এবার মোজতোবাকেও হত্যা করতে চায় ইসরায়েল

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উত্তরসূরিকে হত্যার হুমকি দিয়েছে ইসরায়েল। গতকাল বুধবার দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কার্টজ বলেন, ইরানের সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থা যাকেই নেতা বানাক না কেন, তিনি স্পষ্টভাবে আমাদের হত্যার লক্ষ্যে পরিণত হবেন। আইডিএফকে সে জন্য প্রয়োজনীয় সব উপায়ে অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছি। এটি আমাদের ‘রোরিং লায়ন’ অভিযানের অংশ। কার্টজ আরও বলেন, তার নাম কী বা কোথায় তিনি লুকিয়েছেন তা আমাদের জন্য কোনো সমস্যা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা ধ্বংস করতে এবং ইরানি জনগণের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পরিবেশ তৈরি করতে পূর্ণ শক্তিতে কাজ চালাব। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। হামলায় পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যসহ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। প্রতিবাদে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাচ্ছে ইরান। খামেনি হত্যার প্রতিবাদে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মোজতবা হোসেইনি খামেনি- ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন বলে একাধিক পশ্চিমা ও ইসরায়েলি গণমাধ্যমে আভাস দেওয়া হয়েছে। সূত্রের বরাত দিয়ে ইরানের শাসকগোষ্ঠী বিরোধীদের সংবাদমাধ্যম লন্ডনভিত্তিক ইরান ইন্টারন্যাশনালও বলছে, সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বেছে নেওয়ার দায়িত্বে থাকা ৮৮ সদস্যের ‘বিশেষজ্ঞ পরিষদ’ প্রয়াত নেতা খামেনির স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ৫৬ বছর বয়সী তার মেজ ছেলেকেই বেছে নিয়েছে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এখনো এ বিষয়ে কিছু বলেনি। আল-জাজিরা বা মধ্যপ্রাচ্যের খবরাখবর বেশি রাখা কোনো গণমাধ্যমও ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার এ তথ্য নিশ্চিত করেনি। বাবার ছায়ায় থাকা মোজতোবা-কে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পরবর্তী নেতা ধরে নিয়েছিলেন। তাকে সেভাবেই গড়ে তোলা হয়েছে বলে ভাষ্য খামেনি অনুসারীদের। তবে সমালোচকরা বলছেন, বড় মাপের আলেম না হয়েও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদে মোজতোবার আরোহণের পেছনে মূল ভূমিকা রাখতে পারে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি)। ইরানে খুবই প্রভাবশালী এ বাহিনীতে মোজতোবার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। মোজতোবা বেশিরভাগ সময় লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকেছেন, সরকারি কোনো দায়িত্বেও ছিলেন না; তার বক্তৃতার সংখ্যাও বিরল, গণমাধ্যমে তাকে দেখা গেছে হাতেগোনা কয়েকবার। কিন্তু ইরানের জটিল ধর্মতান্ত্রিক কাঠামোতে তার প্রভাব ব্যাপক ও বিস্তৃত।

১৯৬৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেওয়া মোজতোবা ৬ ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। তার ছোটবেলাতেই তার বাবা ইরানের সর্বশেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে উৎখাতের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তেহরানের আলাভি হাই স্কুল থেকে মোজতোবা কোমে রক্ষণশীলদের আলেমদের কাছ থেকে ধর্মীয় শিক্ষা নেন। দশকেরও বেশি সময় ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনায় কাটালেও তিনি আয়াতুল্লাহ পদমর্যাদা অর্জন করতে পারেননি। সাংবিধানিকভাবে সর্বোচ্চ নেতার ধর্মীয় পদমর্যাদাও উঁচুতে থাকার কথা, যে কারণে মোজতোবার ক্ষমতা গ্রহণ নিয়ে জ্যেষ্ঠ আলেমদের মধ্যে আপত্তি থাকা অস্বাভাবিক নয়। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় মোজতোবা হাবিব ব্যাটালিয়নে যুদ্ধ করেছিলেন; পরে ইরানের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ঊর্ধ্বতন পদে আরোহণ করেন। নির্বাচনে জয় বা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সরকারি দায়িত্বে না থাকলেও দীর্ঘদিন ধরেই তাকে বাবার কার্যালয়ের ‘অতন্দ্র প্রহরী’ হিসেবে দেখতেন ইরানি শাসনব্যবস্থার ভেতরের লোকজন। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র মোজতোবা খামেনির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আয়াতুল্লাহ খামেনি তার দায়িত্বের কিছুটা ছেলের কাছে হস্তান্তর করেছেন অভিযোগ করে ওয়াশিংটন সে সময় বলেছিল, জবাবদিহির বাইরে থেকে মোজতোবা সরকারি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ইরানের অনেক সংস্কারপন্থি রাজনীতিক এবং বিদেশি সরকারগুলোও মোজতোবার বিরুদ্ধে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানো এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ এনেছে। ইরানি কর্র্তৃপক্ষ বারবারই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

একাধিক ইরানি কর্মকর্তার বরাতে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল, মৃত্যুর আগে আয়াতুল্লাহ খামেনি তার উত্তরসূরি হিসেবে তিন জ্যেষ্ঠ আলেমের নাম বলে গিয়েছিলেন; তার মধ্যে মোজতোবা ছিল না। তা সত্ত্বেও বাবার পরে মোজতোবা শীর্ষ নেতার পদে বসলে রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের গোড়াপত্তন করা শাসনব্যবস্থা বড় প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। সেক্ষেত্রে শাসন কাঠামোতে নিজের অবস্থান পোক্ত করাই মোজতোবার প্রাথমিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে। দায়িত্ব পেলে মোজতোবাকে একদিকে ‘প্রতিশোধের নেশায় পাগল হয়ে থাকা’ আইআরজিসিরি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল যেমন ঠিক করতে হবে, তেমনি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতেও নানান ব্যবস্থা নিতে হবে। ইরাক সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট কুর্দিদেরসহ সব সশস্ত্র বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় যেমন তার চোখ থাকতে হবে, তেমনি মোল্লাতন্ত্রবিরোধী নতুন বিক্ষোভ গজিয়ে ওঠার প্রচেষ্টাও থামাতে হবে। সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে, যা দশকের পর দশক ধরে থাকা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় অনেকটাই ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।