪ ঘণ্টা বিদ্যমান। উপন্যাসের শুরুটা যে আধ্যাত্মিক চরিত্র ও পরিবেশ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে হয়, তা শেষে নিখোঁজ হওয়ায় চরম বাস্তবতা, চরিত্রের দ্বান্দ্বিকতা, ক্যাম্পের ভয়াবহতা ভিত্তিহীনতার প্রশ্ন তোলে। অধ্যাত্মচেতনার বিন্যাসও চিরচেনা। তবে সার্থক নামকরণ, জটিলতাহীন গভীরতা ও শৈল্পিক ব্যঞ্জনায় শেকড়হীন ক্ষুদ্র মানুষের জীবন রূপায়ণে, ছোট ছোট ঘটনাবলি একসূত্রে গ্রন্থনে লেখকের জুড়ি মেলা ভার। বিচিত্র সামাজিক স্বরের উপস্থিতি ও পারস্পরিক সম্পর্ক স্পর্শযোগ্য ও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে ইতিহাসের সঙ্গে অন্তরঙ্গ পরিসরগুলো।

আকিলা ইসমাইলের Of Martyrs and Marigolds  স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিহারীদের পরিস্থিতি নিয়ে লেখা, সালমান রুশদির Midnight’s Children উপন্যাসেও বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় বিহারীদের ওপর অত্যাচারের চিত্র ফুটে উঠেছে। তানভীর মোকাম্মেলের প্রামাণ্যচিত্র The Promised Land (নির্দোষ ভূমি), যা বিহারীদের রাষ্ট্রহীন অবস্থা এবং পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার ব্যর্থ আকুতি নিয়ে তৈরি। এসবের সঙ্গে সাদিয়া সুলতানা যুক্ত করলেন উঠল্লু, যার কারুণ্য মাখা আখ্যান স্থান-কাল পেরিয়ে স্বভূমে পরবাসী মানুষের পক্ষে বয়ান বিস্তারের অগ্নিকুণ্ডে ঘৃতদান করবে যুগে যুগে। 