সেমিফাইনালে হ্যাটট্রিক দেখায় জিতবে কে

ভারত আর ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে যে জিতবে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা তাদেরই। জ্যোতিষশাস্ত্র না জেনেও এমন ভবিষ্যদ্বাণী করে দেওয়া যায় কিংবা জয়ী দলের পক্ষে ফাইনালে সর্বস্ব বাজিও চাইলে ধরা যেতে পারে। কারণ অতীত ইতিহাস তো তাই বলছে!

সবশেষ ২০২৪ সালের আসরে সেমিফাইনাল খেলেছিল ইংল্যান্ড ও ভারত, ৬৮ রান সেই ম্যাচটা জিতেছিল রোহিত শর্মার দল। এরপর ফাইনালে খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তারাই চ্যাম্পিয়ন। ২০২২ সালে সেমিফাইনালেও মুখোমুখি দুই দল, ভারতকে ১০ উইকেটে হারিয়ে ফাইনালে যাওয়া ইংল্যান্ড পাকিস্তানকে ৫ উইকেটে হারিয়ে জিতে নেয় শিরোপাও। আজ ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে যারা জিতবে, আহমেদাবাদে তারাই উৎসবে মাতবে, এ কথা তো বলাই যায়।

ওয়াংখেড়েতেই এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু করেছিল ইংল্যান্ড। নেপালের সঙ্গে কষ্টেসৃষ্টে জয়, বলা ভালো স্যাম কারানের অসাধারণ শেষ ওভারটার জন্যই জেতা। এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ৩০ রানে হার, শেরফানে রাদারফোর্ডের বেধড়ক পিটুনি। রুপালি স্বপ্নের মুম্বাই নগরী ইংল্যান্ডের কাছে রীতিমতো দুঃস্বপ্ন এই অভিযানে। অন্যদিকে ওয়াংখেড়ে তো ভারতের জন্য পয়মন্ত ভেন্যু। এখানেই তো শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে মেতে ওঠা। আইপিএল, আর কত শত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ এখানে খেলে খেলে মাঠটাকে হাতের তালুর মতোই চেনেন ভারতের ক্রিকেটাররা। এই ভেন্যু থেকেই ভারতের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখার অভিযানের শুরু হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে, এবারে সামনে ইংল্যান্ড।

প্রায় এক বছর আগে, গেল বছরের ফেব্রুয়ারিতেই ভারত সফরে এসেছিল ইংল্যান্ড। খেলেছিল ৫ টি-টোয়েন্টির সিরিজ যার ফল ভারত ৪-১ ইংল্যান্ড। সেই সিরিজে সবচেয়ে বেশি রান করেছিলেন অভিষেক শর্মা (ম্যাচে ২৭৯) আর সবচেয়ে বেশি উইকেট নিয়েছিলেন বরুণ চক্রবর্তী (৫ ম্যাচে ১৪)। বছর গড়ানোর পর যখন বিশ্বকাপ এলো, তখন এই দুজনই ভারতের বড় দুশ্চিন্তার নাম। অভিষেক টানা ৩ শূন্যের পর কিছু রান পেয়েছেন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আর সুপার এইটে এসে বরুণ রান দিচ্ছেন দেদার। ৪ ওভারে ৪০, ৪ ওভারে ৩৫ আর ৪ ওভারে ৪৭, এই হচ্ছে বরুণের সবশেষ ৩ ম্যাচের রান দেওয়ার খতিয়ান। উইকেট নিয়েছেন ২টি, সেসবও ভয় ধরানোর মতো কোনো ডেলিভারিতে নয়। স্রেফ ব্যাটসম্যানের অতি আক্রমণাত্মক মানসিকতার খেসারত হিসেবে।

দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক পেসার মরনে মরকেল কাজ করছেন ভারতের বোলিং কোচ হিসেবে। সংবাদ সম্মেলনে প্রথম কয়েকটা প্রশ্নই তার কাছে বরুণ চক্রবর্তীকে নিয়ে। একে একে মরকেল বলেছেন, ‘বরুণের সঙ্গে এটা ছিল স্রেফ একটি স্বাভাবিক রুটিন সেশন। ম্যাচের আগের দিন ও স্রেফ সিঙ্গেল উইকেট প্র্যাকটিস করতে খুব পছন্দ করে, যেখানে ও মানসিকভাবে ওর বোলিং প্রক্রিয়াগুলো ঝালিয়ে নিতে পারে। আমি বলতে চাচ্ছি, আমাদের মধ্যে যে আলাপগুলো হয়েছে তা মূলত চিন্তার স্পষ্টতা  নিয়ে, যাতে অনুশীলনের পর ও নিজের বোলিং নিয়ে ভালো অনুভব করতে করতে মাঠ ছাড়তে পারে।’ মরকেল আরও বলেছেন, ‘আমি ওর রণকৌশল ফাঁস করতে পারি না, তবে আমি ওকে সবসময় একটা কথাই বলি যে আমাদের বোলিং লাইনআপে বরুণের যে দক্ষতা এবং বৈচিত্র্য আছে, তাতে ওর প্রতিটি বলেই উইকেট নেওয়ার ক্ষমতা আছে। তাই যদি কোনো বলে বাউন্ডারি হয় বা ও পরিকল্পনা মতো বল করতে না পারে, তবে ওর কাজ হলো সেটা ভুলে গিয়ে পরবর্তী বলটির দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং নিশ্চিত করা যেন ও পরের বলটিতে নিজের সেরাটা দেয়।’ ভারতের হয়ে ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারাতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন মোহাম্মদ কাইফ। বরুণের বোলিং নিয়ে কাইফের মন্তব্য, ‘এখন অনেক ব্যাটসম্যান আগে থেকে প্রস্তুত হয়ে আসছে, ঠিক জানে কীভাবে বরুণকে মোকাবিলা করতে হবে। আর এখানেই তার একটি ছোট সমস্যা দেখা দেয়। আমি লক্ষ করেছি, যখন সে বেশি রান দেয়, তখনই সে কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়ে। প্রতিক্রিয়ায় তা দেখা যায়। উইকেট-টু-উইকেট লেন্থের পরিবর্তে সে প্যাডের দিকে বল করতে শুরু করে।’ এই সময়ের ক্রিকেটে বোলারের প্রতিটা বলই ভিডিও অ্যানালিস্টের বিশ্লেষণের আতশ কাচের নিচে, কাইফ মনে করেন বরুণের রহস্যটা ফাঁস হয়ে গেছে, ‘এই বিশ্বকাপে আমি লক্ষ করেছি, বরুণ খুব কম লেগ স্পিন করছেন। লেগ স্পিনের ওপর কাজ করতে হবে, কারণ এখন ব্যাটাররা তার গুগলির জন্য অপেক্ষা করছে। বল স্টাম্পের দিকে আসছে, তাই তারা এটিকে অফ-স্পিনারের মতো ধরে নেয় এবং ভেতরে ঘুরবে মনে করে। তাই অনেকেই তাকে লং-অন বা সোজা ব্যাটে সহজে মারতে পারছে’ বিশেষজ্ঞের ভূমিকায় বলেছেন কাইফ।

ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে এসেছে উইল জ্যাকসের অতিমানবীয় পারফরম্যান্সে। এখন পর্যন্ত ৪ ম্যাচে এই অলরাউন্ডার জিতেছেন ম্যাচসেরার পুরস্কার। তবে দুশ্চিন্তার নাম জস বাটলার। কয়েক মৌসুম আগেও আইপিএলে বাটলার ছিলেন বোলারদের ত্রাস। এই আসরে নিজেকে হারিয়ে খুঁজছেন বাটলার। অবশ্য অধিনায়ক হ্যারি ব্রুক তাকে চাপের মুখে ফেলতেই নারাজ, ‘আমরা সবাই যেমনটা দেখেছি, তিনি বহু বছর ধরে ক্রিকেটের একটা শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবেই আছেন। আমাকে এখন পর্যন্ত হাজার বার এই প্রশ্ন করা হয়েছে এবং আমি মনে করি তিনি কেন দলে আছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো কারণ থাকা উচিত নয়।’