অপেরার সৌন্দর্যে হারালেন ঋতুরা

হারবার ব্রিজকে সিডনিবাসী কোট হ্যাঙ্গারের সঙ্গে তুলনা করে। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইস্পাতের তৈরি ব্রিজ। এর বিশাল বাঁকানো কাঠামো সিডনি হারবারের দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য তৈরি করেছে। এর ঠিক দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সগৌরবে দাঁড়িয়ে অপেরা হাউজ। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানতম শিল্প-সংস্কৃতিক কেন্দ্রকে বলা হয় সেইল অব সিডনি (সিডনির পাল)। ঐতিহাসিক হারবার ব্রিজ আর আধুনিকতার নিদর্শন অপেরা হাউজ- দুই স্থাপনা কেবল সিডনি নয় গোটা অস্ট্রেলিয়ার হৃদস্পন্দন। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তারা সৃষ্টি করেছে এক অনন্য সৌন্দর্যের মিলনমেলা। যেখানে শিল্প ও প্রকৌশলের মহিমা একসঙ্গে ধরা দেয়। দূরের বোটানিক গার্ডেন থেকে অপেরা হাউজকে মনে হয় যেন সমুদ্রের বুকে ভেসে থাকা বিশাল কোনো রাজহাঁস। আর হারবার ব্রিজ তার বিশালতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দৃঢ়তা ও শক্তির প্রতীক হয়ে। সিডনিতে পা রাখা মানেই একটিবারের জন্য হলেও অপেরা হাউজের সৌন্দর্য আর হারবার ব্রিজের বিশালতায় একাকার হতেই হয়। নইলে পর্যটকদের সিডনি সফর হয় থাকে অসম্পূর্ণ। যে শহরে দুই সপ্তাহ ঘাঁটি গেড়েছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। আগের রাতে নারী এশিয়ান কাপের প্রথম ম্যাচে পরাশক্তি চীনের জয়কে ভীষণ কঠিন করে তুলেছিলেন ঋতুপর্ণা চাকমারা। অভিষেকেও গোটা এশিয়াকে নিজেদের অন্যভাবে চেনানোর তৃপ্তি নিয়ে বুধবার বিখ্যাত দুই স্থাপনার সৌন্দর্য ও বিশালতায় একাকার হওয়ার সুযোগ পেলেন বাংলাদেশের মেয়েরা।

চীন এ আসরের ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন, বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের চেয়ে তারা প্রায় একশ ধাপ এগিয়ে। সেই চীনকে চমকে দিয়ে জয়ের কাজটা কঠিন করে তুলেছিল বাংলাদেশের তরুণ ফুটবলাররা। প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে দুটি ভুলে দুটি গোল হজম। এর আগে-পরে বাংলাদেশের মেয়েদের খেলা ছিল প্রশংসনীয়। তাই তো ম্যাচে হারার পরও মেয়েরা পেয়েছেন সিডনিবাসীর ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাকেই শক্তিতে বদলে আগামীকাল উত্তর কোরিয়ার মুখোমুখি হতে হবে আফইদার দলকে। তার আগে টানা দুই সপ্তাহর অনুশাসন থেকে মুক্তি দিতেই বুধবার দুপুরে মেয়েদের নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছিলেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন সভাপতি তাবিথ আউয়াল। বিশ্ব জোড়া পর্যটকদের পরম প্রার্থিত অপেরা হাউজ ও হারবার ব্রিজ ও আশপাশের অনিন্দ্য সুন্দর পরিবেশে মেয়েরা সত্যিকারের মেয়ে হয়ে এসেছিলেন। তাবিথের ভাষায়, ‘এ কদিন তো কঠোর অনুশাসনের মধ্যে ছিল মেয়েরা। আজ একটু সুযোগ পেল সত্যিকারের মেয়ে হয়ে ঘুরে বেড়ানোর। সিভিল পোশাক পরে, সাজুগুজু করে তারা মেতেছিল নির্মল আনন্দে। আগের দিন পর্যন্ত ডায়েট ফুড খেতে হয়েছে। এখানে তাদের আইসক্রিমের আবদারও মেটানো হয়েছে (হাসি)।’

আদতেই অন্যরকম পরিবেশে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়িয়েছেন মেয়েরা। রঙ বেরঙের পোশাক পরে সেলফি-ছবি তুলে কেটেছে তাদের সময়। সিডনিবাসীর ভালোবাসার পাশাপাশি কয়েক ঘণ্টা এ মনোরম পরিবেশে কাটিয়ে যেন তারা সামনের কোরিয়া পরীক্ষার প্রস্তুতিটাই সেরে নিচ্ছে। এখানে তাদের আগলে রেখেছেন বাফুফে সভাপতি, তবে কড়া হেডমাস্টারের মতো নন, একেবারেই বন্ধুর মতো করে। স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে সিডনি এসেছেন তাবিথ। তবে বেশি সময়টাই তিনি দিচ্ছেন এই মেয়েদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে। অভিভাবকের এমন যতেœ মেয়েরাও পাচ্ছেন আরও ভালো খেলার অনুপ্রেরণা।

পরম কাক্সিক্ষত এই সময়টা কাটানোর আগে অবশ্য ঠিকই মাঠে ঘাম ঝড়াতে হয়েছে দলকে। জুবিলি স্টেডিয়ামে পিটার বাটলার দেড় ঘণ্টার এক সেশনে মেয়েদের অবশ্য খুব বেশি চাপ দেননি। মূলত রিকভারি সেশনে আগের রাতের ম্যাচের ক্লান্তি দূর করেছেন তারা।

এর আগে অনুশীলন শেষে কথা বলেন গোলকিপিং কোচ মাসুদ আহমেদ উজ্জ্বল। রূপনা চাকমার পর মিলি আক্তারকে পরিণত হয়ে উঠতে বড় ভূমিকা রাখা এই কোচ বলেন, ‘আজ  (বুধবার) আমরা পুরোপুরি রিকভারি সেশন করেছি। এখন একটি ভিডিও সেশনে (চীন বিপক্ষে ম্যাচের) ভুলভ্রান্তি নিয়ে কাজ করব। চীনের বিপক্ষে আমরা আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে পেরেছি। মেয়েরা মাঠে আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। আমরা সব সময় বলি, আমরা মেয়েদের ভাষা বুঝি, কোচিং স্টাফ হিসেবে ওরা কতটা সিরিয়াস ও আন্তরিকভাবে আমাদের কথাগুলো নিচ্ছে তারই প্রতিফলন দেখা গেছে মাঠে।’ রুপনা চাকমাকে সেরা একাদশে না দেখে ম্যাচের আগে অনেকেই হতাশ হয়েছিলেন। তবে মিলি পাওয়া সুযোগ শতভাগ কাজে লাগিয়ে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। উজ্জ্বল বলেন, ‘মিলিকে নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা ছিল আরও দুই মাস আগে থেকে। চীনের বিপক্ষে তাকে দিয়ে শুরু করব এটা হেড কোচের সঙ্গে আলোচনা করেই ঠিক করেছি। নারী লিগের সময় এবং আমার ট্রেনিং সেশনগুলোতেও সেভাবেই কাজ করেছি। চীনের শক্তির জায়গাগুলো বিশ্লেষণ করেছি, যেখানে মিলির উচ্চতা কাজে লাগানো যেতে পারে। সে প্রমাণ করেছে, সে ভালো খেলতে পারে।’ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেও উজ্জ্বলের বিশ্বাস ফুটবলাররা তাদের পরিকল্পনার শতভাগ বাস্তবায়ন করতে পারবে, ‘পরের ম্যাচটা আমাদের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। ভাগ্য সহায় হলে যদি একটি পয়েন্টও আনতে পারি, সেই লক্ষ্য নিয়েই মেয়েদের উজ্জীবিত করছি।’

বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে চীনেরও ওপরে থাকা উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে পয়েন্ট ছিনিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যটা ভীষণ কঠিন। এটা দলের প্রত্যেকেই মানেন। তারপরও চীনের বিপক্ষে লড়াইটা তাদের অসম্ভব স্বপ্নটা দেখাতে শুরু করেছে। অপেরার অপরূপ সৌন্দর্য আর হারবার ব্রিজের দৃঢ়তা- বিশালতাকে ধারণ করার বীজটা যে তারা বুনে নিয়েছেন চীনকে চমকে দিয়ে।